মজিদ মাহমুদ : কবির নিজস্ব স্বরই কবিতার ভাষাপ্রাঙ্গণ

আত্মসুখ এবং বিশ্লেষক ও অনুরাগী শব্দবন্ধে পাঠক প্রায়শই জড়িয়ে পড়েন। কবিতার মহত্তম উপাদানগুলি অক্ষরের শরীর নিয়ে শিল্পের যে ঘরানা তৈরি করে তার মধ্যেও যেন চেনা জীবনের অপ্রাপ্তি। সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে প্রক্রিয়ার এক অমোঘ রীতি এবং নতুন কথনের নিরিখ। কল্পনার ভিতরে থাকে শিল্পীত জীবন এবং অনুভূতিতে থেকে যায় আন্তর্জাতিকতা। শুধুমাত্র বুদ্ধি সর্বস্বতা দিয়ে কবিতাকে যুক্তিগ্রাহ্য করা যায় না। পাঠকের চোখ আজ সব কিছু দেখে নিতে চায়। অনুভূতির আনাচ কানাচের সন্ধান যেন আয়নায় নিজের ছবি দেখার মতো। কোনোরকম গৌরচন্দ্রিকা নেই অথচ আছে চিন্তার স্বাক্ষর। কবিতার নিভৃত স্বর কবিতার নিজস্বতায় এক ভাষা প্রাঙ্গণ তৈরী করে। এমনই এক ভাষা প্রাঙ্গণের কবি মজিদ মাহমুদ। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘সিংহ ও গদর্ভের কবিতা’ গ্রন্থটিতে আছে এমনই এক অভিজ্ঞতালব্ধ আকুতি এবং জীবন চলাচলের মুহূর্ত।
আটের দশকের শুরু থেকেই বাংলা কবিতায় মজিদ মাহমুদ অবশ্যই এক পরিচিত নাম। তার জন্ম ১৯৬৬তে পাবনায়। ১৬ এপ্রিল। পেশা সাংবাদিকতা হলেও বাংলা কবিতার অন্তর্জগতের অন্বেষণ বারবার তাঁর কবিতায় ফিরে এসেছে। কবিতায় ধ্বস্ত সময়ের প্রেক্ষিত কবিতার প্রত্যক্ষতায় তীব্রকষ্ট হয়ে ওঠে আবার প্রকাশ রীতি এবং স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠের জন্য তার চিন্তা ও উপলব্ধি বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে যায়।
এসব উল্লেখেই মনে হয় মজিদের কবিতায় জীবন চেতনার একটি ধারা প্রবল হয়ে উঠেছে যে কারণে কবিতার একটি প্রেক্ষিতের অথবা ধারণার চলাচল যেমন ঠিক তেমন অবস্থাতেই আবার এক নতুন ধারণা কবিতায় ফিরে আসে এই ব্যাপারটি অনেক কবির অনুভবে যে সরল যাতায়াতে থাকে তা কিন্তু নয়, কিন্তু ব্যতিক্রম মজিদ মাহমুদ; সমকাল এসে উপস্থিত হয় নিজস্ব ভাষায়। নিজস্ব বিভায় এক অন্তঃশীল ফল্গু ধারার মতো। বিপ্রতীপধর্মী বর্ণনার মিশ্রণ একত্রিত হয়ে কবিতায় ছোট ছোট ছবি রচিত হয় যা বহুমাত্রিক এবং প্রতীকাশ্রিত এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। মুগ্ধতার বাইরে থেকেও জীবন আখ্যান চলে আসে। এর আগে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ‘মাহফুজামঙ্গল’, ‘গোষ্ঠের দিকে’,‘ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম’ইত্যাদি আরও গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কবিতা পাঠকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
যে কোনো সার্থক কবির মতোই তাঁর প্রতিটি নির্মাণের মধ্যে ফুটিয়ে তোলেন দৃশ্যমানের মধ্যেই অদৃশ্য, কিন্তু অবশ্যই অমোঘ এক বার্তা যা পাঠককে সহজেই জানিয়ে দেয় কি তার দর্শন। বিশ্বাসযোগ্যতার এক নিবিড় ভূমি তাঁর কবিতার শরীবে জড়িয়ে যায় ‘মাঝে মাঝে মনে হয় মরে যাওয়া ভালো
মাঝে মাঝে মনে হয় বেঁচে থাকি
যাদের জন্য বেঁচে থাকতে চাই তারাই বা আমার কে
আবার যাদের জন্য মরে যেতে চাই তারাই বা আমার কে
আনন্দ যা কিছু নিজেই পেয়েছি
দুঃখ দিয়েছে পরিচিতজন
তবু স্বজনহীন মরে যাওয়া কম দুঃখের নয়।’
(স্বজন)

মজিদ মাহমুদের কবিতার অন্তর্ভাবনায় থাকে এক আলোকরেখা যা প্রকৃতই সত্য উন্মোচনের দিকে, অন্তঃশীল ভাবনার স্বাধীনতার দিকে। কবিতা পাঠকের কাছে তাঁর লেখা এতটাই বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণীয় হয়েছে তার প্রধান কারণ অনেকানেক টুকরো টুকরো বাস্তব ও স্বপ্নময়তা এবং প্রেম ও প্রতিবাদ প্রতি মুহূর্তেই হয়েছে স্বতন্ত্রতায় উজ্জ্বল। কবিতা যে অনেক কিছু তা তাঁর কবিতাতেই উদাহরণ হয়ে আছে। সমকালকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন নিজের মতো করে। অনেকটা প্রয়োগবাদী বলা যেতে পারে। কখনো উচ্চকণ্ঠ আবার কখনো নতুন প্রবর্তনার আঙ্গিকে এবং সচেতন উচ্চারণের পক্ষে সময়ের মাধুর্যকে তুলে ধরেছেন। সময়ের সঙ্গে তিনি কখনো দৌড় প্রতিযোগী না হয়েও তার সঙ্গে সমানে পাল্লা দিতে দিতে বলেছেন-
‘কিভাবে নিজেকে জানতে হয়
কিভাবে আত্মনং বিদ্ধি
সক্রেটিসও তো একই কথা বলেছিলেন ….
নো দাইসেলফ
কিন্তু কিভাবে নিজেকে জানবো।’
(দাইসেলফ)

এই জানা-অজানা, এই সৃজ্যমান অনুচিন্তা মজিদের কবিতার এক বিশেষ সম্পদ। কবি তাঁর নিজস্ব রচনারীতি এবং ভাষাছাঁদে নিজেকে এবং বারে বারে তাঁর কবিতাকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছেন। জীবনের সকল নিঃস্বতা দূরে সরিয়ে কখনো বাস্তব আবার কখনো এক রোম্যান্টিক গীতল আবেগ যার ভিতর দিয়ে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে জীবনাতীতের ইশারামাত্র। কি নিবিষ্ট ভাষাছন্দে কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে এবং চিত্ররূপময়তায় আচ্ছন্নতা পেয়েছে –
‘আমি চাইতাম পাখিটি উড়ে যাক
আমার ঘরের পাশে সারাদিন যেন না শুনি তার সুমধুর ডাক
তাই ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে তাকে দিয়েছি হাততালি
সত্যিই কি আমি চেয়েছিলাম -তাকে হারিয়ে ফেলি’
(পাখিটি)

আবার কখনো কখনো কবিতায় এক অদ্ভূত নীরব মিশেল নিয়ে আসেন যার প্রবাহে অভিজ্ঞতাপুঞ্জের স্ফুরণ ঘটে কবিতায়। নিজের মতো করে কবিতায় আত্ম বিশ্লেষণকারী অভিজ্ঞতার নিরিখ যেন ঝিলিক দিয়ে উঠে। তখন মনে হতে থাকে স্নিগ্ধ অন্তর্লীন ভাবনাও যেন অনাড়ম্বর আবছায়ায় মজিদের কবিতাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে তোলে। তখন তার ভিতরে এক সিল্যুয়েট ভাবনার বিস্তার ঘটে যায়। তিনি নির্ভার অবচেতনে অন্য এক জীবনবোধের আশ্রয়ে থাকেন-

‘আজ রাত ভোর হলে আমার গাছজীবন শেষ হয়ে যাবে
কাঠুরিয়া এসেছিল কাল রাতে, সব ঠিক হয়ে গেছে
করাত কলের শব্দে আমার রাত্রির ঘুম ভেঙে যাবে
বুকের মধ্যে তুমুল আলোড়ন, আমি শুধু মৃত্তিকার কথা ভেবে
কষ্ট পাচ্ছি; আমার নিবিড় ডালপালা একমাত্র আশ্রয় করে
একটি মা পাখি দুটো ডিম বুকে নিয়ে কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।’
(গাছ -জীবন )

মজিদ মাহমুদ তাঁর দশকের একজন সমকাল সচেতন কবি। প্রেমের এবং প্রেম হীনতার প্রেক্ষিতও কবিতার গভীরে তিনি মাঝে মাঝেই যাচাই করে নিতে চান। দূরান্তের স্বপ্ন তাঁকে বিচলিত করে-
‘স্বপ্নে কি মানুষ কিছু দেখে
স্বপ্ন তো এলোমেলো
কোথাও যাওয়ার কথা
ভবিষ্যৎ স্বপ্ন হয়ে এলো’
(স্বপ্ন)

প্রতিটি মুহূর্তেই যেন মজিদ সংশয়ী অথচ জীবনের প্রতি তাঁর এক ঝলক স্নিগ্ধতার, উষ্ণতার আসক্তি আছে। কোনোরকমের প্রতিবন্ধকতার তিনি ধার ধারেন না, অথচ মনোভাবটি যেন চির যৌবনের, চেতনার বহু স্তর পেরিয়ে যাওয়া এক যুবকের। সকল নির্মোক তিনি সরিয়ে রাখতে চান-
‘কিন্তু আমি কিভাবে তোমার কাছে যাবো
আমি তো পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারি না; তাই
দিনের আলোতে ঘাসের নিচে লুকিয়ে রাখি পথ চলার লজ্জা
রাত এলে তোমার খোঁজে একে বেঁকে
বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়’
(সাপ)

যেন আকাঙ্ক্ষাহীন এক অন্তর্লীন ভাবনা। মনের দীর্ঘ স্পন্দনে রয়েছে এক অবচেতন স্তর, সেই স্তরের গভীরে খেলা করে পৌরাণিক ইতিবৃত্ত। সামনে বিস্তৃত পথ, নেই পারিপার্শ্বিক বিপর্যয় তবুও জীবন সাধনার নিরিখে তাঁর মনোভঙ্গি দৃপ্ত হয়ে ওঠে ‘একটু ভেবে দেখো, শিশুদের আসার চেয়ে/ বৃদ্ধদের যাওয়া কি আরো অনিবার্য নয়/ তাদের মা নেই/ গড়িয়ে পড়ার মতো পিচ্ছিল কোনো পথ নেই/ এমনকি সবাই ধরাধরি করে শুইয়ে না দিলে/ শেষ পর্যন্ত কবরেও নামতে পারে না’। (ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম সমকালকে মজিদ সঙ্গে নিয়ে চলেন। নিজের মতো করে লেখেন। ধ্বস্ত সময়ের প্রতি তিনি অবশ্যই চোখ রেখেছেন, তৈরী করেছেন নিজেকে প্রতিরোধকামী হিসেবে। এমন এক জীবন চেতনা যেখানে তাঁর কণ্ঠ ধ্বনিত হয় এক ভিন্ন দোলাচলে, অংশত অভিজ্ঞতায় –
‘যে অশ্ব দৌড়াতে পারে না তাকে চাবুক মেরে কি লাভ
গতরে শক্তি নয়, লাঙল টানার জন্য আগে চাই অভ্যাস
মন আছে বলেই তুমি দাবী করতে পার না অন্যের অর্জন
ভালো ঘোড়া চাবুকের ছায়া দেখলেও দৌড়ায়-
(চাবুক)

নিজেকে নিয়ে অবিরাম ভাঙা যেন এই কবির সহজাত ভাবনা এবং সে কারণে যে কোনো অসঙ্গতির প্রতি তাঁর তীব্র ক্ষোভ। জীবনের অন্তর্জগতের বাস্তব তাঁকে পীড়ন-
করে, তিনি খুব সহজে বলতে পারেন
‘পৃথিবীতে নেই নাকি নির্লোভ মানুষ
আমারও লোভ তাই নির্লোভ হওয়া’

এই জাগতিক সত্যে মজিদ অবশ্য অচঞ্চল থাকেন, গভীর উপলব্ধির মধ্যেও আবার উজ্জীবিত হয়ে বলতে পারেন, ‘স্বর্গবাসের সব পথ তুমি করেছ রচনা/ তাই আমি ভোগ করি নরক যন্ত্রণা’ -(স্বর্গ-নরক)। মজিদ মাহমুদের কবিতায় কোনো বিস্তৃত ক্যানভাস নেই। আর্ত চিৎকার অথবা অসহায় ক্রন্দনের কোনো ভাবাবেগও তাঁকে তেমন স্পর্শ করে না অথচ মোহজনিত আকাঙ্ক্ষাও মাঝে মাঝে তাঁর ভিতরে খেলা করে, যেন লক্ষ্যভেদী আবহ নিয়েই তাঁর কবিতা চলাচল। অভিজ্ঞতা আর ব্যক্তিগত উপলব্ধির আয়নায় নিজেকে দেখতে পারেন স্বচ্ছন্দে অথচ বর্ণময়তায় ভাস্বরও হয়ে উঠতে পারেন ‘আমি বেঁচে আছি তোমাকে আবিষ্কারের নেশায়/ প্রতিদিন খুলে রাখি রহস্যের গিঁট / এত রহস্য কোথায় ছিল/ নাকি তুমি আমার সঙ্গে করে থাকো চিট’ -(রহস্য)
একদম কোনো তাত্ত্বিক ব্যাপার নেই। নিজের ভাবনার কাঠামো নিজেই স্বচ্ছন্দে গড়ে তোলেন আবার তরঙ্গিত মানসজগতও তৈরী করতে তাঁর মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই। এক ধরনের অন্বেষণ আছে- যেন তা নিজের ভিতরে নিজেকেই খুঁজে দেখা
‘তুমি যাকে বলো জীবনের সঞ্চয়, সে তো শুধু দেনা
তুমি যা নিজের বলে জানো তা তো তোমার ছিল না’
(দেনা)
মজিদের কবিতা যাপনও দীর্ঘ সময়ের। ‘মাহফুজামঙ্গল’ প্রকাশের পরও দীর্ঘ সময়ে কবির একক যাত্রা। কবিতার ভিতরেই মাঝে মাঝে তাঁর আত্ম-আবিষ্কারের স্পর্শ ও অনুভব আমাদের জাগিয়ে রাখে। কবিতায় আছে অনেকানেক বাকসংযম, হৃদয়ের গভীরতার সুর। চিত্ররূপময়তার বদল তাঁর কবিতাতেই বারেবারেই ঘটেছে। কবিতায় কোনো শব্দ বিকার নেই, নেই কোনো আর্ত চিৎকার। দৃশ্য থেকে মুহূর্তে পালটে যায় তার অবলোকন, বাক্যবন্ধ সব সময়েই পুরোপুরি আবেগহীন। মানসিক ঘনত্বে কোথাও জারিত নয় মজিদের কবিতা। আশি দশকের অন্যতম প্রধান এই কবির কবিতা অসীম পূর্ণতার মায়াবী বিস্তারে সমৃদ্ধ। জীবনের সহজ প্রকাশনাই কবিতাকে পাঠকের কাছে প্রাণময় করে তোলে। চারিদিকের বাস্তব প্রেক্ষিত বারবার মজিদের কবিতায় ফিরে এসেছে –
‘তোমার ধারণা জীবে না জড়ে
তোমার আছে কি বৃদ্ধি বা ক্ষয়
তোমার আসন বাইরে না ঘরে
এসব কথা শিশু আর মূর্খরা কয়’
(মূর্খ)

মজিদের কবিতাকে অন্তর্মুখী বললেও হয়ত বা ভুল হবে। নিজের বোধের ভেতরে থেকে সময় অতিক্রমনের মধ্যে দিয়ে তাঁর কবিতা কখনো বদলে যায়, থাকে কল্পনায় এবং বাস্তবেও। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যেতে যেতে তিনি তাঁর ভাবনা বদলেছেন, বদলেছেন নিজস্ব কথন। তিনি হয়েছেন স্থিতধী। কবি মনে করেছেন সব কিছুই ঠিকঠাক এগুচ্ছে তাই হয়ত তিনি বলতে পারেন ‘অনেক হয়েছে যাওয়া/ ভুলে গেছি অভিসার পথ/ যেহেতু হারিয়ে যাব/ অহেতুক অন্বেষণ/ এখানেই থামাও রথ’ -(রথ)। বাংলা কবিতায় এই নিজস্ব ঘরানায় বিজয়ী এবং প্রত্যয়ী কবি ক্রমশ পাঠকপ্রিয়তায়, চির মুগ্ধতায় আরও নতুন কবিতায় সবাইকে ঋদ্ধ করবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *