মজিদ মাহমুদের কবিতা-স্বপ্ন ও বাস্তবের এক আশ্চর্য পরিভ্রমণ

বিষয় যদি হয় কবিতা এবং প্রসঙ্গ ওপার বাংলার কোনও কবি তবে কথা বলা নিঃসন্দেহে কঠিন হয়ে পড়ে। সমস্যা অন্য কিছু নয়, সমস্যা অপরিচয়ের, ঘনিষ্ঠভাবে চেনা জানার। বাঁধা ‘কাঁটাতারের’-শুধু সীমান্তে নয়, আমাদের জীবনে-মননে, চিন্তা-চেতনায়। সঙ্গতভাবেই মনে পড়ে কবির সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গণের ধারে / ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে’। অথচ পাড়াটা তো আমারও, ওপারেই তো ফেলে এসেছি নিজের জন্মভিটাটাও। তাহলে অপরিচয়ের কারণে আজ কেন আমাদের চিত্তপীড়ায় ভুগতে হয়? ওপারে যেসব কবি, সাহিত্যিকরা আমারই মাতৃভাষায় আমাদের সাহিত্য ভান্ডার ভরিয়ে তুলেছেন তাদের কতটুকু আমাদের জানা? কতজনের সঙ্গে গড়ে উঠেছে আমাদের আত্মার আত্মীয়তা ? পৃথিবীর অন্য কোনও ভাষাভাষীদের ক্ষেত্রে বোধ হয় সমস্যাটা অনুরূপ নয়। বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তার আজ সময় এসেছে।
হতে পারে এবং অবশ্যই এটা ঘটনা যে, সকলের ক্ষেত্রে এটা সাধারণ সত্য নয়। শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ প্রমুখ কতিপয় প্রখ্যাত কবি এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক্ বা শহীদ সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের ক্ষেত্রে নানা কারণে ওই অপরিচয়ের পাঁচিলটা ব্যবধান রচনা করে নেই। কিন্তু শতশত সৃষ্টিশীল সাহিত্যগ্রষ্টাদের সম্পর্কেতো আমরা সে দাবী করতে পারবো না। শুনেছি, এপার বাংলার কবি সাহিত্যিকরা ওপারে প্রচুর সমাদর পান। এপারেও চিত্রটা বদলের বড় আশু প্রয়োজন আজ। যাইহোক, অনুরোধ এসেছে মজিদ মাহমুদকে নিয়ে কিছু লিখবার, যিনি ওপারে একজন খ্যাতিমান কবি। অথচ আমাদের সুপরিচিত নন। বিষয়টা আরও কঠিন হয়ে গেল, কারণ কথা বলতে হবে কবিতা নিয়ে। গত তিরিশ চল্লিশ দশকের কবিতা মুখ ঢেকেছে আত্মগত চেতনার নির্মোকে যা ভেদ করা খুব সহজসাধ্য নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই কবিরা নিজেরাই নিজেদের বিষয় চেতনা নিয়ে আজ রীতিমতো ‘কনফিউস্ড’ অবশ্য বিষয় বলে যদি কিছু থাকে তাতে। কবিতা নিয়ে ‘কবিতার দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে’ নামক নিবন্ধে মজিদ যেমন মন্তব্য করেন, ‘আজকের কবি যে উপলব্ধি করেন, তা একান্ত তার নিজের – অন্যের সঙ্গে মিলে গেলে বলতে হয় এটি তার চিন্তার সামান্যিকরণ’ – অর্থাৎ পাঠক কবির চিন্তার অন্তরে প্রবেশ করে তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়লে কবির কবিতা মহিমা হারায়। ওই একই প্রবন্ধে মহিজ মাহমুদ আরও মন্তব্য করেন, ‘কবিতার বাইরের লোকজনের কবিতা নিয়ে কথা বলার দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে।’ এমত মন্তব্য থেকে পাঠকের মনে হওয়া অসঙ্গত নয় যে, কবি না হয়ে, কবিতা না লিখে, কবিতা সম্পর্কে মতামত দান সঙ্গত নয় বা এমন কারো পক্ষে তা সম্ভবপরও নয়। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন উঠবে কবিতা তাহলে কবিরা লিখছেন কেন এবং কার জন্য? যেকোনও শিল্প মাধ্যমেরই একটা ‘কম্যুনিকেটিভ’ বা সংযোগ সাধনের দিক রয়েছে। অন্যথায় তার সৃষ্টি মাহাত্ম্যই ব্যাহত হয়। কবির ভাষায়, ‘একজন গাহিবে ছাড়িয়া গলা, অন্যজন গাহিবে মনে।’ অর্থাৎ গ্রষ্টা ও সমঝদার মিলে একটা ঐকতান গড়ে তোলা, তাকে সম্পূর্ণতা দান। ভয় হয় আজকের কবিতা এই ঐকতানের মাহাত্ম্য হারিয়ে কেবলই একতারার সুরে মজেছে। সে কারণেই কবিতা সম্পর্কে কথা বলতে শঙ্কা হয়। তবু বলতে হয় বিশেষ প্রয়োজনেই। যাই হোক মজিদ মাহমুদের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা” এবং ‘সাহিত্য চিন্তা ও বিপরীতভাবনা’ এই দুইখানি বই সম্বল করে এই কসরতে অগ্রসর হওয়া গেল এই নিবন্ধের রচনায়।
(২)
আমরা জেনেছি মজিদ মাহমুদের জন্ম ১৯৬৬ সালে। এ এমন এক সময় যখন আমরা অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি যে, সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান তখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে এক ফুটন্ত কড়াই। আয়ুবী সামরিক শাসন ও পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বত্র জ্বলতে শুরু করেছে ধিকিধিকি রোষের আগুন। যার শুরু সেই বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে। মহিজ মাহমুদের জন্মের ক্ষণকাল পরেই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত হবেন শেখ মুজিবর রহমান। তাঁর মুক্তির দাবীতেও দেশে জ্বলবে রোষানল। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ভাবে জিতেও মুজিব ব্যর্থ হবেন সরকার গড়তে এবং ইয়াহিয়া ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে বাংলাদেশ পরিণত হবে এক বধ্যভূমিতে। ডাক দেওয়া হবে স্বাধীনতার মুক্তির। যার পরিণতিতে ঘটবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। দেশ ভাসবে রক্তগঙ্গায়। তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তদান, লক্ষ নারীর ধর্ষিত হওয়া এবং দেশের প্রথম সারির সব মনীষী ও মেধার হত্যার বিনিময়ে বাংলাদেশ উপস্থিত হবে মুক্তির দ্বারপ্রান্তে। দেশ ও জাতির এমন সংকটকালে, উপমহাদেশের বীভৎসতম নারকীয় নরমেধ যজ্ঞকালে সংবেদনশীল কবি কণ্ঠ কী নিশ্চুপ থাকতে পারে? আমরা জানি, ইতিহাস জানে তা থাকেওনি। এই উত্তাল সময়ে নির্মলেন্দু গুণের কলম থেকে বের হয়ে এলো সেই বিখ্যাত চরণ, ‘হৃদ্রয়ে লাগিল দোলা / জনসমুদ্রে লাগিল জোয়ার / সকল দুয়ার খোলা –
শামসুর রাহমানের কলমে উচ্চারিত হল যুগান্তকারী সেই সব লাইন – ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা / তোমাকে পাওয়ার জন্য / আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/ আর কতবার দেখতে হবে খান্ডব দাহন ?
এই উত্তাল, অস্থিরতা সময়ে অর্থাৎ ‘একাত্তরে’ মজিদ মাহমুদ নিতান্ত বালক হলেও এই রক্তাক্ত সময়ের স্মৃতি বহন করে এবং স্বদেশের রক্ত পিচ্ছিল পথে পদচারণা করেই মজিদ মাহমুদ একসময়ে যৌবনে উপনীত হয়েছেন। সাহিত্য ভালবেসে তাঁর কলমও কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছে। তখন গত শতকের আশির দশক। অত রক্তপাত, হত্যা, ধর্ষণের স্মৃতি বড় টাটকা তখনও। শুধু কি তাই? মুজিব হত্যা, নতুনতর স্বৈর শাসনের সূচনা এবং মৌলবাদ তার ধারালো নখ ও চঞ্চ নিয়ে আবার আক্রমণ শুরু করেছে। যাদের তাড়নায় নব্বই-এর দশকের শুরুতে দেশ থেকে বিতাড়িত হবেন এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শুধুমাত্র তাঁর নিরীশ্বরবাদী চিন্তা ও বিশ্বাসের কারণে। এই সময়েই কবি রুদ্রমোহম্মদ শহীদুল্লাহর কলম থেকে বেরোবে সেই অবিস্মরণীয় চরণ- ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরানো শকুন,/ রক্তের কফিনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে, / সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা’ – এবং তারপরই সেই অমোঘ চরণ, ‘ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা। ’
এই তীব্র ঘৃণা ও নির্যাতিত মানবাত্মার প্রতি একাত্মতা বোধই হয়তো প্রকৃত নজরুলীয় উত্তরাধিকার। এই বোধ কবি বা লেখকের স্বোপার্জিত। এ আরোপ করা যায় না। লেখক বা কবি তাঁর নিজস্ব চেতনার আলোয় পথ হাঁটেন। যেন আমরা মজিদ মাহমুদের ক্ষেত্রে দেখি, রুদ্রতো দূরে থাকুক, মজিদ তাঁর পূর্বসুরী কোনও কবি, যাঁরা একাত্তরের রক্তস্মৃতিতে নিজেদের বোধ ও চেতনাকে রঞ্জিত করে সাহিত্য রচনা করেছেন, তাঁদের কেউই তার মধ্যে ছায়াপাত করেননি। তাঁর চেতনার জগৎ জুড়ে যদি কোনও কবি প্রভাব বিস্তার করে থাকেন তবে তিনি জীবনানন্দ। যে জীবনানন্দ ৩০ থেকে ৫০ দশকে যখন জাতি বিদেশী শাসকদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে এবং এক বিশ্বযুদ্ধ তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করছে, তখন তিনি এক নগ্ননির্জন পথ ধরে আপনার একান্ত মগ্ন অনুভবের জগতে একাকী বিচরণ করছেন। স্বদেশের ক্ষোভ বিক্ষোভের যন্ত্রণার, ক্ষতের রক্তাক্ত চিহ্ন তাঁর কবিতা ধারণ করেনি। অথচ অনেকের মতে তিনি রবীন্দ্রোত্তর যুগের শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর সঙ্গে মজিদ মাহমুদের মস্ত মিল এইখানে যে তিনিও তাঁর কবিতায় স্বদেশের রক্তাক্ত সময়কে ও স্মৃতিকে আমল দেননি। তিনি কবিতায় রচনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন এক স্বভূবন। আশির দশকের শেষ তিনি এক আশ্চর্য চেতনা সম্বল করে লিখে ফেললেন ‘মাহফুজামঙ্গল’ নামক এক কাব্য। এর নামকরণ থেকে চেতনার জগৎ কোনওটাই পাঠকের নিকট সুপরিচিত হওয়ার কথা নয়। তবে নিঃসন্দেহে এই গ্রন্থের কবিতাগুলি সুলিখিত ও সুখপাঠ্য। এই পুস্তকের কবিতার ভূবন একেবারেই স্বতন্ত্র। কবির স্বনির্মিত। তাঁর পূর্বসুরীরা বা অনেক সমকালীন কবি বন্ধুরা যখন স্বদেশের নিরন্তর রক্তপাত, অস্থিরতা ও যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে পথ হেঁটেছেন, কেউ কেউ আবার ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ শুঁকে উতলা হয়েছেন, তখন মজিদ সযত্নে তাদের পথ পরিহার করে এক নিজস্ব স্বপ্নের জগতে উড়ান দিয়েছেন। সেই স্বপ্নের উড়ানের নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। রবীন্দ্রোত্তর যুগে এসে কোনও কবি তাঁর কাব্যগ্রšে’র নাম মঙ্গলকবিদের অনুকরণে রাখবেন এটা ভাবা একেবারেই অসম্ভব। তবু তিনি সেই বিপরীত মুখে হেঁটে মধ্যযুগে পৌঁছে গেছেন বিষয়-চেতনার খোঁজে। আধুনিক কবিতার পাঠককে এটা নিঃসন্দেহে বিস্মিত করবে।

কিন্তু কবি মজিদ মাহমুদ তাতে পরোয়া করেন না। তাঁর স্বপ্ন ও কল্পনার জগৎ ঘিরে বিরাজ করে মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীদের ন্যায় কেউ একজন। সেই দেবীর বা মানবীর নাম ‘মাহফুজা’। মঙ্গলকাব্যের দেবীদের আরাধনা করলে যেমন মানুষের বা মানুষরূপী দেবতাদের যাঁরা অনেকেই শাপভ্রষ্ট, তাদের যেমন মঙ্গল হত, কবি মজিদ মাহমুদ মনে করেন এমন এক কল্পদেবীই তাকে মুক্তি দিতে পারে। এই ভাবনা এই আধুনিক কালে বিস্মিত হবার মতো বটেই। কবি তাঁর স্বপ্ন সম্ভবার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পৃথিবীর কেউ নও তুমি / তোমাকে পারে না ছুঁতে / আমাদের মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবন / মাটির পৃথিবী ছেড়ে সাত তবক আসমান ছুঁয়েছে তোমার কুরশি।
অর্থাৎ এ এমন এক মানস প্রতিমা যে পৃথিবীর কেউ নয়, যার অবস্থান বা আসন ‘সাত তবক’ আসমান ছুঁয়ে। এ তাহলে কেমন দেবতা বা মানসী যে মানুষের ধরা ছোঁয়ার উর্দ্ধে বিরাজ করেন? বাংলা কবিতার জগতে তো কবি মানসীর ছড়াছড়ি। রবীন্দ্রনাথের ‘জীবন দেবতা’ বা মানস সুন্দরী যেমন আছে তেমনি আছে জীবনানন্দের বনলতা সেন, সুরঞ্জনা, সুনীলের নীরা ইত্যাদি। এঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতার ভাবনায় মানবাতীত কোনো সত্তার উল্লেখ থাকলেও বাকীরা মানবীই বলতে হবে। কিন্তু মজিদ যার কথা বলেন, সেই মাহফুজা এমন একজন যার অস্তিত্ব কবির নিকট পবিত্র অথচ অধরা।
‘তোমার শরীর আমার তছবির দানা।
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।’
এখানে কবি ভাবনায় বিপরীততত্ত্বের আভাস মেলে। একদিকে যাকে মধ্যবিত্ত ক্লিষ্ট জীবন যাপন করা মানুষ ছুঁতে পারে না, আবার তার শরীর হয়ে যায় কবির জপমালা জপমালা তো নাড়াচাড়া করতে হয়, স্পর্শ করতে হয়। এই নাড়াচাড়া করা যায় বলেই এই কল্পনারীর ছোঁয়ায় কবির ‘এবাদত’ বা প্রার্থনা হয়ে যায়। শেষের অভিব্যক্তি অনেকটা যেন তন্ত্রসাধকদের তত্ত্বের অনুরূপ। শরীরই যেখানে সাধনার মাধ্যম। তন্ত্র সাধকরা নারীর শরীর, তার যোনি, যৌনতাকে আধার করে পরমার্থ লাভের সাধনা করেন। মজিদের কাছে বিষয়টা অনুরূপ হতে পারে না মোটেই, কারণ তাঁর কল্পিত দেবী কোনো রক্ত মাংসের মানবীই নয়। স্বয়ং কবি এই ‘মাহফুজা’ সম্পর্কে কি ব্যাখ্যা দেন আমরা একবার জেনে নিই। ‘হরপ্পা’ পত্রিকার বৈশাখ ২০১৪ সংখ্যায় এক সাক্ষাৎকারে (লেখক কালের সৃষ্টি কোনো মহাকালের নয়) মজিদ মন্তব্য করেন, ‘আধুনিক মানুষের কাছে মানুষই বড় বা ছোট এবং মঙ্গল বা অমঙ্গল পুরো ধারণাটি নির্ভর। সেখান থেকে ‘মাহফুজা’ এমন একজন দেবীতে রূপ নিয়েছে যে দেবীর সঙ্গে স্বর্গের কোনো সম্পর্ক নেই বা স্বর্গযাত্রারও কোনো বিষয় নেই। অথচ পৃথিবীর এক কবির সঙ্গে সে এমন এক সম্পর্ক দ্বারা আবদ্ধ থাকে যে তাকে মুক্তি দিতে পারে’। মজিদ এই প্রসঙ্গে আরও বলেন, ‘মানুষ আমরা সব সময় নতুন কিছু তৈরী করি না কিন্তু বানিয়ে নিই। ‘মাহফুজামঙ্গল’ সে ধরনের এক বিনির্মাণ।’ অর্থাৎ ‘মাহফুজা’ বা ওই নামের কোনো দেবী কবির নিকট একটি তত্ত্ব বা ধারণা বিশেষ। এই তত্ত্ব বা ধারণাটা কাল্পনিক হলেও তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় কবির চাওয়া, পাওয়া, প্রেম, বিরহ, মিলন ইত্যাদি। এই তত্ত্বের অভিনবত্ব মানতেই হবে।
এই প্রতীকি ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়ে কবি কখনও দ্বার¯’ হন মহাকবি কালিদাসের। ‘শকুন্তলার’ নানা প্রতীকি ব্যঞ্জনা বা ‘মেঘদূত’র উপমা উপাখ্যানেরও তিনি উদার সাহায্য গ্রহণ করেন। যেমন এক জায়গায় তিনি বলছেন তার কল্পিত দেবীর সঙ্গে তিনি মিলতে পারেন না; কারণ তিনি শকুন্তলার ন্যায় ‘অভিজ্ঞান’ হারিয়ে ফেলেছেন। ‘আমার অভিজ্ঞান অঙ্গুরীয় মৎস্য করেছে হরণ’ বলে কবি আক্ষেপ করেন।
অর্থাৎ কৌশলে দুষ্মন্ত শকুন্তলার ‘অভিজ্ঞান’উপাখ্যান হাজির করে কবি বলতে চাইলেন তিনিও অভিজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। এখানে এক হতে পারে মানুষ তার শুভবোধ, শুভ চেতনা-রূপ-অভিজ্ঞান-লোভ-লালসার বশে হারিয়ে ফেলে সত্য ও সুন্দরের সহিত মিলতে ব্যর্থ হয়। কবি তেমনি কিছুর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কারণ পরক্ষণেই আমরা জানতে পারি –
‘তোমার দেহের লোধরেণু হাতের নীলপদ্ম
মাথার কুরুবকং – এইসব সম্পদ নিয়ে
অহংকারে উদ্বেলিত ঐশ্বর্যবান মানুষ তখন
তোমার অবহেলায় রিক্ত স্পর্শের চিহ্নরহিত।’
অর্থাৎপ্রকৃত প্রেম নয়, প্রেমের সুক্ষ্ম রসোপলব্ধি নয়, মানুষ মেতে ওঠে বহিরঙ্গের স্থুল রূপলাবণ্য, ভোগসুখ নিয়ে যা তাকে প্রকৃত প্রেমধর্মচ্যুত করে এবং শেষ পর্যন্ত স্বর্গচ্যুতও করে। অর্থাৎ প্রার্থিত বস্তু লাভ করতে দেয় না। বাঞ্চা ও বঞ্চিতের মধ্যেও দুস্তর ব্যবধান ; যে ব্যবধান আবার মানুষেরই স্বনির্মিত।
মজিদ মাহমুদের চিন্তার জগৎ জুড়ে যেন প্রেমের একটি শুদ্ধতার ধারণাও বিরাজমান। অনেকটা ইউটোপিয়ান ধারণার মতো।

মিলনের শুভদিন কোনদিন আসবে না আমাদের
অপেক্ষায় কেটে যাবে আহ্নিকগতি
বছর বছর যাবে নতুনের সমাগমে
অবনত রয়ে যাব সনাতন বিষয়ের কাছে
আমার বয়স যদি বেড়ে যায় একশ’ বছর
সত্তর হাজার কিংবা অনন্তকাল
তুমি তত দূরাস্ত হয়ে যাবে আমার কাছে (শুভদিন)

মজিদ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে, এখানে স্বর্গের দেবী বা স্বর্গযাত্রার কোনো বিষয় নেই অথচ সেই আকাঙ্ক্ষিতার সঙ্গে তার কখনও মিলন ঘটবে না। কেন, সে ব্যাখ্যা কিন্তু নেই। যারা স্বর্গ, দেবদেবী ইত্যাদিতে বিশ্বাসী তারাও কিন্তু বিশ্বাস করে একদিন সেই পরম সত্তার সঙ্গে তার মানবসত্তার মিলন হবে। ‘সে মুক্তি পাবে’। এক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটে না। কেন, সে ব্যাখ্যাও অনুপস্থিত।
আবার কোথাও এই কল্পনার দেবী হয়ে ওঠেন ভোগবাদী বিশ্বের ভোগ সুখের ও বিভাজনের প্রতীক।
‘তোমার এক্সপেনসিভ পানের জন্য
জমা আছে পেট্রোডলার
তোমার কাছে বেগিন ব্রেজনেভ রিগান
ইহুদির রান্না
নোবেল শান্তির এওয়ার্ড -’ (তোমারই মানুষ

কবি এখানে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনী এবং সোভিয়েত প্রতিনিধি ব্রেজনেভের মধ্যে কোনো পার্থক্যের দাড়ি টানেন না। ভোগসুখ, পেট্রো ডলার এই মাপকাঠিতে এবং আমেরিকা রাশিয়াকে এক পংক্তিতে এনে ফেলেন। কৌশলে ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েলকে কেন্দ্র করে অশান্তি জিইয়ে রাখার দিকে ইঙ্গিত করে পর মুহূর্তে উচ্চারণ করেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের কথা। অর্থাৎ ইজরায়েলকে কেন্দ্র করে যারা অশান্তির আগুন জ্বালান তারাই আবার শান্তি পুরস্কারের আয়োজন করে মহান সাজেন, কবি সেটাই বলে নিলেন এই অবকাশে।
(৩)
মজিদ মাহমুদের কবিতায় শুধু মঙ্গল দেবদেবীর বিনির্মাণ নেই, আমরা একটু অন্যরকম বিনির্মাণও দেখি। কখনও শকুন্তলা বা মেঘদূতের বিরহ প্রেম ভালবাসা, কখনও রবীন্দ্রনাথের নায়িকা, শরৎচন্দ্রের ট্র্যাজিক হিরো আবার কখনও জীবনানন্দের নানা অনুভবের বিনির্মাণও দেখি, তাঁর কবিতায়। তেমনি একটি ধারণার উপস্থাপনা দেখা যায় ‘কেমন আছেন’ নামক কবিতায়
‘সাড়ে চার ঘন্টা বিলম্ব করে চলে গেল রাত্রির ট্রেন
তিন কুড়ি বছর পরে কেমন আছেন?
সে আমার প্রেম তারে রাখিয়া এলেম
ইস্টিশানের ঠান্ডা মেঝের ওপর
প্রথম যৌবনের ব্যর্থতার পর।’
বিলম্ব হলে হতভম্ব প্রেমিককে ফেলে প্রেমের ট্রেন সর্বদাই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যায়, এটা বাস্তব। এখানে তেমন এক ব্যর্থপ্রেমের উপলব্ধির কথা আছে। সাথে সাথেই কিন্তু বনলতা সেন ও ‘শেষের কবিতা’র লাবণ্য-র কথাও আছে। দুটি ক্ষেত্রেই প্রেমের মিলনের কথা নেই। মজিদ কৌশলে এই দুই বিখ্যাত সাহিত্য নারীর ইঙ্গিত করে ব্যর্থ প্রেমের দিকে ইঙ্গিত দিলেন এবং নতুনভাবে তাঁদের উপস্থাপিত বা বিনির্মাণও করলেন।
আবার যখন আমরা শুনি
‘যক্ষের মনোবেদনা বিরহীসময় আর সব
সমাচার নিয়ে
গিয়েছিলে শিপ্রা নদীকুলে উজ্জয়িনীপুরে
তখন সেকালের বিরহী যক্ষের প্রেম ও বিরহ বেদনার সঙ্গে একালের কবির প্রেম বিরহের যেন আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটে। সেই সঙ্গে ‘লোধরেণু’, ‘কুরুবক’ এইসব আশ্চর্য শব্দরাজির ও চিত্রকল্পেরও যেন পুনর্জন্ম ঘটে।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের ট্র্যাজিক নায়ক ‘দেবদাস’ এক ব্যর্থ প্রেমিক। প্রেমিকার প্রেম লাভ করেও সমাজ ও মানুষের ক্রুরতার কারণে যে প্রেমিকাকে লাভ করা তার হয়ে ওঠে না, সে এক চিরকালীন ব্যর্থতার প্রতীক।
‘মানুষের সব দুঃখ ব্যথা আর বিষন্ন প্রহর
কেটে যাবে পার্বতী পার্বতী বলে অবরুদ্ধ বিক্ষোভ !
আজীবন নিহত আমি অতৃপ্ত বাসনার ঘায়ে
দুর্গন্ধ লাশ নিয়ে শুয়ে চন্দ্রমুখী ডানে ও বায়ে।’ (দেবদাস)
অতৃপ্ত বাসনা বুকে মানুষের জীবনের পথ চলা কেমন ব্যর্থতার আঘাতে বিনষ্ট হয় এবং মানুষের অবরুদ্ধ ক্ষোভ তা তাকে শেষ পর্যন্ত শান্তির বদলে দুর্গন্ধ লাশের পরিণতিই দান করে। দেবদাসের পরিণতির চিত্র এঁকে কবি আর একবার ব্যর্থ প্রণয়েরই বিনির্মাণ করলেন কবিতায়।

(৪)
আগেই বলেছি কবি হিসাবে মজিদ মাহমুদ রাজনীতি, সামাজিক দ্বন্দ্ব, অবক্ষয়, সন্ত্রাস সংঘাত ইত্যাদি এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন। কবিতার জগতে তার আগমন ও ঘটে ছিল পরাবাস্তব এক স্বপ্ন অভিযাত্রা নিয়ে। স্বদেশের বাস্তব জীবনের হানাহানি, রক্তপাত তাঁর কবিতায় কদাচিৎ স্থানলাভ করেছে। কিন্তু ‘মাহফুজামঙ্গল’র পরে তাঁর এই অবস্থান অনড় থাকেনি। ‘সাত তবক আসমান’ পরিভ্রমণ শেষে তিনি মাঝে মধ্যে চোখ ফিরিয়েছেন মাটির পৃথিবীর দিকে। এখন দেখা দরকার সেখানে মাটির খাঁটি গন্ধ কতটা মিলল। একটি কবিতায় তিনি বলেছেন
‘বছর বিশেক আগে যে মাটি আমাকে ধরেছিল প্রথম
একাত্তরের হানাদার আগুন তার চিহ্ন রাখেনি, এখন
ছাপ্পান্ন হাজার মাইলের সীমাবদ্ধতায় কেটে যায় দিন
স্বৈরাচার ধরে আছে কান, তবু জাগে না আমার মরহুম’

একাত্তরের হানাদার আগুনে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের মতো কবির জন্মস্থলও ধ্বংস হয়েছিল বোঝা যায়; তার জন্য কবির বেদনাবোধও স্বাভাবিক। কিন্তু ‘ছাপ্পান্ন হাজার মাইলের সীমাবদ্ধতা’ বলতে কি কবি বাংলাদেশের আয়তনের সীমা বোঝাতে চেয়েছেন? এই সীমাবদ্ধতায় কবির দুঃখ কেন বোঝা যায় না। সীমিত ভূখন্ডের জন্যই এত লড়াই, আন্দোলন, শহীদের আত্মাহুতি। কবি কি অন্যরকম কিছু চেয়েছিলেন? পরিস্কার নয়। স্বাধীনতার পরেও যে প্রকৃত মুক্তি আসেনি; শোষণ, অত্যাচারের অবসান হয়নি তা অনুভূত ‘স্বৈরাচার ধরে আছে কান’ উক্তির মাধ্যমে। এ উপলব্ধিতে নিশ্চয়ই বাস্তবতা আছে। কিন্তু স্বৈরশাসনের জমিতেই কতরকম সভ্যতা বিরোধী ‘আগাছা’র জন্ম হচ্ছে নিয়ত কবি সে বিষয়ে নীরব থেকেছেন।
তবে ‘রাতের সন্ত্রাস’ বলে একটি কবিতায় আমরা ভিন্ন চিত্র পাই
‘প্রকৃতির অনবরত রক্তক্ষরণে
তখন আমাদের পৃথিবীতে নেমে আসে
কবরের নিস্তব্ধতা
বুকের কাছে মেতে ওঠে শেয়াল
হৃদপিন্ডের সন্ধানে
তখন আমি ডুবতে থাকি।’
প্রকৃতি এবং সমাজদেহ এখানে ধরে নিতে হবে সমার্থক। কারণ সারা বিশ্ব ব্যাপীই তো চলছে এখন ‘রাতের সন্ত্রাস’। এই রাত, এই অন্ধকার মানুষের চেতনায়। শুভবোধ হারানোয় সারা বিশ্বের বহু অঞ্চল এখন বধ্যভূমি। অবাধ অন্ধকারের রাজত্ব আর ‘শেয়াল’ হলো এক হিংগ্র, ক্রুর, লোভ-লালসার প্রতীক। এই শেয়ালদের হত্যা প্রবৃত্তির সামনে অসহায় মানুষ আজ ভীত সন্ত্রস্ত। তারাই মাঝে মধ্যে পৃথিবীতে নামিয়ে আনে কবরের নিস্তব্ধতা, তাদের অন্ধ হিংসার দ্বারা। কবি আরও লক্ষ্য করেন –
‘রাতের ক্ষুধা রক্তাক্ত করে বুকের কলিজা
নিষ্প্রভ চাঁদের জোয়ারে প্রার্থনা
জ্যোৎস্নার অবসান চাই
রাত্রি আসুক দীপ্তিমান তারার তিমির
নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্যে পথ খুঁজে চলি।’
চমৎকার উপলব্ধি। সমাজজীবনের ব্যাপ্ত অন্ধকারই আমাদের হৃদয় মনকে বিদীর্ণ করে। কারণ সামগ্রিকভাবে সমাজ মানসে ব্যাপ্ত এক ধোয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ। চিন্তার অস্বচ্ছতা রূপ জ্যোৎস্নায় মানুষ শুভাশুভ, ভালমন্দ চিনতে ভুল করছে। এই ‘জ্যোৎস্না’ যেন জীবনানন্দের কবিতার সেই হত্যাকারী –
‘প্রেম ছিল, আশা ছিল – জ্যোৎস্নায়- তবু সে দেখিল
কোন ভূত?
এই জ্যোৎস্না আদতে মানুষের অবচেতন মনের এক ধূসর অঞ্চল, যা অনাবিষ্কৃত অথচ ভয়ঙ্কর। কখনও কখনও সে তাই হত্যাকারীর রূপ নেয়। কবি চেতনার এই আলো -আঁধারির বদলে কামনা করেছেন ‘রাত্রি’ – ‘দীপ্তিমান তারার তিমির’। অর্থাৎ যদি পুরোটাই অন্ধকার হয় তাহলে মানুষ আপন অভিজ্ঞতা, আপন চেতনার নিজস্ব আলোয় গন্তব্য নির্ণয় করে নিতে পারে। এই ধরনের অভিব্যক্তি, ছন্দ ও শব্দ প্রয়োগ যেন আমাদের জীবনানন্দীয় অনুভবের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কবি হয়তো এখানে স্বসমাজের নানা বিভ্রান্তি, বিভ্রম এবং তার সুযোগে অশুভ শক্তির অভ্যুত্থানের দিকে ইঙ্গিত করে থাকবেন।
মজিদ মাহমুদের একটা উল্লেখযোগ্য কবিতার নাম ‘ভুসুকুপার মুষিক’। কবিতার শুরুই হয়েছে জীবনানন্দের বিখ্যাত চরণ উদ্ধৃত করে-
‘চমৎকার! ধরা যাক দু’একটা ইঁদুর এবার।’ – এই বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি দিয়ে কবি যেন আচমকাই ঘোষণা করে দিলেন, তিনি এবার বিস্মিত হওয়ার মতো কিছু বলবেন। এই ঘোষণার মাধ্যমেই কবি বোঝাতে চাইলেন যে, তিনিও মানুষের অবচেতন মনের গুপ্ত লোভ, লালসার কোনো বিষয় উত্থাপন করতে যাচ্ছেন। তিনি জানালেন যে, এই ‘ভুসুকুপার মুষিকের’ বাস এক অন্ধকার গুহায়। সে এক বীভৎস জানোয়ার। যে কিনা
‘কেটে নেয় হৃদয়ের সুকোমল তন্ত্রী
কৃষ্ণরাতে খেয়ে গেছে আমাদের জন্মানো
ফসল’ এবং ‘তুলে খায় ভ্রুণের নরম।’
অনুভবে ও উপমায় নিঃসন্দেহে দারুণ সমৃদ্ধ কবিতা। এই কবিতার শিকড় গ্রথিত মানুষের চেতনায় এবং সমাজ ব্যবস্থার গভীরে। মানুষের মনের গভীরে এক গুহাবাসী জানোয়ারের বাস যা মননের অন্ধকারময়তার সুযোগে হিংগ্রভাবে বিনষ্ট করে মানুষের সব শুভবোধ রূপ ফসল। এমনকি যেসব ভাবনা ধারণার সদ্য জন্ম হচ্ছে, যা সবে ‘ভ্রুণ’, যা আগামীর আশার বার্তা বাহক – তাকে বিনষ্ট করে। যারা ক্ষমতার দন্ডধারী তাদের প্রশ্রয়েই এই অশুভ শক্তির বাড়বাড়ন্ত। কবি কিন্তু ঠিকই লক্ষ্য করেন-
‘মুষিক নিধনের পরিকল্পনা নেই আমাদের
গণতন্ত্রই যখন তৃতীয় বিশ্বের সর্বগ্রাহ্য মতবাদ।’

অর্থাৎ তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে সকল অন্যায়, অবিচার চলতে থাকলেও তা সমূলে উৎপাটিত করার কোনো বিধি বিধান সে ব্যবস্থায় নেই। বরং তা অন্যায়েরই প্রশ্রয়দাতা। তৃতীয় বিশ্বের সর্বত্রই এই সাধারণ চিত্র বিদ্যমান তাও বলছেন কবি
এর পাশাপাশি মজিদ মাহমুদের কবিতায় কিছু বিপরীত চিন্তারও মুখোমুখি হই আমরা। যেমন তার ‘যুদ্ধ’ কবিতাটি-
‘তুমি যখন পল্টন ময়দানে বক্তৃতা দাও
তখন প্রতিপক্ষকে আহ্বান করো দ্বন্দ্বে
যেন এক ভয়াবহ যুদ্ধ ঘোষণার দায়িত্ব বর্তেছে তোমার উপর
তুমি প্রথমে একটি জাতিকে দ্বিখন্ডিত করো
তারপর কামনা করো বাকি অর্ধে বিনাশ’।

এখানে কবি সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য হাজির করেন। কেন কার উপর যুদ্ধ ঘোষণার দায়িত্ব বর্তেছে তা সরাসরি না বললেও, যখন জাতিকে দ্বিখন্ডিত করার জন্য কাউকে অভিযুক্ত করেন, তখন প্রশ্ন উঠে পড়ে তিনি কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ তুলছেন? তাহলে তো প্রশ্ন ওঠে যে এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা মেনে নিতে কবির মনে কোথাও দ্বিধা ও প্রশ্ন আছে? ‘মধ্যাহ্নভোজন’ তার আর একটি রাজনৈতিক ভাষ্য প্রধান কবিতা –
‘তখন তিয়ানমেন চত্বর পেয়ে গেছে রক্তের নুন
দেং পেং চড়িয়েছে রান্না
কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে মাওয়ের মধ্যাহ্নভোজন
তাই নুন আর মাংসের খোঁজে
পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহরে
মাতাল ছুটে আসছে আদিম ট্যাংকের বহর।’

তিয়ানমেন স্কোয়ারের ঘটনা একটি বিতর্কিত বিষয়। সেখানে কেন সেদিন রক্তপাত ঘটেছিল তার পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তির বয়ান আমাদের জানা। এই বিতর্কের অভ্যন্তরে মজিদ মাহমুদের মতো একজন কবি কেন জড়ালেন, যার স্বদেশেই এত রক্তপাত ঘটেছে যা প্রায় বিশ্ব রেকর্ড – অথচ তাঁর লেখায় তা প্রায় অনুল্লেখিত ? আশ্চর্যভাবে কবি নীরব একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, তিরিশ লক্ষ শহীদের মৃত্যু ও তিন লক্ষ নারীর ধর্ষণ নিয়ে।। আগেই বলেছি, এটা হতেই পারে, কারো ক্ষেত্রে ঘটতেই পারে বাস্তবকে এমন পাশ কাটিয়ে যাওয়া। যেমন ঘটেছে আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের অনেক পুরোধা ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেই। তাঁরা সাহিত্য রচনা করেছেন, কাব্য চর্চা করেছেন কিন্তু সর্বদা সযত্নে এড়িয়ে চলেছেন রাজনৈতিক মতামত, বিতর্ক। বুদ্ধদেব বসু রাজনীতিকে তাঁর সাহিত্য চর্চার বিষয় হিসাবে কখনো বাছেননি। জীবনানন্দও সচেতন ভাবেই রাজনৈতিক প্রবক্তা হয়ে ওঠার পথ বর্জন করেন। তাঁর কবিতায় মানব মনের নিগূঢ় রহস্য সন্ধান আছে, সভ্যতার জটিলতর দ্বন্দ্বে জর্জরিত মানুষের অসহায়তা, আত্মানুসন্ধান আছে, প্রকৃতির রূহস্যময়তার গভীর অনুসন্ধান আছে, মহানগরীতে ভিড়ে ঠাসা কীটের মতো মানুষের ক্লিষ্টতা, স্নিগ্ধতা দেখতে দেখতে উদাসীন হেঁটে যাওয়া আছে, কিন্তু রাজনীতির ভাষ্য নেই। তাঁর জগৎ পরিশুদ্ধ কবিতার জগৎ; এবং আমরা আশ্চর্য হয়ে আবিষ্কার করি, তিনি এবং একমাত্র তিনিই পেরেছেন এই অসাধ্য সাধন করতে; শুধু পরিশুদ্ধ কাব্যবোধ ও কবিতার জন্য জয়মাল্য উপার্জন করেছেন। কিন্তু মজিদ মাহমুদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারেই ব্যতিক্রমী। কবিতার ভুবনে মজিদ মাহমুদের আগমন ঘটেছিল আশির দশকের শেষে, যখন তাঁর জন্মভূমি চরম অশান্ত ও উত্তাল। নিরন্তর হত্যা, রক্তপাত তো ছিলই, সেই সঙ্গে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা মৌলবাদ তার সব বিষদাঁত বের করে ততদিনে প্রবল আক্রমণ শুরু করেছে। শুধুমাত্র মত প্রকাশের জন্য কেউ দেশ থেকে বিতাড়িত হচ্ছেন, কোনো কবি বা ঔপন্যাসিক আবার খুন হয়ে যাচ্ছেন-এমন পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল কবি মনের অস্থির, অসুখী বোধ করারই কথা। কিন্তু মজিদ মাহমুদ সেদিকে উদাসীন থেকেছেন। রচনা করেছেন ‘মাহফুজামঙ্গল’ নামে এক স্বপ্ন আখ্যান। এমন নির্লিপ্তি তাঁর বরাবর থাকতেই পারতো, তা থাকেনি বলেই কথাগুলো বলার প্রয়োজন হলো।
মজিদের কাব্যে, কবিতায় আমি দেখেছি সর্বদা জীবনানন্দের প্রবল উপস্থিতি। চিত্রকল্পে, উপমায়, শব্দ প্রয়োগে কখনো বা বোধে তিনি সশরীরে হাজির। এই কবি সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধাবোধও অপরিসীম। ‘জীবনানন্দ দাশ ও আন্তর্জাতিকতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে মজিদ মন্তব্য করেন, ‘জীবনানন্দের কবিতা আসলে দেশকাল ও নক্ষত্রের কারুকার্যময় জগতের মধ্য দিয়ে হৃদয়ের অভ্যন্তরে জটিল মিথস্ক্রিয়তা শেষে পৃথিবীর প্রান্তরে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ায়’। অর্থাৎ শুধু নক্ষত্রের কারুকার্যময় জগতেই নয়, কবির পরিভ্রমণ চলেছে দেশকাল ও মানুষের সব দুঃখকষ্ট ও যন্ত্রণার পাশাপাশিই। না হলে কারও কবিতা এমন হীরক দ্যুতি নিয়ে কী আজও সমানে বিরাজ করে?
পরিশেষে বলি, মজিদ মাহমুদ লিখেছেন বিস্তর। আরও নিশ্চয়ই লিখবেন আগামী দিন। তাঁর কবিতা বিচিত্রগামী, নানা স্বাদের বাহক, তাঁর কবিতার স্বচ্ছন্দগতি, চিত্রময়তা, পুরাণ ইতিহাস চেতনা হৃদয়গ্রাহী। আমাদের সাংস্কৃতিক উজ্জ্বল উত্তরাধিকারের দ্যুতিময় উপস্থিতি তাঁর কবিতাকে ঋদ্ধও করেছে দারুণ। এই সৃষ্টিশীল কবির চিন্তা ও উপলব্ধি জুড়ে জীবনের বহুবর্ণ আরও বিচিত্র ছটায় উদ্ভাসিত হোক এই প্রত্যাশাই করব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *