কবিতা কবির এক নিবিড় আত্মক্ষেত্র। যে ক্ষেত্রে বিচরণ করে কবি তুলে আনেন তাঁর মনন সমৃদ্ধ অনুভব। এই অনুভবের প্রতিটি অক্ষরে শিল্পীত হয় তাঁর বোধ, প্রেম, জীবনযাপনের সরল ও জটিল সারসত্যগুলি। চিরাচরিত চিন্তা ভাবনার উর্দ্ধে থেকে রচনা করেন কবিতার আশ্চর্য সুন্দর অবয়ব। নির্মাণ এবং সৃষ্টি কবিকে আত্মিক শুশ্রূষা দেয়। তার চেতনার স্তরে স্তরে প্রকাশ পায় অনালব্ধ সত্য। যার কাব্যিক মূল্য আমাদের সম্পদ হয়ে ওঠে। পাঠক হিসেবে কবির সৃষ্টি সুধাকে নিজস্ব দর্পণে প্রতিবিম্বিত করে আনন্দগুলি আত্মীকরণ করি। কবির ভাবনার সঙ্গে মিশিয়ে দিই আমাদের আন্তরিক ক্ষুধাগুলি। এই আত্মজগতের মধ্যে প্রকৃতি, মানুষ, মানুষের অমূল্য শক্তি যে প্রভাবকের ভূমিকায় কবিকে জারিত করে, তা তাঁর সৃষ্টি ও নির্মাণে বিশ্লেষিত হয়। কবির অন্তর নিঃসৃত শব্দধ্বনিই কবিতার শিল্পরূপ। এই ভাবনাগুলি জারিত হয় কবি মজিদ মাহমুদের কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে। কবি মজিদ মাহমুদ, বাংলাদেশের উদীয়মান আশির দশকের খ্যাতিমান কবি। দু’হাজার দু’সালের দিকে যখন প্রথম বাংলাদেশে আমন্ত্রিত হয়ে যাই, তখনই আলাপ হয়েছিল মজিদ মাহমুদের সঙ্গে। প্রথম আলাপে এক তরুণ সম্ভবত তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আপেল কাহিনি (২০০২)’ ভালোবেসে দিয়েছিলেন।
সেই সময় কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে প্রথম যে কথাটি মনে হয়েছিল – মজিদ মাহমুদ একজন শক্তিমান কবি। বাংলাদেশের বহু কবির কাব্যগ্রন্থ ও কবিতাপাঠ করে যে সারসত্যটুকু পেয়েছি তাতে মনে হয়েছে তাঁদের কবিতায় দেশমাতৃকার প্রতি যে দায়দায়িত্ব, প্রেম, দেশভক্তি প্রাধান্য পেয়েছে সবচেয়ে বেশি, তা স্বাভাবিক, কারণ তাঁরা চোখের সামনে নতুন দেশ তৈরী হতে দেখেছেন। মানুষ শহিদ হতে দেখেছেন, খুন, ধর্ষণ, মুক্তির জন্য হাহাকার, রাজাকার এবং পাকিস্তানী সৈনিকদের বর্বরোচিত অত্যাচার দেখেছেন – তার সমস্ত ছায়া কবিতার উপকরণে বহুভাবে চিত্রিত হয়েছে। এমনকি দু’হাজার পনেরোতে এসেও এ প্রজন্মের কবিকুল এই প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। তাঁদের কবিতার অক্ষরে, শরীরে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের জন্য, দেশমাতৃকার জন্য আবেদন আজও ফুটে ওঠে। কিন্তু এদের মধ্য থেকে এবং এই পরিবেশের উর্দ্ধে থেকে যে কবি সমস্ত রকম আঙ্গিক প্রথা ভেঙে কবিতা লিখতে শুরু করেছেন – তিনি মজিদ মাহমুদ। তাঁর আপেল কাহিনি কবিতাগুলি আমার পাঠে ও মেধায় অসাধারণ এক প্রতিক্রিয়া তৈরী করে দেয়। তখন থেকেই তাঁর কবিতার একজন একনিষ্ঠ পাঠক হয়ে পড়ি। যেহেতু দুটো দেশের ব্যবধান, যোগাযোগ ইত্যাদি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, তাই সেভাবে মনের ভালোলাগাটুকু জানানো সম্ভব হয়নি। আজ সেই সুযোগ পেয়েছি।
মজিদ মাহমুদ অস্তিত্ববাদী কবি। তিনি নিজের অস্তিত্ব খুঁড়ে খুঁড়ে ভাঙচুর করে লিখে চলেছেন। শক্তিশালী তার লেখনি, নিজের ভিতরে কতখানি সম্মোহিত হলে তবেই এই কবিতা রচনা করা যায়। তিনি কবিতা লেখার মগ্নতার আড়ালে ছড়িয়ে পড়েছেন বহুর মধ্যে। সাদা পাতার মধ্যে স্থিত অবয়ব ধারণ করে ছায়ার মতো উড়ে গেছেন স্বর্গ, মর্ত্য-পাতালে, ঘর, মাঠ-বন্দর, নদী-নালা, গ্রাম-শহর, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে শূন্য-মহাশূন্য, মহাকাশে, এমনকি মাতৃগর্ভের ভ্রুণ তাঁর জিজ্ঞাসার কিংবা অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। জন্ম মৃত্যুর ধারাবাহিক পর্যায়গুলোকে সামনে রেখে স্মৃতি-বিস্মৃতি, রিরংসা, কাতরতা, নস্টালজিয়া এবং লোক ও লৌকিকতার আবহে সিক্ত হয়েছেন। মিথ, পুরান, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্বের গভীরে কবিতার আলো ফেলে দেখেছেন; কবিতার শিল্পময় সত্তাতে আবৃত থেকেছেন। একনিষ্ঠ সাধকের ধ্যানমগ্নতায় কবিতাকে কবিতা করে প্রকাশ করেছেন। অন্তর্জগৎ ও বহিঃজগতের যা কিছু অধরা এবং অজ্ঞাত তাও তাঁর কল্পনার প্রেক্ষিতে উঠে এসেছে। ক্লাসিক কাব্যধর্ম তাঁর ভাষা, আতীন্দ্রিয়, আত্মিক অনুভূতি তাঁর কবিতা শরীর। মিথ পুরাণের ছায়ায় তিনি ছায়াবৃত হয়ে মিথ অনিত্যকে নিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে; ক্ষণিকের পাদপদ্মে পূজা করেছেন অথবা ধ্যান করেছেন চিরকালের, নশ্বরতাকে জয় করে তার ভিতরে স্থিত হয়ে অবলোকন করেছেন জীবন, প্রেমই তার উপপাদ্য, চেতন-অবচেতন মনে যা কিছু প্রত্যাশা করেছেন সবই কবিতায় শিল্পময় কথার অক্ষর। মজিদ মাহমুদ আশির দশকের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মাহফুজামঙ্গল’। প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পায়। তাঁর প্রবেশ কাব্যজগতে চিহ্নিত হয়ে যায়। সমস্ত প্রথা ভেঙে, সমকালীন কবিতার প্রভাব থেকে সরে এসে কবিতাকে করে তোলেন জীবনের আঙ্গিক। সমাজ ও জীবনের বহু অনুষঙ্গ এক কাব্যগ্রšে’র কবিতায়। মজিদ মাহমুদ সময় সচেতন কবি। তিনি আধ্যাত্ম ঊষরতা এবং এক মানসদ্বন্দ্বকে সামনে রেখে স্বকালের যুগ যন্ত্রণা এবং হৃদয়াবেগকে প্রাধান্য দিয়ে কবিতাগুলি লিখে চললেন। তাঁর অনুসন্ধানে সুফিবাদ। এই সুফিবাদের সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন কবিতায়। আল্লার সাধনায় প্রেম হয়ে উঠেছে এক অনুভূতি প্রবণ প্রখর আধ্যাত্ম চেতনার কবিতা। তিনি প্রেমকে উপজীব্য করে কবিতার শরীরে ঢেলে দিয়েছেন তাঁর ভক্তি। তাঁর আরাধ্য প্রভু কখনও সাধনার ক্ষেত্র স্বরূপ, কখন গুরুতুল্য, কখনও প্রেয়সী। কবিতার মধ্য দিয়েই তিনি যেন তাঁর সাধনার সার্থক রূপ প্রতিভাত করেছেন। নারী শরীরে পেয়েছেন সাধন রস। ভক্তিরসের সঙ্গে তাঁর উপাসনা ক্ষেত্র ছড়িয়ে বলে ওঠেন
ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে
সেই নারী এসে আমার হৃদয়মন তোলপাড় করে যায়
তখন আমার রুকু
আমার সেজদা
জায়নামাজ চেনে না
সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই
তোমার স্মরণে লিখেছি নব্য আয়াত
আমি এখন ঘুমে-জাগরণে জপি শুধু তোমার নাম।’ (কুরশিনামা)
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা। এই কবিতার প্রেরণাস্থল একজন রক্তমাংসের নারী; তাকে ঘিরে তাঁর যত সঞ্চার। কবি ব্যক্তি আবেগকে শিল্পীত করে তুলেছেন নানারূপে নানা প্রতীকে, নানা বর্ণে, উপমায়। রূপকের আড়ালে রূপময় করে ইতিহাস এবং পুরাণের ঘটনাবলী এবং মিথ ব্যবহার করে কবিতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন ভক্তি বা উপাসনার ক্ষেত্র রূপে। দয়িতার শরীর হয়ে উঠল তার এবাদতের অংশ। বললেন ‘মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা/ আমি নেড়ে চেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।’ ঈশ্বর ভক্তির সঙ্গে মাহফুজার স্তুতি। যাঁর এবাদত করার জন্য এই সৃষ্টি ও মানুষকুল, তাঁর এবাদতের স্থানান্তর ও রূপান্তর ঘটে যায়। তিনি আত্মনিবেদনের জন্য আত্মযন্ত্রণার সমস্ত নির্যাস ঢেলে লিখছেন – ‘নব্য আয়াত’। যদি মাহফুজাকে ছায়া হিসাবে ধরে নিয়ে রূপান্তর করি, তবে একক প্রভুর আরাধ্য করে দেন নিপুণভাবে। একটি অনুভবকে কাল্পনিক সত্তা দিয়ে আশ্চর্য রূপান্তর ঘটিয়েছেন। পার্থিব জীবনে মাহফুজার আবির্ভাব দৃশ্যত এক বোধের ভিতরে জন্ম নিয়েছে অনন্য চিত্র।
তোমার আমার মাঝখানে সত্তর হাজার আগুনের পর্দা
এখন তোমার কাছে সশরীরে উপস্থিত থাকতে চাই মাহফুজা
এখন তোমার আরশের নিচে
এখন তোমার কুরশির নিচে
আমাকে একটু ঠাঁই দাও মাহফুজা (মাহফুজা)
পাতায় পাতায় মাহফুজার জন্য আর্তি। মাহফুজার সত্তাকে সর্বময় করার জন্য তিনি সৃষ্টির প্রথম নারীকে সুচিত করেছেন। মাহফুজার রূপ-সুষমাকে প্রকাশের জন্য তিনি শিল্পীর শিল্পময় হাতে কারুকাজ করেছেন। তাজমহলের খুঁটির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর শিল্পীত চোখে ও মননের ভাষায় সবুজ প্রকৃতি যেন নারীর প্রলুব্ধকারী স্তন- আমি তো দেখি তোমার সবুজ স্তন-আগুনের ক্ষেত
অসম্ভব কারুকাজে বেড়ে ওঠা তাজমহলের খুঁটি
তোমার চুলের অরণ্যে পাই না কল্যাণের ঘ্রাণ। (খবর)
আবেগ মথিত, আচ্ছন্ন, ঘোর থেকে উঠে আসা হৃদয়ের আর্তি, প্রথম এবং প্রধান নারীর কাছে কাব্য বন্দনায় মাহফুজামঙ্গল। কবি ‘আমি’-র আড়ালে থেকে কাব্যকে মহাকাব্যের দিকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। মাহফুজা নামক এক ধ্রুপদী নারী যেন তাঁকে গ্রাস করে উচ্চারণ করেছেন বীজমন্ত্র এবং এক উৎস থেকে অন্য উৎসের দিকে উত্তরণ ঘটিয়েছেন। মাহফুজা যখন ইবাদতের লক্ষ্য। আবার কখন ইবাদতের মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাঁর বৈশিষ্ট্য সঞ্চারিত হয় প্রত্যক্ষজাত অভিজ্ঞতায়, কামে ক্রোধে, আত্মিক জিজ্ঞাসায়, প্রেমিকার সর্বস্ব যতরকমভাবে প্রত্যক্ষ করা যায় কিংবা কল্পনা করা যায় – তাই করেছেন। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে কখন সুফিবাদের ভাবধারায় এবং বৈষ্ণব সাধনার মধ্যে সিক্ত হয়ে যাই এবং ভারতীয় অন্যান্য ভক্তিবাদ ও সাধনার ক্ষেত্রগুলি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। মানব ইতিহাসে যত ভাবধারায় কাব্য রচিত হয়েছে তার ছায়া পড়ে মাহফুজা মঙ্গলে। ভারতীয় নানা শাস্ত্রে চিহ্নিত আদ্যাশক্তির প্রকাশ পায় এবং প্রভাবিত করে। মজিদ মাহমুদের মাহফুজামঙ্গল একটি আলেখ্য হয়ে থাকে পাঠকের কাছে। একদিন ভারতীয় কবিরা প্রকৃতি রোষে উদ্ধত দেব-দেবী পুজায় দেবীকে সন্তুষ্ট রাখতে রচনা করেছিলেন ‘মঙ্গলকাব্য’। সাপের দেবী ‘মনসা’ এবং বসন্তের দেবী ‘শীতলা’, উলা চন্ডী অন্নদাকে কেন্দ্র করে রচিত মঙ্গলকাব্য। রুদ্র, ভয়ঙ্কর প্রকৃতিকে বশ করার জন্য এই স্তুতি পাঠ। অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য মঙ্গলকাব্য রচনা প্রাধান্য ছিল বেশী। মানুষের এই অন্বেষণের স্পৃহা যুগে যুগে। বহু সংগ্রাম, উত্তরণ ও ধ্বংসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান শতাব্দীর পৃথিবী। এই শতাব্দীর বহু ধ্বংসলীলা মানবিক আচার আচরণ, যুদ্ধ, দাঙ্গা, রক্তক্ষয়ের ভিতর দিয়ে পৃথিবী ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিক্ষুব্ধ হচ্ছে মানুষ, মানুষের মন। এই অবক্ষয়ের মধ্য থেকে কবি চেয়েছেন মুক্তি। তাই কবিতার অন্তরে রচনা করেছেন মুক্তির গান। মঙ্গল কাব্যের মতই তার বন্দনা, মাহফুজাবন্দনা। পরিবর্তিত যুগে বদলে গেছে মুখের ভাষা, কাব্যের ভাষা, কবি মজিদ মাহমুদের চিন্তা চেতনায় প্রেম আশার, উত্তরণের পুজারীর নতুন রূপ নতুন চিন্তা, নতুন ভাষা ও নতুন প্রকরণে ঋদ্ধ ‘মাহফুজামঙ্গল’। কবির কাব্য ভাষার গুণে, চিন্তার অন্তর্জালে নতুন রূপের প্রকাশ মাহফুজামঙ্গল। সেই দ্রোহ, সেই আর্তি, সেই মহিমা মানবজাতি ও ঈশ্বরীয় ভাবধারায়।
মজিদ মাহমুদের মাহফুজামঙ্গল প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে। এরপর ২০০৩ সালে প্রায় ১৪ বছর পর প্রকাশিত তৃতীয় সংস্করণ, এতে সংযুক্ত হয় একটি অধ্যায় ‘উত্তর খন্ড’ এবং পরবর্তীতে ‘২০১২’তে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘যুদ্ধ মঙ্গল কাব্য’, অর্থাৎ ১৯৮৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত মাহফুজামঙ্গল রচনার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ ধরা পড়েছে।
চিরন্তন কবি-মনের স্ফূরণ। কবি যে আত্মিক সাধনায় মগ্ন হয়ে মঙ্গলকাব্যের মতই মাহফুজামঙ্গল রচনায় ব্রতী হয়েছেন, উত্তরখন্ডে কবিতাগুলিও সেই একই ভাবনার অনুষঙ্গী। এখানে সেই ‘মাহফুজা’ অন্যরূপে, অন্য ভাবনার প্রতীকে, রূপে রূপান্তরে সৃষ্টিতত্ত্বের, বৈজ্ঞানিক আবহে অঙ্কিত হয়েছে। বলা যেতে পারে এই উত্তরখন্ডের সমস্ত কবিতাগুলি সুফিতত্ত্বের আলোকে আলোকিত। গ্রষ্টার মহিমায় চিত্রিত ভক্তের মনোবেদনার প্রকাশ। মাহফুজামঙ্গল উত্তরখন্ডের প্রথম কবিতা ‘হারানো গল্প’। সৃষ্টির সময় গ্রষ্টা বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন। সৃষ্টি থেকে তার জন্য আর্তি, মনোবেদনা। সৃষ্টি ক্রমাগত পথ পরিবর্তন করে মিলন মুহূর্তটি উজ্জ্বল করার আকাঙ্খায় রয়েছেন। সুফিদের মতই মজিদ মাহমুদ তাঁর ভক্তিরসের নৈবেদ্যর অর্ঘ্য অপর্ণের চিত্র চিরাচরিত আখ্যান ‘তবু অনেকখানি পথ একা হেঁটেছি / অনেক ভুল মানুষের সঙ্গে আলিঙ্গন করেছি / আমার জীবন অসংখ্য অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ভরা / অথচ তোমার কথা আমার জানা ছিল না (হারানো গল্প)। এই হারিয়ে যাবার থেকে নিভৃতে নেওয়া উত্তরোত্তর বাঁক যা প্রাণের প্রিয় মানুষকে একাত্মে আনা স্বপ্নময় পথ তৈরি করে দেয়। একনিষ্ঠ প্রেমিকের মতো বাঁক পেরিয়ে, বাধা পেরিয়ে ‘আমি সহস্রকোটি আগুনের নদী / কংকরময় পর্বত, অসংখ্য মড়ক পার হয়ে এসেছি’ ভাবরাজ্যের গভীরে প্রবেশ করেছেন। এখানে ‘নদী ও যুবক’ নামে দুটি কবিতার তিনি শিল্পময়তার ছাপ রেখেছেন স্পষ্টভাবে। ‘সুউচ্চ পর্বতের শিখর থেকে গড়িয়ে পড়ার আগে / তুমি পাদদেশে নদী বিছিয়ে দিয়েছিল মাহফুজা / আজ সবাই শুনছে জলপ্রপাতের শব্দ / নদীর তীর ঘেঁষে জেগে উঠছে অসংখ্য বসতি / ডিমের ভেতর থেকে চঞ্চুতে কষ্ট নিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে / কিন্তু কেউ দেখছে না পানির নিচে বিছিয়ে দেয়া / তোমার কোমল করতল আমাকে মাছের মতো / ভাসিয়ে রেখেছে’ (নদী)।
প্রশ্ন আসে মাহফুজা কে? কবির প্রেমিকা না কাল্পনিক কোন সত্তা? নাকি জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কিংবা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নীরা’র কাব্যিক রূপ? ‘মাহফুজা’ এই আরবি শব্দের অর্থ ‘সংরক্ষিতা’অথবা ‘সংরক্ষিত’। যিনি নিরাপদ নিরাপত্তায় থাকেন তিনি মাহফুজ। মজিদ মাহমুদ এই শব্দটিকে স্ত্রী লিঙ্গে ব্যবহার করেছেন ‘মাহফুজা’। কবির কাব্য সম্প্রসারণে মাহফুজাকে আমরা আত্মস্থ করি কখনও সৃষ্টি রূপে, কখনও ইতিহাসের প্রতীকে, কখনও ধ্বংসের আবহে, কখনও বা মৌনতায়, যৌনতায়, শব্দে, নৈঃশব্দে, শূন্যতায়, শূন্যে, আর ধারাবাহিক জন্ম ও মৃত্যুর গ্রোতে, জীবনের সুক্ষ¥াতিসূক্ষ¥ কতায়, এমনকি বিজ্ঞানে, রাজনীতি, অর্থনীতির সমাজ, দর্শন, শিল্পকলায়, ধর্মে, অধর্মে, নস্টালজিয়ায় যুদ্ধে, যুদ্ধের মহামারীর এবং সাধকের অন্তঃসলিলে, বুদ্ধের স্মরণ ছায়ায় বোধ ও বোধির অন্তরালে একজন মাহফুজা কবিকে পরিচালনা করেছেন কাব্যের নব রূপে, বিচিত্র পথে, বিচিত্র রূপে। পুরাণ ও পৌরাণিকতায় আবেশ এমনকি বিদেশী ছত্রছায়ায়। কবি মজিদ মাহমুদ মাহফুজা নামক সত্তার মধ্যে দিয়ে নিবেদিত করেছেন বাংলাদেশ প্রকৃতি, দুর্যোগ, বাংলাদেশের সমাজ, কৃষকের কথা ইত্যাদির মঙ্গল সাধনায়। জগত্মঙ্গলের কাব্য রচনা করেছেন। আদতে জীবনেরই মঙ্গলকাব্য। উত্তরখন্ডের কবিতাগুলির মধ্যে সাধকের পবিত্রতায় এক শুভ নৈবেদ্য অর্পণের আভাস পাওয়া যায়। এই পর্বের কবিতাগুলির মধ্যে, ‘ক্রীতদাসী, পুরস্কার, কঙ্কালের শিস, দুধের নহর, আদ্যাক্ষর, একটি হাত, জুম চাষ, যুপকাঠ, আশ্রয়, বহুগামী, মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি, আড়িপাতা, শূন্যতা, কেয়ামত ইত্যাদি কবিতাগুলি মঙ্গলকাব্যের ঐতিহ্য বহন করে। কবিতায় ঈশ্বর মহিমায়, প্রকৃতি মহিমায় মহিমান্বিত করে তুলেছেন। মাহফুজামঙ্গল অত্যন্ত রহস্যময়তার আড়ালে শাশ্বত সত্যকে প্রকাশ করেছেন।
‘যুদ্ধমঙ্গল কাব্যে’কবিতাগুলি ৮টি কবিতার মধ্যে ৬টি টানা গদ্যে রচিত। কবি মজিদ মাহমুদ আমাদের আস্বস্ত রেখেছেন মাহফুজাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে। এত কেন্দ্রাতিক বলে আমরা আত্মমগ্ন হয়ে উঠি। এ বিশ্বের ভার যার হাতে নিয়ন্ত্রিত সেই ক্ষমতাসীন ঐক্যের কাছে প্রার্থনা রত। অভাব-অভিযোগ, জিজ্ঞাসা, উত্তরণের পর্যায়ে উন্নীত করার প্রয়াস – যুদ্ধ-১, যুদ্ধ -২, যুদ্ধ -৩ থেকে যুদ্ধ -৭ ইত্যাদি কবিতায় দেশমাতৃকার প্রতি তাঁর আত্মনিবেদন ‘মাহফুজা, আমাদের আত্মা থেমে আছে একটি যুদ্ধের ভেতর / হতে পারে দুইকুড়ি / কিংবা দুই হাজার বছরের পুরনো সে যুদ্ধ, লোকক্ষয় এবং হত্যা, কত কম লোক / কত বেশি লোককে মেরেছিল – যুদ্ধ তো এ সব বোকা বানাবার গল্প’ (যুদ্ধ-৬) দেশমাতৃকার জন্য আকুল প্রতিবেদন এ পৃথিবীতে জীবনহানির যে করুণ পরিণতি তাই নিয়ে কবির প্রতীকী লড়াই –
‘এবার আমি সম্মুখযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করলাম মাহফুজা / এবার আমি গ্রহণ করলাম গেরিলাযুদ্ধের কৌশল। আমাদের পরস্পরকে ধরাশায়ী করা ছাড়া আর কোনো যুদ্ধ থাকবে না পৃথিবীতে …/ তুমি শাদা চামড়ার চতুর ব্রিটিশ / তুমি ভয়াল পাঞ্জাবী / তোমাকে পরাস্ত করা ছাড়া আমার রক্তের উদ্দামতা থামে না। আমাদের এই শত্রুতা আজন্ম মাহফুজা… (যুদ্ধ – ১ )
নিজস্ব ভাষা নির্মাণের অধিকারী মজিদ মাহমুদ। তিনি একজন বিচিত্র বোধের কবি। তিনি কবিতায় ইসলামি মিথ, ভারতীয় মিথ, পশ্চিমী মিথ, প্রাচীন ঐতিহাসিক মিথ ব্যবহার করে কবিতাকে শিল্পময় করে, কবিতাকে রসোত্তীর্ণ করেছেন।
মাহফুজামঙ্গল এক মহাকাব্যের দিকে বাঁক নিয়ে কালোত্তীর্ণ কাব্য রচনা করেছেন। এই কাব্যে ধরা পড়েছে বহুমুখী জীবনের আখ্যান ও বৈচিত্র্যময় প্রতিচ্ছবি। ঈশ্বরের মহাশক্তি কতার অপূর্ব বিচ্ছুরণ, সৃষ্টি ও লয়ের স্মৃতি স্মারক। তাঁর কাব্য চিন্তায় মঙ্গলময়, শব্দ ও প্রকৃতির মতই শুদ্ধতার প্রতীক রূপে ধরা পড়েছে। সাধক কবি মজিদ মাহমুদ জীবনের মৌল প্রার্থনাগুলিকে এবাদত রূপে কবিতায় প্রকাশ করেছেন। আমাদের ধ্বংসের মুখে এ এক আশ্রয়ের কবিতা। এই কাব্যগ্রন্থ ‘মাহফুজামঙ্গল’ পশ্চিম বছরেরও বেশি কাল অতিক্রম করে গেছে; আমি বা আমাদের বিশ্বাস এ কাব্য কাল উত্তীর্ণ করে যাবে। সেই সময়ের দিকে আমাদের চেয়ে থাকা।
মাহফুজামঙ্গল পড়তে পড়তে এক ঘোর লাগা মানুষের মতো এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে আছি যা ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না। তাঁর অপরাপর কাব্যগ্রন্থ বল উপাখ্যান (২০০১), আপেল কাহিনি (২০০২), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৭), সিংহ গর্দভের কবিতা (২০১২), অণুবিশ্বের কবিতা (২০০৮), ভালোবাসা পরভাষা (২০১৫), চিনা কবিতা ইত্যাদি আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিটি কাব্যগ্রন্থের শরীরে ভরে আছে ধ্রুপদী সুর। মজিদ মাহমুদ এক নতুন কাব্যভাষায় ও কাব্যচিন্তায় অন্তর্গত জগতের এবং পরাবাস্তববাদ কিংবা আধিবাস্তববাদকে প্রাধান্য করে, এক স্বপ্ন ও স্বপ্নজগতের মধ্যে বিরাজ করছেন। দর্শন চেতনা ও ভাব চেতনার মিলন কবিতাগুলিকে করে তুলেছেন অনুভবের আত্মস্থিত ঐতিহ্যময়। সৃষ্টির রহস্যের নিগূঢ়তম রহস্য এখানে প্রাধান্য পেয়েছে সৃষ্টির ধারাবাহিকতা, জন্ম ও মৃত্যুর সাযয্য ধরা পড়েছে বিভিন্ন প্রতীকে, শব্দে, উপমায়। নিজেকে ভেঙে খণ্ড খণ্ড করে বিচিত্র রূপে প্রকাশ করেছেন, তাঁর চেতনায় ধরা পড়েছে দেশ, কাল, মহাকাল, জন্ম-মৃত্যু, জীবনের নানা প্রাসঙ্গিকতা, মৃতের জগত থেকে অলৌকিক অন্বেষণ; আত্মা ও আধ্যাত্মচেতনার বহিঃপ্রকাশ। মজিদ মাহমুদ কবিতামালার ‘ভূমিকা’য় অসাধারণ কথা স্বীকার করেছেন – ‘এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল মাতৃগর্ভ থেকে, পিতার ঔরস থেকে, যখন একজন পুরুষ ও নারী ভাগাভাগি করে আমাকে বহন করছিল। এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল পিতাদের জন্মের আগে, মাইটোসিস, মেয়োসিস বিভাজনের আগে …’ ঠিক তাই কবির চিন্তাভাবনা জীব, জড় থেকে মাটি, বৃক্ষ, প্রকৃতি, উর্দ্ধ-অধঃ, সমস্ত সৌরমণ্ডলি আকাশ মার্গীয় চেতনার ভিতরে, অণু থেকে পরমাণু, বিচিত্র শূন্যবোধ থেকে মহাশূন্য যাবতীয় তেজস্বী রশ্মি তার ভিতরে তিনি তাঁর কাব্যচিন্তাকে ছড়িয়ে অপূর্ব এক ধ্রুপদী সঙ্গীত রচনা করেছেন। সমকালীন বাংলা কবিতায় তিনি ও তাঁর রচনা ঐতিহ্যময় সংযোজন। এই কাব্যগ্রন্থ পাঠে মনের অসারতা দূর হয়ে যায়। চিত্ত প্রফুল্ল হয়, শুশ্রূষা দেয়। কবির বিচরণভূমি স্বপ্নের স্তর পেরিয়ে, আধ্যাত্মিক জগত পেরিয়ে কোন এক অবাস্তব স্তরে ‘এই কবিতাগুলো নিজেই লিখিত হয়েছিল, এই কবিতাগুলো সবাই মিলে রচনা করেছিল। এই কবিতাগুলো কেউ শুরু করে নাই, এই কবিতাগুলো কেউ শেষ করতে পারবে না ../’আরও আরও কোন উন্মোচনের অপেক্ষায় রয়েছেন কবি, যা লেখা হয় নি, যা লেখা হবে তার ধ্বনি কবি ধারণ করে আছেন অন্তরে, কোনো অন্তর্লোক হতে তার আহ্বান শুনেছেন। কবি জাগ্রত তাঁর বিচরণ ভূমিতে। তিনি ধারণ করবেন এমন এক সুর, এমন এক প্রবাহ যা কবিতায় আশ্চর্য উন্মেষ ঘটাবে। কয়েকটি উদ্ধৃত করলেই মজিদ মাহমুদের স্বরূপ চেনা যাবে।
‘প্রথমে একটি গোল অথচ নিরাকার বলের মধ্য দিয়ে
গড়াতে গড়াতে আমি তোমার শরীর থেকে পৃথক হয়ে গেলাম
আর সেই থেকে তুমি’…
৫৪ লাইনের এই কবিতাটিতে কোন যতি চিহ্ন নেই। ধারাবাহিকভাবে চলমানতার ছন্দ সৃষ্টি ধারা। শেষে-
‘অথচ এই গোনাহ থেকে নাজাতের কোনো পথ খোলা নেই
কেবল একটি নিরাকার বল তোমার শরীর থেকে
পৃথক হয়ে অনবরত ছুটে চলেছে …
ধারাবাহিক জন্ম গতিময় প্রকৃতি বোঝাতে ‘বল উপাখ্যান’ কবিতাটি আশ্চর্য পরম্পরার কথা বুঝিয়ে দেয়।
.. কাল রাতে ফিরে এসে পক্ষিমাতা তার সন্তানের মৃতদেহ নিয়ে
কোথায় যাবে, গাছের বিড়ম্বনা একঠাই দাঁড়িয়ে থাকা
গাছের বিড়ম্বনা পায়ের ব্যথা, তবু মানুষের জন্য অম্লজান
তৈরীর আনন্দ আছে, আমার শুষ্ক ডালের মধ্যে রয়েছে আগুন
আগুন মানে ঈশ্বর, জীবনের অক্ষ বিন্দু, হা ঈশ্বর !
পাখি আর গাছ, গাছ আর মানুষ
এই ত্রিভূজ কষ্টের মধ্যে আনন্দ কোথায়! (গাছজীবন)
উদ্ধৃতি বাড়িয়ে লাভ নেই পাঠক কাব্যগ্রন্থটি সংগ্রহ করে পড়ে নেবেন। এই কাব্যগ্রন্থের ‘বনসাই, জাতক, বাবা, গানের শরীর, সাব এডিটর, অন্ধকার, অলৌকিক বেদনা’ইত্যাদি মনে রাখার মতো। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটায়, কাব্য চেতনায় নিবিড় করে তোলে।
‘আপেল কাহিনি’ – মজিদ মাহমুদের আরেকটি অসাধারণ কাব্যগ্রš’। এখানেও সেই একই সুর, একই ভাবনা, তবে অন্যরূপে ও রূপান্তরে, মজিদ মাহমুদ একজন দক্ষ চিন্তাবিদ, তিনি অণু পরমাণু থেকে বিশ্বভাবনার স্বরূপ খুঁজে চলেছেন। মানব জীবনের সুখ দুঃখ, চাওয়া পাওয়া ছড়িয়ে দেন কবিতার গভীরে। শব্দের শরীরে তার ব্যঞ্জনা শোনা যায়। কবিতার শিকড়ে তার ক্ষোভ, দ্রোহ, ঈশ্বর ভাবনা, বেদনা শৈল্পিকভাবে প্রচ্ছন্ন ও প্রকট রূপে প্রতীয়মান। তিনি খুব সচেতন ভাবে কবিতার মধ্যে মিথ ব্যবহার করেন। মূলত প্রেমকে কেন্দ্র করে তার অস্তিত্ব বিরাজ করে। তিনি জড় থেকে প্রাণের মধ্যে ছড়িয়ে দেন তাঁর চিন্তার আকর। কবিতার মধ্যে মজিদ মাহমুদের প্রেম আর বাস্তব থাকে না, তা হয়ে যায় গভীর এক স্থির প্রজ্ঞার। তার অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার সঙ্গে যুক্ত হয় আপেল, সাপ, ইলিশ, আনন্দ, বেদনা ইত্যাদি। মজিদ মাহমুদ জীবনকে গভীরভাবে পাঠ করেছেন। সেই অর্জিত প্রজ্ঞাগুলি তাঁর কবিতার অস্তিত্ব। তাঁর দর্শন চিন্তা, দূরগামী পথের দিকে অনন্তর যাত্রার উপলব্ধি জাত চিন্তার নিবেদন আপেল কাহিনি ও বল উপাখ্যানের মধ্যে আশির দশকের কবি সঞ্চরন করেছে অপূর্ব বোধের দিকে যেখানে তাঁর সময়, সমাজ, ব্যক্তিত্ব, আর্তি, স্বপ্ন-সম্ভাবনা অপরিসীম পূর্ণতায় ছায়া হয়ে আছে। সূক্ষাতিসুক্ষ অনুভবের দিকে কবির গমন। কবির কবিতায় আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মমগ্নতার কথা বলেন, বেশ স্বচ্ছ সরলতায়।
মাহফুজামঙ্গলের পরবর্তী সময়ে তাঁর চেতনার বাঁক বদল হয়। কবিতার মধ্যে পূর্ব জন্মের চিত্র এক আখ্যান তৈরী করে। তাঁর চেতনায় ছায়া ফেলে ধর্মীয় চিন্তা, ইসলামী, পুরান, ঐশ্বরিক আবহ কবি শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনার’ সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে-
‘অবাধ্য! তবু সে পুত্র আমার
মানুষের পাশে থেকে করেছে বিদ্রোহ
সবাই জানে তোমার নৌকায় সে লেখায়নি নাম
তাই বলে তার ধান ডুবে যাবে !
পর্বতের গোড়ালির মতো অহংকার নিয়ে জেগে আছে
মানব সন্তান
একদিকে নবুয়ত অন্যদিকে পুত্রের মায়া
আমি পুত্রের মায়া চাই
আমার পুত্র আজ ডুবে যাচ্ছে গজবের জলে
সেই জলে আমি নৌকা চালাব
এক জোড়া মানুষের নমুনা নিয়ে !
তোমার নতুন স্বর্গগড়ার স্বপ্নে আমার কোনো ভালোবাসা নেই।
(পুত্র ডুবে যাচ্ছে)
কবি মাত্রই গ্রষ্টা। তবে পরম করুণাময়ের মতই অমিত শক্তির অধিকারী নন। হবেও না কোনদিন। সৃষ্টির সকল সৌন্দর্য প্রভাব ফেলেছে তাঁর কবিতার শরীরে। চিন্তাজগতে ছুঁয়ে আছে নৈসর্গিক আবহ, প্রেম। কবি মজিদ মাহমুদের ‘বল উপাখ্যান’ এই চিন্তাশীলতার উপাখ্যান।
কবি মজিদ মাহমুদের কবিতা অনুপম সৌন্দরে্যর অধিকারী। বিষয় ভাবনা, ভাষা, শৈলীতে তিনি উল্লেখযোগ্যতার স্থান করে নিয়েছেন। মানুষের গহন-গভীর কান্নায় তিনি শুশ্রূষার প্রলেপ দেন। তাঁর কবিতায় মূল আবহ ‘নতুন মিথ ও মেটাফরের উপস্থিতি’। কবিতায় আছে জীবন সঙ্গীতের ছন্দোময় দোলা। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক-
‘মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়
তুমি ছাড়া আর কোনো প্রার্থনায়
আমার শরীর এমন একাগ্রতায় হয় না নত
তোমার আগুনে আমি নিঃশেষ হই
যাতে তুমি হও সুখী
তোমার সন্নিধ্যে এলে জেগে ওঠে প্রবল ঈশ্বর
তুমি তখন ঢাল হয়ে তাঁর তির্যক রোশানি ঠেকাও
তোমার ছোঁয়া পেলে আমার আজাব কমে আসে সত্তরগুণ
আমি রোজ মকশো করি তোমার নামের বিশুদ্ধ বানান
কোথায় পড়েছে জানি তাসদিদ জজম
আমার বিগলিত তেলওয়াত শোনে ইনসান
তোমার নামে কোরবানি আমার সন্তান
যুপকাঠে মাথা রেখে কাঁপবে না নব্য ইসমাইল
মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়। (এবাদত)
মাহফুজামঙ্গলের ‘এবাদত’ কবিতাটি পড়তে পড়তে আশ্চর্য অনুভবে জারিত হতে থাকি। কবি কোরাণ শরীফটাকে আত্ম¯’ করেছেন। কবিতাকে এবাদতের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। কবিতার মধ্যে রয়েছে তাঁর ঈশ্বর সাধনা। অনস্তিত্বকে অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। একটি অদৃশ্যমান জগৎকে মাহফুজার মধ্যে পূর্ণতা দিয়েছেন – এ তাঁর আতীন্দ্রিয় সাধনা।
মজিদ মাহমুদের কবিতা ঠিক প্রচলিত অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর বৈশিষ্ট্য হল নিজস্বতা। জীবন কী, বহুরূপে দেখার দৃষ্টি। এক দার্শনিকতা, যে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী কবিতার ঐতিহ্যকে নতুনত্ব দান করে। জীব ও জড়ের মধ্য থেকে নির্বাচিত ভাষা গ্রহণ করেন অতি নিষ্ঠার সঙ্গে। কবি-জীবনের সার্বিক উন্নতি কামনা করি। তাঁর অনিকেত প্রার্থনার সঙ্গে যুক্ত করি চির শাশ্বতের প্রার্থনা।



