আপেল কাহিনি: মিথ ও মহাকাল

কবি মজিদ মাহমুদের ‘কবিতামালা’ (২০১৫) কাব্য সংকলনটি এক অনবদ্য গ্রন্থ। ‘কবিতামালার’ (২০১৫) দ্বিতীয় কাব্য ‘আপেল কাহিনি’ (২০০২)-ও নানা মাত্রায় উল্লেখযোগ্যতার দাবী রাখে। ‘আপেল কাহিনি’ (২০০২) কাব্যটির ২৬টি কবিতায় কবি মজিদ মাহমুদের সময় দেশ-কাল ও মহাকাল প্রকাশিত হয়েছে। প্রাচীনকালের পুঁথি থেকে আধুনিক কালের মহারণ চিত্রিত হয়েছে এক নতুন কালের কবিতার কুসুম। প্রস্ফুটিত সেই কবিতার সৌরভ উদ্ভাসিত করেছে যা আধুনিক জীবনের নানান মধ্যবিত্তের জটিলতা। যা একদিকে মিথ, অন্যদিকে সেই মিথের পুনর্নির্মাণ।
কবি মজিদ মাহমুদের ‘কবিতামালা’ (২০১৫) কৈফিয়ৎ, এক অনবদ্য গদ্য-রোমান্টিকতা আমাদের মুগ্ধ করে। কবিতাগুলো যেন শিকার যুগ থেকে কৃষিযুগের যুগলবন্দী। কিংবা ককেশাসের পর্বতকৃঙ্গে বন্দি প্রমিথিউস থেকে আধুনিককালের বরফের নিচে চাপা পড়া খনি শ্রমিকের ক্রন্দনমালা। শুধু অশ্রুসিক্ত বেদনামালা নয় সাদা কালোর যুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া সেনানীর প্রশান্তির গীতবিতান। ধূসর পাণ্ডুলিপি হয়েও যেন অগ্নিবীণার নাইটিঙ্গেল। শুধু মানুষের বদল বৃত্তান্ত নয় প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকা মরণশীল মানুষ নয়, যেন অমর মানুষের চিরকালের গান।
‘আপেল কাহিনি’ (২০০২) কাব্যটির ২৬টি কবিতায় চিত্রিত হয়েছে – মিথ ও জীবনের যৌথ জিজ্ঞাসা। বাইবেলের সৃষ্টি কাহিনীর সঙ্গে যেমন মহাকবি মিল্টনের‘প্যারাডাইস লস্টের’সাদৃশ্য, থাকলেও বৈসাদৃশ্যই বেশি করে মনে পড়বে। আপেল কাহিনিতেও তেমনি দুই বৈপরীত্যের চিত্রমালা আমাদের আধুনিক জীবনকে ভাবায়।
‘তোমাদের একদিকে ছিল সমুদ্র ও পর্বতের ঝর্নাধারা
অন্যদিকে আকাশ ও মরুভূমি
ঈশ্বর একটি ধারালো ছুরি দিয়ে
তোমার শরীরকে সমান দুভাগ করে দিল;

ক্ষমতার অধীশ্বর মানুষকে শুধু শক্তি দেননি। দিয়েছেন শক্তিহীনতার সংগ্রামের সহ্যশক্তি। তাই মরুভূমি আর সমুদ্রের মিলনের আকাঙ্খায় মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের সমকক্ষ হয়ে উঠতে চায়। ‘প্যারাডাইস লস্টের’ ‘সাপ’ নিজে কোন গর্ত খুঁড়তে পারে না। মিথের ‘সাপ’যেন একালের সংকটবহুল মানুষের হাহাকার হয়ে ফুটে উঠেছে। আধুনিক শুধু চিরকালের মানুষের মধ্যে যে সাপ লুকিয়ে আছে ‘কষ্টের বিষকতা’ ‘মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর মরণ’ মরণশীল মানুষকে গ্রাস করে। মানুষ সাপ এক অনবদ্য চিত্রকল্প ‘সাপ’কবিতাকে ঈশ্বর আর মানুষের চিরন্তন সংগ্রামকে জাগরুক রাখে।-
‘আমি তো পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারি না; তাই
দিনের আলোতে ঘাসের নিচে লুকিয়ে রাখি পথ চলার লজ্জা
রাত এলে তোমার খোঁজে এঁকে-বেঁকে
বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়।’

‘সাপ’ কবিতার বিপরীতে লেখা হয়েছে ‘ভালোবাসা তোমার প্রভু’। ভালোবাসা যদিও অব্যক্ত অভিপ্রায় তবু ভালোবাসাই ঈশ্বর। মানব জীবনের সবচেয়ে স্পর্ধিত মননের নাম কি ভালোবাসা? ভালোবাসা দেওয়ার জন্য কোনো ব্যাঙ্ক ঋণ লাগে না। ভালোবাসা দিলে বরং তা বেড়েই চলে – নদী থেকে ক্রমশ মোহনার পথে মহাসমুদ্রের সংযোগে। কিন্তু ভালোবাসা পেতে হলে !
‘ভালোবাসা এক অপরিমিত সাহসের নাম ….
… ঈশ্বর এবং ভালোবাসা উভয়কেই তুমি এক নামে
ডাকতে পারো।
বাইবেলের এই চিরায়ত মিথটি এখানে আধুনিক জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে – এক মুগ্ধ পুনর্নির্মাণের কবিতার রসভাষ্যে।
‘যুদ্ধ’ কবিতাটি আমার প্রিয় কবিতার মধ্যে অন্যতম বয়ানে মুগ্ধ করেছে। স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক আজন্ম।‘যুদ্ধ’ছাড়া কি জীবন হয়! রাষ্ট্রকে মাতৃভাষায় বাঁচিয়ে রাখতে কি ‘যুদ্ধ’ ছাড়া হয়? যুদ্ধ জারি আছে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত। এই যুদ্ধ তো যুগ-যুগান্ত থেকে বংশ পরম্পরায় চলমান আছে। পিতার যুদ্ধ পুত্রের মধ্যে। আবার পুত্রের যুদ্ধ পিতামহের রক্তের মধ্যে ধাবমান থাকে। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের নতুন শিশু কিভাবে জানতে পারবে – পিতা পিতামহের যুদ্ধজীবন!-
‘আমি আজ যোদ্ধার বাপ হতে চাই
আমার গল্প জানুক আমার সন্তান।’

‘আমি ঈশ্বর কিংবা ত্রাণকর্তা নই
‘দুঃখ থেকে আমাকে বাদ দিলে
দুঃখগুলো কষ্ট পাবে জেনো।

‘বর্গীর গান’ কিংবা ‘অন্ধবালক’ কবিতায় ‘অভিজ্ঞান’ স্বরূপ এক দিকচিহ্ন হয়ে থাকে- এমন কিছু লাইন; যা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অন্ধকারের অন্ধবালক ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হোগলা পাতায় বিছিয়ে শতশীর্ণ চাদর থেকে ফুটে উঠেছে আলোর কুজ্ঝটিকা। এক অদ্ভুত যাদু আঁধার গুহার মধ্যে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে অন্ধবালক খেলে চলেছে অনবরত। ক্ষুধার্ত অন্ধবালককে খেতে দেবে কে! পৃথিবীতে আবার কবে ত্রাণকর্তা আসবে? বড়দিন ২৫ ডিসেম্বরের পরে ২৬ ডিসেম্বরেও যিশুর জন্মদিনের রেশ কাটেনি যেন। সমস্ত শিল্পীরা যিশুর শেষ ভোজের ছবি এঁকে গেলে পৃথিবীর সমস্যার সমাধান হয়নি। ভেনাস কিংবা ম্যাডোনার চিত্র কি সভ্যতার দারিদ্র্য কমাতে পেরেছে!
‘২৬ ডিসেম্বর ১৯৯৯’ নামক কবিতাটি দ্বিতীয় সহগ্রাব্দের শেষ প্রহরকে এক অপূর্ব ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত করেছে। সৃষ্টির মহা সম্ভাবনা চোখের কিংবা মনের তৃষ্ণা মেটাতে পারে। কিন্তু পেটের ক্ষুধা মিটবে কি? একজন ত্রাণকর্তায় কি সভ্যতার সংকট মোচন হয়েছে। সেই ত্রাণকর্তাদের চিত্রমালায় কি যুগ যুগ ধরে মানুষের বেদনা বিলীন হয়েছে। আর সত্যিই যদি স্বর্গ থাকে, সত্যিই সব সুখ কি স্বর্গে মিলেছে ! তবে স্বর্গচ্যুত ঈশ্বরের সাধের সাধনা ! না কি নতুন স্বর্গের সূচনা হচ্ছে ইভ-এর মধ্য দিয়ে। শেষ পর্যন্ত মানুষ কি তার নিজেরই মুক্তিদাতা হবার পথে এগোবে! লেখক শিল্পী সাহিত্যবেত্তারা জীবনের নতুন গান গেয়ে চলে। আর পাপের ‘অগ্নিপবন’ মানুষকে শেষপর্যন্ত জয়ী করে দেয়। অজেয় সংগ্রামে কবির সেই অদম্য জেদী মানুষ পৃথিবীকে প্লাবিত করে এগিয়ে যায়। এখানে কবি মানব নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। সূর্য আছে মানে, সূরে‌্যর আলো আছে। আলো আছেই মানে মানুষের ভালোবাসা আছে। স্বর্গের সুখের আর প্রয়োজন নেই। দুঃখ জয়ী মানুষ নিজেই স্বর্গ সৃষ্টি করে নিতে পারবে। ‘নন্দনকাননে তুমি ইভ। … তুমি ঈশ্বরী হয়ে গেলে। তোমার মধ্যে জন্ম নিলো সৃষ্টির ক্ষমতা। তুমি শত্রু ঈশ্বরের। আর আমি সেই থেকে পিকাসোর মতো শরীরকে তুলির মতো করে আঁকিবুকি করতে থাকলাম।’
‘২৬ ডিসেম্বর ১৯৯৯’কবিতাটি নির্মম গদ্যকবিতা হয়েও সবচেয়ে সরস সৃষ্টিশীল রোমান্টিক কবিতা হতে পেরেছে। কবি মজিদ মাহমুদ প্রশ্ন তুলেছেন কে বড় – মানুষ না ঈশ্বর? নারী না পুরুষ? শুধু ইভকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। নিন্দিত নন্দনকাননের সেই নারীর গর্ভেই জন্ম নেবে আগামী দিনের ত্রাণকর্তা। বাইবেলের মিথ, সমকালের বীক্ষায় যেন আধুনিক মননের রাইফেলে পরিণত হয়েছে।

আমার প্রেমের কবিতা পড়ো না
প্রেমের দ্বৈরথ ছোটবেলা থেকে বড়বেলা পর্যন্ত শেষ হয়না। রক্ত মাংসের মানুষের ভালোবাসা-প্রেম ঘিরে থাকে শরীর, আগুন আর ক্ষুধা। ধীরে ধীরে ঠকতে ঠকতে প্রেমিক মানুষ দক্ষ ভালোবাসার সহিস হয়ে ওঠে। কবি মজিদ মাহমুদের ভালোবাসা এখানে পুরোপুরি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে নয়। যদি ঈশ্বরের পবিত্র স্পর্শে ভালোবাসার মৃত্যু ঘটে। ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় নীতির স্পর্শে। ভালোবাসা আসলে এক ধরনের সখ্যতার নাম। শুধু স্তন সুধা নয়, আবার শুধু স্খলন নয়। ভালোবাসা আসলে জীবন অভিজ্ঞতার এক ভিন্ন নাম। –
‘কখনো অদক্ষ সহিস কিংবা
ভালোবাসা তার পিঠ থেকে পড়ে যেতে পারে
ভালোবাসার মালিককে দক্ষ হতে হয়, …

যে শরীরে তুমি ভালোবাসা দেখতে পাও
তাকে স্পর্শের বাইরে রাখ।’
‘প্রেমের কবিতা’নামক এই কবিতায় কবি প্রেমকে এক ভিন্ন সংজ্ঞায় চিত্রিত করেছেন। ভালোবাসা কোন একটি শরীরে সওয়ার হয়ে ছুটতে থাকে। ভালোবাসা সবচেয়ে আলাদা অনুভূতি। অর্থ, যশ খ্যাতির সঙ্গে ভালোবাসার কোন যোগ নেই। ভালোবাসা বড় ব্যক্তিগত। ভালোবাসা একক কিন্তু সবচেয়ে অনুভূতিশীল। পৃথিবীর সব কিছুকে অতিক্রম করে যায়। কবির কাছে ভালোবাসার অন্য নাম কবিতা ‘আমার ছিল ঈশ্বরী’। ভালোবাসার ভিন্ন স্বাদ পাওয়া যায় এখানে। –
‘আমি তখন হামাগুড়ি দিয়ে তোমার দুধের বোঁটা
আকণ্ঠ করেছিলাম পান
তোমার স্পর্শে এইভাবে কতবার উঠেছি জেগে……
মুমুর্ষুর বিছানার পাশে আপেলের রক্তিম গালের
আভা নিয়ে কতরাত জেগেছিলে তুমি।

“রবীন্দ্রনাথ ও সিদ্ধার্থনাথ’
কবি মজিদ মাহমুদের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আপেল কাহিনি’তে (২০০২) যেমন খ্রীষ্টপ্রসঙ্গ এসেছে মিথের মর্মস্থলে, সেরকম অনিবার্য পরম্পরায় বাঙালি তথা বাংলা ভাষার হৃদয়াকাশে রবীন্দ্রনাথ এসেছে। আর সেই সঙ্গে সিদ্ধার্থ।
‘তুমি হাসতে হাসতে কাঁদো
কাঁদতে কাঁদতে হাসো
তোমাকে কখনই আমি আবিষ্কার করতে পারিনি।

কবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথকে কি বাঙালি আজও, কতটুকু অনুভব করতে পেরেছে! পেরেছে কতটুকু অনুশীলন! শুধু সামান্য নদীর মতো নয়, মহাসমুদ্রের সীমানা কিভাবে পরিমাপ করা যায়। ‘যৌবনে ছিল রবীন্দ্রনাথ’, তোমার বার্ধক্যে, মৃত্যুর পঁচাত্তর বছর পরও কবিগুরু যুবক এখনও।
‘ঘর থাকলেই কেবল ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া যায়’ – সিদ্ধার্থনাথ। তোমার সঙ্গে কেউ নেই। না নারী, না রাজপুত্র। তোমার কাছে বিধবা এসেছে তার সন্তানের মৃতদেহ নিয়ে। তুমি কি মানুষ না ঈশ্বর! কবির অনিন্দ্যসুন্দর বাস্তব লেখায় সিদ্ধার্থনাথও পৃথিবীর কাছে এক অসম্পূর্ণ গল্পের মতো। সুজাতা সুন্দরীতো শেষপর্যন্ত সিদ্ধার্থনাথকে প্রাণদান করে জ্ঞানের পরম আলো জ্বালিয়ে ছিল। কবির নিপুণ তুলির চিত্রনে মানব-ঈশ্বর, প্রেমের দেবতা মানব-সিদ্ধার্থ এক অনবদ্য মাত্রা এনে দিয়েছে। সবার উপরে ঈশ্বর সত্য নয়, শেষ কথা মানুষ। রক্তমাংস শরীরের প্রাণদাত্রী সুজাতার জয়গান গেয়েছেন কবি মজিদ মাহমুদ।
তারপর ‘মৃত্যুর জয়গান’ কবিতায় মৃত্যুই অনিবার্য সত্যি। জন্ম হয়তো সবটা সত্যি নয়। মৃত্যু কতটা সত্যি, যে বিশ্লেষণ করবে সে মৃত্যুঞ্জয়ী। মরিতে চাহিনা, আমি-আমরা এই সুন্দর ভুবনে। ভয়ার্ত মরুভূমির বন্ধ সীমান্তরে পড়ে থাকে সুধু সন্ত্রাসবাদ। একুশ শতকের সূচনায় শূন্য দশকের এক নতুন দর্শন কাজ করে। মৃত্যুর জয়গানের মধ্যেই জীবনের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে। মৃত্যু চেতনা কবির কাছে এক ভিন্নমাত্রা দান করেছে। আধুনিক জীবনে কেউ নিরাপদ নয়। সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে, রাতে ফিরে আসবে কি আমার প্রিয়জন। তবুও যতক্ষণ দেহে আছে জীবন, সংগ্রাম চালাতে হবে মানুষের মন-
‘মৃত্যু কি তবে মৃত্যুই ডেকে আনে
আমার স্মৃতি মরা মানুষের শব
আমার স্মৃতি শ্মশানের ভৈরব
আমি বেঁচে আছি মৃত্যুর জয়গানে।’

“নিষিদ্ধ কবিতাগুচ্ছ’
৮টি কবিতার কোলাজ ‘নিষিদ্ধ কবিতাগুচ্ছ’। সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল সীমানা দিয়ে বাঁধা যায় না। চরম বাস্তবতাকে‘নিষিদ্ধ কবিতা গুচ্ছে’ পরপর জীবনের মর্মান্তিক পরিণতিকে সাজানো হয়েছে। যা সুন্দর তাই সত্য না, যা নির্মম কদর্য তাই সত্য। আসলে সত্যের কোনও শ্রেণি বিভাজন হয় না। সভ্য সমাজের অবস্থানও দেখতে হবে শিল্পীর চোখ দিয়ে। কবি এখানে সমাজ-সত্যকে কবিতার ভাষায় অঙ্কিত করেছেন।

(১)
‘তাদের জন্য এই পুরস্কার হুর ও গেলমান
দিন পেরুলেই রাত্রি আমার হাত ধরে দেয় টান।”

(২)
‘একটুখানি বেজার হলো পথচারীদের মন
গোপনে তাই মাপল তারা বুক নিতম্বের ওজন।

(৩)
‘ব্রহ্মমিয়া ঘুমিয়ে আছেন সাততলা আসমানে
তোমার জন্য প্রাসাদ গড়ে ইউরোডলার নামে।

(৪)
‘যাদের গরল নিয়ে তুমি
সুধা দান করো।’

নিষিদ্ধ পল্লির যৌন কর্মীরা ‘রাক্ষসের অন্তহীন পেটের’ জন্য উন্মাদ সমাজকে সেবা করে যায়। সত্যি সত্যিই যদি যৌনকর্মীদের ফুটপাথে না দাঁড়াতে হতো, তবে সমাজের বাস্তুতন্ত্র কিভাবে সংরক্ষিত হতো! সমাজ যাঁদের ঘৃণার চোখে দেখে কিংবা সভ্য সমাজ যাঁদের স্বীকৃতি দেয় না, তাঁদের জীবনের করুণ মর্মকথা কবি অপরূপ অভিজ্ঞতায় চিত্রিত করেছেন। যাঁরা সমাজে শুধু দিলেন, পেলেন না কিছুই। কবি তাঁদের অব্যক্ত বেদনার মর্মলিপি কবিতার রসভাষ্য রচনা করে দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছেন।

(৫)
‘দেহরঞ্জন শব্দটি খুঁজে ফিরছ কেবল
কে পরাজিত হলো বলো, তোমার দেহ ও
মন পেটের ক্ষুধা।’

(৬)
‘আর রাত এলে তুমি একটি সজারুর মতো
গুহা থেকে বেরিয়ে অন্ধকার মন্দিরের দিকে যাও।

(৮)
‘সেও একদিন আমার দয়িত হবে
বল তো মা কী নাম রেখেছিল
সন্তানের সেদিন?’

(৮)
‘তুমি কি সেই অগ্নিচূড়ায় এখনও বসে আছ
আদিম মখ ইহুদি নিয়ে কোথায় যাবো আমি?

অতি আধুনিক মননের কবি মজিদ মাহমুদ, দেহ ও মন নিয়ে কতকগুলি জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। কার জয় হচ্ছে – দেহ, মন না পেটের ক্ষুধা। সভ্য সমাজের মুখোশের মধ্যে যে মুখ মুখরিত হয়। তার মান্যতা দেবে কে? কেন? কোন কোন পরিস্থিতির জন্য একজন অবলা নারী, দেহের পসরা নিয়ে, উপেক্ষিতার লাঞ্ছনার ভাগীদার হয়। সমাজ সচেতন কবি, সভ্য সমাজের সূক্ষ¥ সমাজ দৈন্যতা সুচারুরূপে কবিতায় ধরেছেন। মনে হয় কবি এখানে শুধু কবি নয়, সমাজ-শিল্পী, সমাজ বিজ্ঞানী।

‘যিশুর প্রার্থনা সভায় ’
‘৩৯০৯ ড়হ’ কবিতাটি এক অসামান্য আধুনিক কবিতা। অতলান্তিক মহাসমুদ্রে ভেসে আনন্দ খোঁজার জন্য জাহাজ-বাসিন্দারা মনে করেছিল-পৃথিবীর অন্য এক সুখের বাসিন্দা তারা। মনুষ্যকৃত সমুদ্রতরী যেন ঈশ্বরের নাগালের বাইরে। অদৃশ্য সেই অসীম শক্তির কাছে মানুষ কত অসহায়, মানুষ কি আজও জানতে চেয়েছে। আসলে সমুদ্রমুখী জাহাজটি সাউদাম্পটন ছেড়ে যাবার আগেই, তারা প্রত্যেকেই ছিল এক একজন ডুবন্ত মানুষ। পৃথিবীর স্থলভাগের অসুখী মানুষেরা জলভাগের সুখ নিতে সত্যিই কি সক্ষম। কৃত্রিম সুখের জন্য, সাধারণ স্থলভাগের মানুষের সঙ্গ বাদ দিয়ে সমুদ্র সুখ উপভোগ্য কতদিন? বল্গাহীন অর্থের তাণ্ডবে মানুষ কি সর্বশক্তিমানকে হারিয়ে দেবে। স্বর্গচ্যুত হয়ে অভিশপ্ত মানব-মানবী কি শয়তান-সর্প থেকে বিচ্যুত হতে পেরেছে। সমুদ্রসুখের তরীর সহযাত্রীদের মৃত্যুর করুণ দুর্ভাগ্যের মড়কগুলি অগ্নিসাগরে প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল। ডুবন্ত সেই সহযাত্রীদের জীবনদর্শনে। পৃথিবীর অপূর্ব সৃষ্টিতেও মাটির নিচেও জ্বলে থাকে তরল আগুন। আসলে ক্ষুদ্র মানুষ ‘প্রকৃতপক্ষে’ কোথাও যেতে কিংবা আসতে পারে না। কেবল দৃশ্যকে নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করতে পারে।

‘তুমি জানতে পারবে না যিশুর প্রার্থনা সভায় বোমা
বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ তুমি শুধু দেখো একজন মৃতমানুষ’।

কবি এখানে মৃত মানুষের মধ্যে জীবিত মানুষের জয়গান গেয়েছেন। কবি মজিদ মাহমুদের ‘আপেল কাহিনি’ (২০০২) কাব্যের মধ্যে নিজস্ব প্রকাশ ভঙ্গি সৃষ্টি করেছেন। প্রেমের কবি হয়েও সমকালের চলমানতাকে মান্যতা দিয়েছেন। ফুটে উঠেছে দেশ-কাল, মহাকালের দ্রোহ – যা বাংলা কবিতার ভুবনে ভিন্নধারার দিশা দিয়েছে। তাঁর কণ্ঠস্বর নিজস্ব ঘরানায় কথা বলে।বলিষ্ঠ সে কণ্ঠস্বর, প্রতিবাদীও বটে। মানুষ আর প্রকৃতির গভীর একাত্মতা প্রকাশিত হয়েছে‘আপেল কাহিনি’তে। বাইবেলের মিথের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশজ শেকড়ের অনুসন্ধান। আর আছে বহুকৌণিক বর্ণময় লৌকিক ধারণা। যা তাঁর কবিতাকে ভিন্নতর আস্বাদে পাঠককে ঋদ্ধ করেছে।
একই কবিতার মধ্যে পানি আর জল শব্দ ব্যবহার করে বাংলা কবিতার শব্দভাণ্ডারকে রসসিক্ত করে তুলেছে। কবি মজিদ মাহমুদ কি হিন্দু না মুসলিম, না কি খ্রীস্টান ! কবি এখানে অবশ্যই শুধু বাঙালি তথা বিশ্বনাগরিক। তাঁর শব্দচয়ন তার ছন্দকে মুক্তগদ্যে রসায়িত করে এক নতুন নান্দনিকতায় ভরিয়ে তুলেছেন। সাধারণ বিষয়কে বলার প্রকাশভঙ্গির দক্ষতায় অসাধারণ মাত্রায় কবিতার রসভাষ্যে পরিণত করে দেন। আর তার সঙ্গে যুক্ত পুরাণ কথা। সেই পৌরাণিক কাহিনীকে মিলিয়ে দেন আধুনিক যুগ যন্ত্রণার সঙ্গে।
কবি মজিদ মাহমুদের কবিতায় বিশেষ করে ‘আপেল কাহিনি’র কবিতার পরতে পরতে বঙ্গদেশের সমাজ অতিক্রম করে বহির্বিশ্বের পটভূমিতে রচিত হয়েছে বিশ্বায়নের অর্থনীতি। যেখানে নিজের দেশকে দেখতে পাওয়া যায় বৃহত্তর ভৌগোলিক পটভূমিতে।
পঞ্চাশ বছর বয়সী কবি মজিদ মাহমুদের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আপেল কাহিনি’(২০০২) ২৬টি কবিতার বিষয় বৈচিতর্্েযর পরিধি দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। দ্বিতীয় কাব্যের গতি প্রকৃতিতেই সহজেই অনুমান করা যায় – এই কবি বাংলা কবিতার ভুবন জয় করবে। বাংলা কবিতার ইতিবৃত্তে ‘আপেল কাহিনি’ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কবি মজিদ মাহমুদ শুধু বাংলা কবিতার নয়াসাধক নন, তিনি বাংলা কবিতার মনন জাগানিয়া হিসাবে বাংলা কবিতাকে অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারবেন। সর্বোপরি বাঙালির মুখের ভাষাকে কবিতার সাম্রাজ্যে বয়ন করে কবিতাকে শিল্পিত মর্মমূলে প্রবেশ করিয়েছেন। সহজ-সরল-বোধগম্য আটপৌরে ভাষায় আর সহজ গদ্যছন্দের যুগল মিলনে বাইবেলের ‘আপেল কাহিনি’, বাঙালির রাইফেলে পরিণত হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *