বছর পঁচিশ পরেও

একটি গ্রন্থের, বিশেষত একটি কাব্যগ্রšে’র মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই তাকে বিষয় করে একটি আলোচনা সংকলন প্রকাশিত হওয়া নিঃসন্দেহে গ্রন্থটির ও গ্রন্থকর্তার পক্ষে একটি গৌরবজনক ব্যাপার। ‘মাহফুজামঙ্গল’ ও তার কবি মজিদ মাহমুদ এই বিরলপ্রায় গৌরবের অধিকারী। যাঁদের উদ্যোগে এই আলোচনা-সংকলন প্রকাশিত হয়েছে তাঁদের মনে হয়েছে, ‘নারীপ্রেমের মোড়কে কবি এই গ্রন্থে’ একটি জাতির ভাষা ও সভ্যতার বিবর্তনের অনুপুঙ্খ চিত্র তুলে ধরেছেন, শুধু তাই নয়, এই ‘মাহফুজামঙ্গল’ মধ্যযুগের মুকুন্দ চক্রবর্তী, বিজয় গুপ্ত, ভারতচন্দ্রের মত কবিদের সঙ্গে আধুনিক কবিদের যোগসূত্র হিসেবেও উজ্জ্বল ভূমিকা নিয়েছেন।
এই সংকলন গ্রন্থটিতে ‘মাহফুজামঙ্গল’অবলম্বনে তেত্রিশটি আলোচনা গ্রথিত হয়েছে। ‘মাহফুজামঙ্গল’কে বিভিন্ন দিক থেকে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে কাব্যগ্রন্থটির তথাকথিত অসাধারণত্বকে পাঠকের সামনে আনতে সম্পাদকেরা তাঁদের সন্নিষ্ঠ প্রয়াসে কোনও ত্রুটি রাখেননি। যদিও দু-একজন আলোচকের আলোচনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছন্দেই ‘দায়সারা’ বিশেষণ প্রয়োগ করতেই হয়।
দর্শনগত, গঠনগত, প্রেম চেতনাগত, আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে ‘মাহফুজামঙ্গল’ যে বিচিত্রভাবে আলোকিত হয়েছে তাতে কাব্যগ্রন্থটির একটি স্পষ্ট অবয়ব পাঠকের কাছে ফুটে উঠেছে।

কোনও কোনও আলোচক এই কাব্যগ্রন্থটিকে নতুন কবিভাষা আর আঙ্গিকে রচিত আধুনিক মঙ্গলকাব্য আখ্যা দিয়ে আক্ষরিক অর্থে মঙ্গলকাব্য হিসেবে যে সব যুক্তি দিয়েছেন তার প্রেক্ষিতে বলা যায়, এ জাতীয় প্রয়াস কিন্তু অদৃষ্টপূর্ণ নয়। পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের ‘শবযাত্রা’র সংযোজন অংশ ‘ভাসান’ আজ থেকে অর্ধশতাব্দীরও আগে কিন্তু লেখা, যার আপাত অবলম্বন ছিল মনসামঙ্গলের কাহিনী।
মুকুন্দ চক্রবর্তী, ভারতচন্দ্র যেমন ‘মাহফুজামঙ্গল’ প্রসঙ্গে উল্লিখিত হয়েছেন তেমনি বিহারীলাল থেকে শুরু করে শক্তি, সুনীলের কবিতা প্রসঙ্গও এসেছে। সেখানে আলোচকেরা দেখিয়েছেন কীভাবে ‘মাহফুজামঙ্গল’-এ আধুনিক বিশ্ব জগতের নিষ্ঠুর বিপর্যস্ত চেহারার ছবি আঁকতে গিয়ে কবি আধুনিক বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে স্বীকার করে নিয়েছেন। একটি আলোচনায় যেন বিহারীলালের ‘সারদামঙ্গল’-এর প্রসঙ্গ টেনে এনে মাহফুজার স্বরূপ নির্ণয়ের প্রয়াস করেছেন। দেখিয়েছেন, মূলত প্রেমিকা রূপে প্রতিভাত হলেও মাহফুজার স্বরূপেও বৈচিত্র্য লক্ষণীয়।
আবার ‘প্রেম পদাবলীর নয়া সাধক’ শীর্ষক আলোচনাটিতে ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর কবির রাজনৈতিক সচেতনতা বিক্ষিপ্তভাবে হলেও বিচার করার প্রয়াস রয়েছে। আলোচনাগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি আলোচনার উল্লেখ না করলে অবিচার করা হয়। সেদিক থেকে চৈতন্য চন্দ্র দাস, অনু হোসেন, খালেদ হামিদী, কবির হুমায়ুন প্রমুখ পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সব মিলিয়ে এই আলোচনা সংকলনটি নিঃসন্দেহে যে পাঠকের কাছে ‘মাহফুজামঙ্গল’কে বিভিন্ন রঙের আলোকে উজ্জ্বল করে তুলবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আমরা আশা করব মাহফুজামঙ্গল-এর মতই মজিদ আর একটি এমন গ্রন্থ লিখুন যা আবারও পাঠককে এমনতর অভিনবত্বের আস্বাদ দেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *