কাটাপড়া মানুষ : কবির দায়বদ্ধতা

বর্তমানে যাঁরা কবিতা চর্চা করছেন, তাঁদের মধ্যে মজিদ মাহমুদ একজন অন্যতম শক্তিমান কবি। উনিশশো আশির দশকে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলা কাব্যাঙ্গনে আগমন করেন। পর্যায়ক্রমে তিনি অনেকগুলো কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। প্রতিটি গ্রšে’ পাঠক মজিদ মাহমুদকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছেন। কাব্য রচনার গতানুগতিক ধারা সচেতনভাবে পরিহার করে মজিদ মাহমুদ নতুন বিষয়কে পাঠকের সামনে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন।
তাই পাঠককুল সাধারণ মজিদ মাহমুদের কাব্যে নতুনত্বের স্বাদ উপভোগ করতে পারেন। ১৯৪৭ পরবর্তী বাংলা কবিতায় ঘুরেফিরে একই বিষয় বাংলা কবিতায় বিষয়বস্তু হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। যেমন প্রেম, প্রকৃতি, রোম্যান্টিক ভাবনা, বিরহ-বিচ্ছেদ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, লোকজ উপাদান- এই রকম বেশ কিছু কমন বিষয়ে বাংলা কবিতাকে অনেকটা সীমায়িত করা হয়েছে।
কিন্তু মজিদ মাহমুদ মানেই এ সব কিছুর বাইরে নতুন কিছু, একই সঙ্গে তা ভীষণভাবে জীবনঘনিষ্ঠ। ‘কাটাপড়া মানুষ’ এমন একটি কাব্যগ্রন্থ। ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে এ কাব্যটি প্রকাশ পায়। ইতোমধ্যে এই গ্রন্থটি পাঠক সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করছে। এই কাব্যে মোট ৪৪টি কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে। কবি ভাবনার শৈল্পিক প্রকাশে কাব্যগ্রন্থটি শিল্পসমৃদ্ধি লাভ করেছে।
‘কাটাপড়া মানুষ’কাব্যে মজিদ মাহমুদ সমকালীন সামাজিক চিত্র ধারণ করেছেন। মজিদ মাহমুদের কবিতায় এ রকম কালিক সমাজ-চিত্র পরোক্ষভাবে কবিতার কাঠামো পরিপুষ্ট করেছে। মজিদ মাহমুদ সমকালীন কবি ও কাব্যচর্চা সম্পর্কে কতিপয় বিষয় বাস্তবতার নিরিখে কাব্যিক আবহে কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। সহজ কথায়, কাব্যানুশীলন ও বাস্তব-জীবনের সঙ্গে তোষামোদের সমন্বয়-সংযোগে কিছু কবি সমাজে বিশেষ অবস্থান তৈরি করে এবং এ সব কবিরাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, পুরস্কৃত হয়। মজিদ মাহমুদ এসব কবিদের কাব্যচর্চা সম্পর্কে বলেছেন-
‘তারা বাজারের ফর্দ লিখছেন, পুলিশের বিধিমালা লিখছেন
শেয়ালের হুক্কাহুয়া লিখছেন, জঙ্গিদের ইস্তাহার লিখছেন
ইন্দো-মার্কিন ভিসা খুঁজছেন, মক্কায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন’।
আর যাঁরা প্রকৃত কবি, তাঁরা ইট-বালি-সুরকির মতন পুরানো দালান থেকে খসে পড়ছে। এ প্রসঙ্গে কবি মজিদ মাহমুদ বলেছেন-
‘আর আমার মতো যারা লেখা দিয়েছেন ছেড়ে
তারা কাটাপড়া মানুষ
তাদের জিভ নেই, তর্জনি ও মধ্যমা নেই
মিলিত হওয়ার লিঙ্গ নেই
বালি ও সুরকির মতো পুরোনো দালান থেকে
তারা প্রতিদিন খসে পড়ছে…।’
মজিদ মাহমুদ সমাজ-সচেতন কবি। সমাজের ঘটমান ঘটনাগুলো তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এগুলো মজিদ মাহমুদের ভাবনার গভীরতলে ভীষণভাবে আলোড়ন তোলে। এ উপলব্ধিজাত অনুভূতির ভাষিক রূপায়ণের শিল্প-জাত কাঠামোই তাঁর সৃজনকর্ম। গ্রষ্টা তো নিরপেক্ষ সত্তা। কবিও সৃষ্টিশীল মানুষ হওয়ায় তিনি নির্মোহ দৃষ্টি দিয়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ-প্রতিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন।
মজিদ মাহমুদও সমকালীন সময় ও সমাজকে একইভাবে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কাব্যে ধারণ করেন। একজনের পুত্র রাতে ঘরে ফেরেনি। একজনের কন্যা ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে উদ্বন্ধনে মরেছে। একজন মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি পায়নি। ঘটনাগুলো যেভাবেই হোক ঘটছে; এটি সত্য কিন্তু সত্য বলবার বা প্রতিবাদের সুযোগ কই? কবি বলেছেন-
‘দেশের প্রধানকেও কিছু বলা যায় না
বললে তার সৈনিকেরা ক্রুদ্ধ হন
আমি তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে এ সব কথা বলতে চাইনি
আমার যে পুত্র রাতে ঘরে ফেরেনি
যে কন্যা ধর্ষণে অপমানে উদ্বন্ধনে মরেছে
অথচ হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি পায়নি
তিনবেলা পান্তার সাথে পেঁয়াজ পেলে
প্রেম ও প্রার্থনা জানাতে পারলে
আমার তো অভিযোগের কারণ দেখি না।’

এই কবিতাংশে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ-প্রতিবেশের বাস্তবচিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। সব মানুষই কোনও না কোনও ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রতিবেশে বেড়ে ওঠে। তাই স্থানিক ও কালিক পরিচয় ও এর প্রভাব অনস্বীকার্য। বিশেষত একজন সৃজনশীল মানুষের জন্য আরও বেশি। মজিদ মাহমুদের কাব্য-প্রকরণে কালিক প্রভাব বিশেষত রাজনৈতিক আবহে রাজনীতিবিদগণের নৈতিক স্খলনের বিষয়টি উপস্থাপিত হয়েছে।
আমরা একে অপরের দোষারোপ করি। কিন্তু সংশোধন ও পরিশুদ্ধ অভিযান সবার মধ্যে অনুপস্থিত। এইভাবে দোষারোপের রাজনীতি ও এর নেতিবাচক প্রভাব যেন আমাদের নিয়তি নির্ধারিত। কবি বলেছেন-
‘সরকার আগের মতো লাঠিপেটা করে
আরামবাগে কিংবা জালিয়ানওয়ালাবাগে হত্যা করে
ছাত্র মিছিলে গুলি চালায়
নিজের দেশের সম্পদ অন্য দেশে পাঠায়
কিন্তু তার প্রতিবাদ করা যাবে না
প্রতিবাদ করলে হিরো থেকে জিরো
পুলিশ পেটাবে, দলের সমর্থকরা ছুরি মারবে
অপবাদ মাথায় নিয়ে ঘুরতে হবে
কেউ পক্ষ নেবে না
উল্টো উপদেশ বিলাবে
কে বলেছে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে
অমুকরা কি তমুক করেনি
তা ঠিক, আগে বিছানায় খেত, এখন বিছানায় হাগে
রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে এবং ক্রমান্বয়ে তা বেড়েই চলছে। ‘আগে বিছানায় খেত, এখন বিছানায় হাগে’ শব্দবন্ধ দ্বারা রাজনীতিতে রাজনৈতিক ব্যক্তির আচরিত কর্মকান্ডের ক্রমান্বয়ে অধঃপতন, দেশ ও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে রাজনীতিকে ব্যক্তির হীনস্বার্থে ব্যবহার এবং এগুলো যেন নিয়তির লিখন। কবি দুঃখভরা মনে বলছেন, ‘অন্যায় মেনে নেওয়া স্বাধীন দেশের নিয়তি।
রাজা এবং ক্ষমতা দুটি শব্দবন্ধের মধ্যে একটি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সম্পর্কসূত্র রয়েছে। রাজা এবং প্রজার মাঝখানের অনির্ণেয় দূরত্ব। রাজা খুশি থাকলেও স্যাঙাতরা তাকে ভুল বোঝাতে পারে। এতে প্রজা ও প্রতিদ্বন্দ্বী খুনও হতে পারে। কারণ রাজার কাছে ক্ষমতাই সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে নিজের ছেলে, পিতা বা ভাই সবার ক্ষেত্রে একই রীতি; অন্তত ইতিহাস তো সে কথাই সাক্ষ্য দেয়। কেবল চলমান সমাজ চিত্র নয়; মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন আমল থেকে অদ্যাবধি সময়কালে সংঘটিত রাজনৈতিক খুন-গুম-হত্যার সামাজিক-সাংস্কৃতিক চালচিত্র কবি মজিদ মাহমুদের কাব্য-বোধে বেদনার রঙ জমাটবদ্ধ হয়ে ওঠে। কবি শব্দের সঙ্গে শব্দের সংযোজনে তাঁর হৃদয়ে প্রতিফলিত বেদনার ভাষিক রূপদান করেন। কবি বলেছেন-
‘রাজার কাছে ক্ষমতার প্রশ্ন সর্বাগ্রে
কেবল তোমার ছেলেকে নয়
নিজের ছেলেকেও প্রয়োজনে করে দেবে দূর
পিতা কিংবা ভাই সবার জন্য একই রীতি
ক্ষমতা হলো একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যাপার
ক্ষমতা কারো ভাই নয়
পিতা কিংবা সন্তান নয়
ক্ষমতা একটি মডার্ন মেশিন।’
সমকালীন সময়ের কবি ও কাব্যচর্চার প্রসঙ্গটি মজিদ মাহমুদের কবিতায় কাব্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কবিতায় মানবতার ছবি নেই, আছে সংগঠনের চিহ্ন। বাতাসের গতিবেগ দেখে তাদের পতাকা উত্তোলিত হয় অর্থাৎ কবিতা রচিত হয়। প্রচার-প্রকাশ আর পুরস্কারের লক্ষ্যে কবিরাও দলের অন্তভূক্ত হয়ে যায়। যে এক সময় তারুণ্যে মার্কসবাদ পছন্দ করতো, সেই এখন পুঁজিবাদের বাহক। কখনও সীমিত গণতন্ত্র। মার্কসবাদের অন্তরালে পুঁজিবাদের ভাবধারা সিঞ্চন; অ-কবিদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে সমবেত অর্থাৎ ঝোপ বুঝে কোপমারা-এগুলোও তো সমাজ চিত্রেরই অন্তর্ভুক্ত। কবি বলেছেন-
‘আমাদের সামনে পরিপূর্ণ কবি নেই
যার পতাকা ধরে কেউ দাঁড়াতে পারে
তাদের পতাকায় নেই মানবতার ছবি
আছে সংগঠনের চিহ্ন
এমনকি তাদের আলাদা রঙ নেই
উত্তোলিত পতাকা ছাড়া
তাদের কেতন উড়ে বাতাসের ভাবগতি দেখে
আবার অনেক কবি কবিতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। শাসক ও সময়কাল বুঝে তাঁরা কবিতা লেখেন। সময়-স্থান-ব্যক্তিভেদে কবিতার তাৎপর্য ও নন্দন বিচার বদলে যায়। আমলার সান্নিধ্য, প্রমোশন, সচিবালয়ের গেটপাশ, দল ও ক্ষমতা বিবেচনার ভিত্তিকে কবিতার কাঠামো, কবি ও কবিতাপ্রেমির মানসগঠন একধরনের সুবিধাজনক ভিত্তি মজবুত করে। কবি বলেছেন –

‘আমলার সান্নিধ্য পেতে কবিতা মোক্ষম উপায়
প্রমোশন, এমনকি সচিবালয়ের গেটপাসের বদলে
অনেকে দু’চার লাইন কবিতা নিয়ে ঘোরে
দল ও ক্ষমতার বিবেচনায় পাল্টে যায় কবিতার রূপক’

এক সময় ছিল, কবিরা বিবেকের তাড়নায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। যেমন করেছেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কিংবা শামসুর রাহমান। কিন্তু বর্তমানে কবিরা প্রতিবাদের ভাষা ভুলে গেছেন। তনুজা নামের মেয়েটির কীভাবে মৃত্যু হলো- এটি কমবেশি প্রায় সবাই বুঝতে পারল। কিন্তু কোনও কবিই কবিতা লিখতে পারল না। প্রতিবাদ করতে পারল না। অথচ তাঁরাই মেয়ে বন্ধুদের ভালবাসার সম্মানে কত প্রেমের কবিতা লিখেছে। আসলে তনুর মৃত্যু প্রসঙ্গে মজিদ মাহমুদের কবি-মন ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। মজিদ মাহমুদ ক্ষুব্ধানুভূতি কবিতায় বাণীবদ্ধ করেছেন এভাবে-
‘এতকাল যে সব প্রেমের কবিতা লিখেছিলাম
মেয়ে বন্ধুদের ভালোবাসার সম্মানে
আজ মনে হচ্ছে এসব ছিল ধর্ষণের গোপন ইচ্ছে
যে সব কবি তনুজাকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারে না
তাদের কবিতার প্রতিটি শব্দের আরেকটি মানে
বিকৃত কাম, ধর্ষণ ও নারী হত্যা।’

অপ্রত্যাশিত, অমানবিক অনেক ঘটনাই সমাজে ঘটে যাচ্ছে। মানুষের চোখের জল নীরবে-নিভৃতে ঝরছে। বেদনাময় স্মৃতির পাহাড় জমে উঠছে। শবে-বরাতের রাতে খেলতে যাওয়া শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে। নিষ্পাপ ত্বকিরা হারিয়ে যাচ্ছে। তারা মৃত হয়ে বাড়ি ফিরছে। শীতলক্ষ্যার জলে ভেসে উঠছে মানুষের লাশ। রানাপ্লাজা ধসে পড়ছে। এই ঘটনা মজিদ মাহমুদ তাঁর কাব্য-জমিনে প্রস্ফুটিত করে তুলছেন। এইসব অনাকাঙ্খিত ঘটনা কবিকে ভীষণভাবে ব্যথিত করছে। কবি-মন বেদনায় নীল হয়েছে। কারণ, এখন লাশ ঘরের দুয়ারে। কবি-ভাষ্য নিম্নরূপ-
‘এখন লাশ ঘরের দুয়ারে, তাই তোমরা সরাতে চাও
তোমরা কি জানো মেঘ কোথায়
মা ও বাবার টুকরো টুকরো লাশ
সযত্নে রেখেছে ঢেকে সে তার চোখের পল্লবে
শবে-বরাতের জোসনায় যে সব কিশোর
খেলতে গিয়েছিল বালুর মাঠে
কে তাদের বাবা-মাকে দিয়েছিল লাশের উপহার
তোমরা কি ভুলে গেছ ত্বকির নিষ্পাপ মুখ
তার বাবার কোটি টাকার মামলা
শীতলক্ষ্যায় ভেসে ওঠা মানুষের নির্মমতার সাক্ষী
এই সব মানুষ, নাম না জানা মানুষ
প্রতিদিন স্মৃতি থেকে চলে যাচ্ছে স্মৃতির গভীরে’

সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস, ধাপ্পাবাজি, সীমাহীন লুণ্ঠন-নির্যাতনে সমাজব্যবস্থা আপাদমস্তক অন্ধকারের অতলতলে নিমজ্জিত। মানুষ দিশেহারা। ন্যূনতম নিরাপত্তাও নেই। শিশুরা খেলতে বের হলে অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা সেই নিশ্চয়তা কোথায়? সামাজিক বিকৃঙ্খলা, মনুষ্যত্বের অধঃপতন, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ পরিণামে মানুষ মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।
মজিদ মাহমুদ সমকালীন সমাজ বাস্তবতার সামাজিক বাস্তবিক চিত্র তাঁর কবিতায় নিজস্ব কাব্যিক ঢঙে উপস্থাপন করেছেন। সমাজে প্রতিফলিত বাস্তব রূপ তিনি কাব্য-সাহিত্যে শিল্প-রূপে রূপান্তর করেন। তাই স্থির নিরপেক্ষ সাধনার শিল্প ফসল তাঁর কবিতা।
মজিদ মাহমুদের কাব্য-সম্ভার সমকালকে ভিত্তি করে সমৃদ্ধি লাভ করেছে। সময়, সমাজ, সমাজ¯’ মানুষের আচরিত কর্মকান্ডের প্রেক্ষণবিন্দুকে ফোকাস করে তিনি কাব্য-পরিধিতে অন্তর্জাত উপলব্ধির সুর সংযোজন করেন। সামাজিক প্রতিবেশে সংঘটিত ব্যক্তির বিপ্লবী ভাবনা এবং তৎসংলগ্নে রাষ্ট্রীয় আচরণ-এগুলো কবি-চৈতন্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধজনিত উপলব্ধির অন্তঃসারশূন্যতা কবিমানসে সর্বদা ক্রিয়াশীল।
নিরপেক্ষ অন্ত ও সমাজ-দর্শনের যৌক্তিক বোধ তাঁর কাব্য ও জীবন-দর্শনের অনস্বীকার্য শিক্ষা। কবি বলেছেন, ‘প্রকৃত কবির কাছে / থাকে শিক্ষার অতীত সুর ও বাণী, প্রকাশের কৌশল; তা অন্য কেউ জানে না।’ (আহসান হাবীব ও কবিতার শিশু) প্রকাশের কাব্য-কৌশল ও প্রকরণশৈলির শিল্পিত বুননে কবির সামাজিক অভিজ্ঞান নান্দনিক মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে। সমাজকে তিনি নির্মোহ ও নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণের শিল্প-ভাষ্যই তাঁর কাব্য-রূপ। তাই ‘জঙ্গি’ও ‘ক্রসফায়ার’এর মত বিষয় বর্তমানে মজিদ মাহমুদের কবিতায় যৌক্তিক পর্যবেক্ষণে কাব্য-ভাষা পেয়েছে। কবি বলেছেন
‘আজ ঈদের দিন বলেই সবার পাশে বসতে
আমাকে অনুরোধ করো না প্রিয়তমা
যে সব জঙ্গি পাঞ্জাবির পকেটে রেখেছে টাইম বোমা
আর যে সব পুলিশের বেল্টে ক্রসফায়ারের নোট
এই পবিত্র দিনেও তাদের পাশে আমি বসতে পারব না
কারণ তোমাকে চুমু খাওয়ার অদম্য ইচ্ছা
এখনো আমি হারিয়ে ফেলিনি’

মানুষ সমাজে নৈঃশব্দে বাঁচে, নিঃস্তব্ধ থাকে। আগের মত দেখতে পারে না, আগের মত কথা বলতে পারে না, আগের মত প্রতিবাদ করতে পারে না। তাহলে কি মানুষ প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ! তাহলে কি মানুষ শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ! মানুষ এখন একই কথা বলছে, বার বার বলছে। মার্কিন মুলুকের ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কির সেই কথাটি কি প্রতিফলিত হচ্ছে যে, শব্দ সুনির্দিষ্ট এবং এক সময়ে শব্দ শেষ হয়ে যাবে।
চমস্কি নয়; মূলত মজিদ মাহমুদ সমাজ-বাস্তবতার একটি বিশেষ দিক কাব্যে রূপায়িত করেন এভাবে-
‘নেতাদের বক্তৃতা একবারই রেকর্ড হয়েছে
পল্টন ময়দানে কিংবা নয়াপল্টনে; ধানমন্ডি কিংবা গুলশানে
ব্রিজ কিংবা কালভার্ট উদ্বোধনে; আনন্দ কিংবা শোক-সমাগমে
বাসের হেলপার কিংবা শিক্ষক ক্লাশ-রুমে
প্রেমিক প্রেমিকার কানে একই কথা উচ্চারিত হচ্ছে
তারিখ পাল্টে প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছে একই দৈনিক
হয়তো আমি বুঝবো না ভেবে
কবিরা উপহার দিচ্ছেন একই কবিতার একাধিক বই। ’

পরিবর্তনশীল বিশ্বে আর দশটি জিনিসের মত মানুষও পরিবর্তন হচ্ছে। অর্থাৎ সমাজ-কাঠামোও পরিবর্তন হচ্ছে। খুন, গুম, ধর্ষণ এগুলো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু কান্না, কিন্তু প্রতিবাদ কোথায় ! কবি নিজেও প্রতিবাদে কোনও কবিতা লিখতে চান না। একটি হত্যাকান্ডের পিছনে রয়েছে আর একটি হত্যা। অথবা এই হত্যার জন্য আর একটি হত্যা অপেক্ষা করছে। কবি বলেছেন

‘হত্যাকান্ড দেখলেই আমি তার প্রতিবাদে কবিতা লিখি না
জানি এই হত্যাকান্ডের বিনিময়ে ঘটবে আরেকটি হত্যাকান্ড
এমনকি বর্তমানের হত্যাকান্ডটিও পুর্বের হত্যাকান্ডের ফল
হত্যার প্রতিবাদ মানে আরেকটি হত্যাকান্ড প্ররোচিত করা
হত্যার প্রতিবাদ মানে তাজা শোকের উদযাপন’

অবস্থা দেখে মনে হয় মানুষ এগুলো সাদরে গ্রহণ করেছে, নয় বধির ও মূক হয়েছে; অথবা সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সমাজের অসহায়ত্বের বৃত্তাবদ্ধ সময়-চিত্রটি মজিদ মাহমুদের কাব্য-ভাবনার ভেতর দিয়ে কাব্য-ভাষায় রূপ পেয়েছে এভাবে ‘সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে বিস্মরণ ও নৈঃশব্দ বাঁচা !
হয়তো রবীন্দ্রনাথ থাকলে অহেতুক বলতেন,
‘এইসব মূঢ় ম্লান মূক মুখে দিতে হবে ভাষা।’
‘কবিতামালা’র ভূমিকাংশে নিজের কবিতা প্রসঙ্গে মজিদ মাহমুদ বলেছেন,

‘এই কবিতাগুলোই আমি। আমার সময়। আমার দেশ ও মহাকাল। ‘কাটাপড়া মানুষ’ কাব্যপাঠে এটি খুব সহজেই বোঝা যায় যে, মজিদ মাহমুদ সমকালীন সময় ও সমাজকে অবলম্বন করে তাঁর কাব্য-সুষমার নান্দনিক ভুবন সৃজন করেছেন। কবি তো নিজেও সমাজেরই অংশ।
চলমান সমাজের ঘটমান নানাবিধ কর্মকান্ডের সঙ্গে কবির প্রত্যক্ষ পরিচয় অনস্বীকার্য। কিছু কিছু ঘটনা নিশ্চিতভাবে কবিকে কখনও কখনও ভীষণভাবে প্রভাবিত করে; কবির বোধ ও ভাবনার জগতে ভীষণভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিবেক তাড়িত এই সব অনুভূতি শব্দকে আশ্রয় করে কাব্য-রূপ লাভ করেছে। তাই সামাজিক অভিজ্ঞানের শৈল্পিক ফসল তাঁর এই সব কবিতা।
মজিদ মাহমুদ তাঁর উপলব্ধিজাত বিষয়টি শব্দমন্ত্রে পাঠকর কাছে উপভোগ্য করে তোলেন। তাই সহজেই তাঁর কবিতার রসাস্বাদন করা যায়। ‘অমুক কি তমুক করেনি / তা ঠিক, আগে বিছানায় খেত, এখন বিছানায় হাগে।’ এই কবিতা-চরণ একদিকে সুখপাঠ্য, অন্যদিকে নির্ভেজাল সত্য-দর্শনে শৈল্পিক সংহতি লাভ করেছে। ‘কাটাপড়া মানুষ’ কাব্যের কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ কবিতাগুলো ভাষিক রূপ লাভ করেছে। মজিদ মাহমুদ সমাজে চলমান ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। যেমন : ধর্ষণ, হত্যা, গুম, খুন, প্রতারণা, দলবাজি, ক্রসফায়ার, জঙ্গী হামলা, পকেটে টাইম বোমা-এ রকম আরও বহুবিধ বিষয় কবিকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। কবির সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে, সেই সঙ্গে বিবেকের শাসন।
তাই আর দশজন কবির মতো তিনি বিষয়গুলো এড়িয়ে যাননি। বরং সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন এবং তাঁর এই অনুভব ও উপলব্ধির সারসত্য তিনি কতকগুলো শব্দে-ছন্দে আবদ্ধ করেছেন। আর এভাবেই তৈরি হয়েছে ‘কাটাপড়া মানুষ’ কাব্যের এক একটি কবিতা।
সুতরাং, এটা অনস্বীকার্য যে, ‘কাটাপড়া মানুষ’কাব্যের প্রত্যেকটি কবিতা সমাজ ও বাস্তববোধের শৈল্পিক বুনন এবং কবি মজিদ মাহমুদ যেভাবে সমকালকে কাব্যে ধারণ করেছেন সেভাবে আর কোনও কবি করেননি। সঙ্গতকারণেই ‘কাটাপড়া মানুষ’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতায় অনন্য সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ, পাবনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *