তখনও প্রকৃতির শুদ্ধতার বাইরে বিকল্প কোনও ঘোর দেখিনি। তখনও বুঝতে শিখিনি শিল্পের শুদ্ধতা। শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে জেগে ওঠা গ্রাম দেখতে দেখতে বেড়ে উঠছি তখন। খালি পায়ে ঘাসের শিশির মাড়িয়ে বেড়ে উঠছি। বেড়ে উঠছি চৈত্রের কাঠফাটা রৌদ্রে মাটির সোঁদা গন্ধ শুঁকে। আবার কখনওবা তুমুল বৃষ্টিতে কৈশোর ধুয়ে নিচ্ছি। এমনকি যৌবনের শুরুতে শুদ্ধ জোছনা ধরব বলে নৌকোর পাটাতনে বসে কত রাত যে যমুনায় কাটিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। এরপরই মূলত বিকল্প ঘোরে যাত্রা। আর খোলস বদলের এই নিয়তিতেই আমার শিল্পের শুদ্ধতা চেনা শুরু। তবে হঠাৎ করেই যান্ত্রিকতা এসে শুদ্ধতাগুলো কেড়ে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই কল্পনা ছেনে শুদ্ধতার সন্ধানে আছি। আর এরকম সন্ধানে থাকতে থাকতেই একদিন হাতে পেলাম কবি মজিদ মাহমুদের কাব্য ‘মাহফুজামঙ্গল’। প্রকৃতির শুদ্ধতা খোঁজার মতই আমি অনেকদিন ধরেই এমন এক শুদ্ধ কাব্যভাষ্যের খোঁজে ছিলাম। আর সেটা নিজের অজান্তেই।
চেতনার নাগাল পাওয়া যায় এমন কিছু সত্য যখন কবিতার আঙ্গিক নির্মাণ করে তখন বোধিক উচ্চারণের জায়গাগুলো প্রসারিত হতে থাকে। মজিদ মাহমুদও তেমনি কিছু শব্দশরীর নির্মাণ করেছেন তাঁর ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যভাষ্যে, যা প্রকৃতির মতই শুদ্ধ ও সত্য। অনেকদিন ধরেই কবিতা পড়ছি। কখনও ব্যক্তিগত পাঠের জন্য, কখনও শ্রোতার জন্য, আবার কখনওবা লেখার জন্য। এপার-ওপার মিলিয়ে অনেকের কবিতাই পড়তে হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মজিদ মাহমুদের কবিতাও পড়েছি বেশকিছু। তবে তাঁর ‘মাহফুজামঙ্গল’ পড়া হয়ে ওঠেনি। হয়তো কিছু শৈল্পিক শুদ্ধতা শোনার অপেক্ষায় অনেকদিন ধরেই কান খাড়া হয়েছিল। যেদিন ‘মাহফুজামঙ্গল’ হাতে-পেলাম, সেদিন কারওয়ান বাজারের রাস্তায় সোডিয়াম আলোর নিচে দাঁড়িয়েই বেশ কয়েকটি কবিতা পড়ে ফেললাম। এমনিতেই ঢাকার আবহ যান্ত্রিক। আর সোডিয়ামের আলোয় সেই যান্ত্রিকতা পায় ভিন্নমাত্রা। এরপরও ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের কবিতা আমার বোধকে অন্যরকম এক ঘোরে ঠেলে দিচ্ছিল। সেই ঘোর নিয়েই রিকশার প্যাডেলের ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চারণ করছিলাম মাহফুজার নাম। এভাবেই এক অন্যরকম কাব্যভাষ্যে চেতনাকে ঘিরে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। আর ওই রাতেই আবিষ্কার করলাম বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার এক আধুনিক কবি মজিদ মাহমুদকে।
‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের মাহফুজা কেবলমাত্র নারী বিশেষ্য কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মাহফুজার বহুমাত্রিক রূপান্তর কাব্যটিকে এনে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা। মজিদ মাহমুদও এই কাব্য লিখতে গিয়ে নিজেই নিজের ভেতর এক স্বতন্ত্র কথ্যভঙ্গি তৈরি করে নিয়েছেন। তাই তিনি সূত্রাধারের মত মাহফুজাকে বহুমাত্রিক পরিচয়ে তুলে ধরেন। মাহফুজা তার কাছে কখনও হয়ে ওঠেন নারী, কখনও ঈশ্বর, কখনও কবিতা, আবার কখনওবা দেশ। আর মাহফুজার সঙ্গে ‘মঙ্গল’ কথাটি যুক্ত হয়ে দুইশত বছর পর মঙ্গলকাব্যের প্রতিনিধি হয়ে ওঠে ‘মাহফুজামঙ্গল’। খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত পৌরাণিক, লৌকিক এবং পৌরাণিক-লৌকিক মিশ্রিত দেবদেবীর লীলামাহাত্ম্য, পূজা আচার ও ভক্ত কাহিনী অবলম্বনে সম্প্রদায়গত আখ্যানমূলক কাব্যগুলোই মঙ্গলকাব্য হিসেবে পরিচিত। তবে সহজ ভাষায় বললে এ রকমটা দাঁড়ায়-দেবদেবীর পূজাঅর্চনা ও মাহাত্ম্য প্রচারবিষয়ক আখ্যান কাব্যকে মঙ্গলকাব্য বলা হয়ে থাকে। এছাড়া এই কাব্যধারাকে দেবদেবীর মহিমাবিষয়ক গানও বলা হয়ে থাকে।
মঙ্গলকাব্যের ‘মঙ্গল’ শব্দটির সঙ্গে শুভ বা কল্যাণের অর্থসাদৃশ্য রয়েছে। মঙ্গলকাব্য যুগের দুইশ বছর পর লিখিত মাহফুজামঙ্গলেও আমরা সেই ইঙ্গিত দেখতে পাই। এই কাব্যে মজিদ মাহমুদের উচ্চারণ মাঙ্গলিক। তিনি কবিতায় মিথের পাশাপাশি বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেন। আর এই তুলে ধরার ভঙ্গিটাও স্বতন্ত্র। যার কারণে তিনি আমাদের সামনে অন্য ঘরানার কবিসত্তা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর বয়ান বাংলা কবিতার ধারায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি যেমন শামসুর রাহমান বা আহসান হাবীবের মত নাগরিক চেতনা ধারণ করেন, তেমনি আবার আল মাহমুদের মত গ্রামীণ আবহ তুলে আনেন। তবে তাঁর এই কাব্য বয়ান অনেকের মধ্যে থেকেই আলাদা। কেমন একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে মজিদের কাব্যভাষায়। তিনি আয়েশি ভঙ্গিতে শব্দের পর শব্দ সাজান। এক একটি কাব্যভাষ্যকে তিনি সূত্রাধারের মত এমনভাবে উন্মোচিত করেন যাতে এর প্রখরতা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। মজিদ মাহমুদ তিনখণ্ডে ‘মাহফুজামঙ্গল’ শেষ করেছেন। মাহফুজামঙ্গল পূর্বখণ্ড বের হয় ১৯৮৯ সালে। ২০০৩ সালে এর সঙ্গে যুক্ত করেন ‘উত্তরখণ্ড’। আর সর্বশেষ ২০১২ সালে ‘যুদ্ধমঙ্গল’ দিয়ে কাব্যটি শেষ করেছেন।
আমি আসলে কবিতার আঙ্গিক বা নন্দনতাত্ত্বিক বিচারের জন্য মাহফুজামঙ্গল নিয়ে লিখছি না। এমনকি আমার কাছে কবি ও কবিতার কাল বিভাজনও মুখ্য নয়। আমার কাছে মুখ্য বিষয় হল মৌলিকতা। মৌলিক নির্মাণগুলো এমনিতেই কালকে নির্মাণ করে। সেক্ষেত্রে মজিদ মাহমুদও কালকে নির্মাণ করেছেন। ‘মাহফুজামঙ্গলে’তাঁর উচ্চারণের স্বতঃস্ফূর্ততা মৌলিক নির্মাণের জায়গাগুলো শক্ত করে তুলেছে। তিনি নিজস্ব বোধ ও বোধি দিয়ে কালকে সম্প্রসারণ করেছেন। তার নির্মাণ শুধুমাত্র একটা বিশেষ সময়ে থেমে থাকেনি। তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু করে ২০১২ সাল পর্যন্ত মাহফুজাকে বিশ্লেষণ করেছেন। একান্ত ব্যাপার বলে যা থাকে মজিদের কাছে মাহফুজামঙ্গলও তাই। আমার মনে হয়েছে মাহফুজা তাঁর কাব্যলক্ষী। আর এই কারণেই তিনি শুদ্ধ ও সত্য উচ্চারণে বোধের জায়গাগুলো পূরণ করতে পেরেছেন।
আগে আমি শুদ্ধতা মাপতাম চোখ দিয়ে। এখন আমার কাছে শুদ্ধতা ধরা দেয় চোখ, কান ও বোধের মাধ্যমে। আবার কখনওবা চেতনা নিংড়ে শুদ্ধতা খুঁজি প্রার্থনায় ৷ তাইতো মাহফুজামঙ্গলের বৈচিত্র্যময় ও ব্যতিক্রম উচ্চারণ আমার কানে শুদ্ধতার আবহ এনে দেয়। প্রতিটি ধর্মের মানুষ দিনের শুরুতেই তার প্রভু বা ঈশ্বর অথবা ভগবানের কাছে প্রার্থনায় অবনত হয়। এক প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে একটি সুন্দর দিনের জন্য তারা হাত তোলেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। মাহফুজামঙ্গলেও কবি প্রথম কবিতাতেই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনায় অবনত হয়েছেন। যদিও সেই প্রার্থনায় ঈশ্বর ও নারী একাকার হয়ে গেছে। তবে প্রার্থনার মত পবিত্র জায়গায় একজন নারীকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তিনি যে শুদ্ধতা এঁকেছেন তা সত্যিই ব্যতিক্রম। তিনি এই কবিতার মধ্য দিয়ে একটি শুদ্ধ চেতনার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছেন, যে চেতনা পরবর্তী কবিতাগুলোকে করে তুলেছে ধ্রুপদী।
আমি কবিতার আঙ্গিক বা গঠন নিয়ে আলোচনা করতে চাইছি না। ‘মাহফুজামঙ্গল’ পাঠে যে চেতনা আমি ভেতরে ধারণ করে নিয়েছি, যে কবিতাগুলো আমার মন ও মননে শুদ্ধতা এনে দিয়েছে, আমাকে ঋদ্ধ করেছে- আমি সেই সব কবিতার অংশবিশেষ পাঠকদের সঙ্গে বন্টন করছি মাত্র। মাহফুজামঙ্গল পূর্বখন্ডের প্রথম কবিতাতেই কবির স্বতঃস্ফূর্ত উচ্চারণ -ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায় / আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে / সেই নারী এসে আমার হৃদয়মন তোলপাড় করে যায়/ তখন আমার রুকু / আমার সেজদা / জায়নামাজ চেনে না / সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই। (কুরশিনামা )
এরপর মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবনের বাস্তবতায় ফিরে কবি বলেন নারী পৃথিবীর কেউ নও তুমি / তোমাকে পারে না ছুঁতে / আমাদের মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবন। (কুরশিনামা)
সবাক মনের শব্দের চেয়ে নির্বাক মনের শব্দ রোম্যান্টিকতাকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যায়, যা এক সময় প্রার্থনার মতই পবিত্র হয়ে ওঠে। চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, পদাবলি ও মঙ্গলকাব্য যেমন রোম্যান্টিকতার মধ্য দিয়ে ওই সময়ের কবিদের প্রার্থনার ভাষা হয়ে উঠেছিল, তেমনি মাহফুজামঙ্গলে মজিদের রোম্যান্টিকতা ও প্রার্থনার ভিতর দিয়ে উচ্চারণ করে- মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা / আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়। (এবাদত)
স্বাধীন দেশে বাস করেও পরাধীন ক্লেদাক্ত জীবন থেকে মুক্তির পথ খোঁজেন কবি। তাইতো সমকালীন অস্থিরতা মধ্যে তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার আগুনের চিত্র, যে আগুন কবির মাতৃভূমিকে নিশ্চিহ্ন করেছিল। বছর বিশেক আগে যে মাটি আমাকে ধরেছিল প্রথম / একাত্তরের হানাদার আগুন তার চিহ্ন রাখেনি, এখন / ছাপ্পান্ন হাজার মাইলের সীমাবদ্ধতায় কেটে যায় দিন / স্বৈরাচার ধরে আছে কান, তবু জাগে না আমার মরহুম। (মঙ্গলকাব্য-এক)
…
দেবীবন্দনার নতুন রূপই তো মাহফুজামঙ্গল। আর এই কাব্যটির সমস্ত শরীর জুড়ে কেবল মাহফুজা নামের চিহ্ন। মাহফুজা কবিতায় কবি তাকে যেভাবে স্মরণ করেছেন, তাতে মনে হয়, তার রক্তের ভেতরে প্রবাহিত ওই নাম। আমার হৃদয় কখন যে উচ্চারণ করে না তোমার নাম / আমার জানা নেই সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত সময় / আমার আত্মা এখন জাগ্রত / তোমাকেই জপে রাতদিন / কি দুঃখসুখে চেতনে-অবচেতনে সবটুকু অস্তিত্বে। (মাহফুজা)
২০০৩ সালে ‘মাহফুজামঙ্গল উত্তরখণ্ডে’ এসে কবি সেই একই টিউন ধরে রাখেন। মজিদ নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক অভিপ্রায় নিয়ে প্রার্থনারত অবস্থায় বলতে থাকেন- মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি শ্রমণ গৌতম বোধিসত্ত্ব মহাস্থবির / মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি প্রব্রজিত ভিক্ষুসংঘ / মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি ধর্মং শরণা গচ্ছামি, মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি, নিবার্ণ শরণাং গচ্ছামি। (মাহফুজা শরণাং গচ্ছামি
সংগ্রামের অনিবার্য পরিণতিই যুদ্ধ। আর এটি পৃথিবীর আদিমতম চরম এক সত্য। প্রতিটি মানুষকেই এই সত্যের মুখোমুখি হতে হয়। এই যুদ্ধ কখনও ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠী, কখনও গোষ্ঠী থেকে সমাজ, কখনও সমাজ থেকে রাষ্ট্র, আবার কখনওবা রাষ্ট্র থেকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ থেকে পালাবার কোনও পথ নেই। আমরা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে রক্ষার জন্য অথবা অন্যকে প্রতিহত করবার জন্য যুদ্ধে নামি। যুদ্ধের রকমফের যাই হোক না কেন, এটি আমাদের বরাবরই ধ্বংস করে।
মজিদও নিজেই নিজের ভেতর যুদ্ধ তৈরি করেন। আবার সেই যুদ্ধ নিয়েই জড়িয়ে পড়েন মাহফুজার সঙ্গে, কখনও চেতনার সঙ্গে, আবার কখনও সময়ের সঙ্গে। তিনি যুদ্ধের অনিবার্যতা অস্বীকার করতে পারেন না বলেই ‘যুদ্ধমঙ্গল’ খণ্ডে লিখেন- ‘মাহফুজা আমরা যাতে যুদ্ধ থেকে না পালাই, সে জন্য আমাদের পশ্চাতে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত কুকুরবাহিনী। আমাদের সামনে শত্রুর তরবারি; পিছনে ততোধিক নিষ্ঠুর সম্রাটবাহিনী। মাহফুজা, কথা হলো, কে আমাকে যুদ্ধে নামিয়েছে? (যুদ্ধ-২)
‘মাহফুজামঙ্গলে’ এরকম যুদ্ধভাষ্য দেখতে দেখতে ফের আমার নাগরিক ব্যস্ততায় ফেরা। সময়ের অমসৃণ পথ হেঁটে কবির মত আমিও যুদ্ধে নামি। সেই যুদ্ধ বেঁচে থাকার জন্য, বেড়ে ওঠার জন্য, কাউকে কাছে পাওয়ার জন্য এবং যান্ত্রিক গৃহায়নে ফেরার জন্য। এরপর সময়ের তাৎক্ষণিক আবেগময়তা হারিয়ে ফের শিল্পের শুদ্ধতা খোঁজা শুরু, এমনকি জীবনেরও। কবির মত আমার কাছেও শিল্প এবং জীবন এক হয়ে যায়। তখন আর কল্পনা ছেনে শুদ্ধতা বের করতে হয় না। মজিদের কাব্যভাষ্য এমনিতেই আমার চোখকে পরিষ্কার করে দেয়। ঠিক প্রকৃতি দেখার শুদ্ধ চোখ নিয়েই আমি ‘মাহফুজামঙ্গল’ উপভোগ করি। দেখি ঐশ্বরিক দেবীরূপী মাহফুজা চোখের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে এবং আমার ভেতরের আরেকটি দরজা খুলে যাচ্ছে।
মাহফুজামঙ্গলে মজিদ গোপনজীবনকে বিশ্লেষণ করেন। আর এই জীবন বিশ্লেষণই কবির ধর্ম। তিনি কিছু শব্দ পাঠকের মাথার ভেতরে সেঁটে দেন। যন্ত্রসভ্যতার অমোঘ নিয়মে নাগরিক হয়ে ওঠা এই আমার সামনেও হাজির করেন কিছু শুদ্ধতা, যা কেবলই একান্ত হয়ে ধরা দেয়। আর এভাবেই মাহফুজার শব্দশরীর প্রকৃতির মতই শুদ্ধ হয়ে ওঠে। যেরকম শুদ্ধ ছিল শীতের কুয়াশা ভেদ করে জেগে ওঠা গ্রাম, খালি পায়ে ঘাসপাতার শিশির মাড়ানো, চৈত্রের কাঠফাটা রৌদ্রে মাটির গন্ধ শোঁকা, তুমুল বৃষ্টিতে ভেজা দুরন্ত কৈশোর এবং যৌবনে নৌকোর পাটাতনে বসে জোছনা ধরা।



