বাংলা কবিতা এখনও তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেনি, এখনও এ ভাষার এবং কবিতার পক্ষে অনেক কিছু করার আছে, মজিদ মাহমুদের ‘বল উপাখ্যান’ পড়তে গিয়ে এ কথাই মনে হচ্ছিল। সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার ভাষার এত শক্তি থাকতে পারে, কবিতার বিষয় এত প্রগাঢ় হতে পারে, উল্লিখিত গ্রন্থটি পাঠ না করলে ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যেত। যদিও কবিতার বিষয় সৌন্দর্য সব সময় বড় নয়, তবু কবিতা দর্শনশাস্ত্রের জটিল বিষয়গুলোও যে অনায়াসে আত্তীকরণ করতে পারে উপর্যুক্ত গ্রন্থটি তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হতে পারে। এ গ্রন্থের কবিতার মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব বাংলা কবিতা কিভাবে তার ঐতিহ্যপথে অগ্রসরমান। তবে গ্রন্থটি পঠনে পাঠকদের ক্রমবিকাশ প্রয়োজন। কবিতার অলস পাঠক হয়তো এ কবিতার গভীরে প্রবেশ করতে পারবে না। কবিতার নবীন পাঠক গ্রন্থটি পড়তে গেলে হোঁচট খেতে পারেন, তাছাড়া কবিতা নিয়ে যাদের পূর্ব ধারণা রয়েছে তারও। নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ গ্রন্থের ভেতর প্রবেশ করার অর্থই নতুন কোনও অভিজ্ঞতা এবং অপরিচিত এলাকার সম্মুখীন হওয়া। গ্রন্থটি অবধারিতভাবে সম্প্রসারিত করতে পারে পাঠকের কবিতার ভুবন। তবে পাঠকের থাকতে হবে কাব্য পর্যটনের দুনির্বার আকাঙ্ক্ষা। বুঝতে হবে যে কোনও নতুন পথই দুর্গম; একা চলার কষ্ট ও আনন্দ উভয় সেখানে মেনে নিতে হবে।
মজিদ মাহমুদের ‘বল উপাখ্যান’র নাম কবিতার কিছুটা উদ্ধৃতি দিয়ে এ আলোচনা শুরু করলে বুঝতে সুবিধা হতে পারে
প্রথমে একটি গোল অথচ নিরাকার বলের মধ্য দিয়ে
গড়াতে গড়াতে আমি তোমার শরীর থেকে পৃথক হয়ে গেলাম
আর সেই থেকে তুমি
মরণকে একটি পিচ্ছিল জিহ্ববার মতো বিছিয়ে রেখে
আমাকে ধরার জন্য ছুটে চলেছ ….
আলোচ্য কবিতাটি মূলত নির্মম ও অসম্ভব খেলা। গ্রষ্টা এবং সৃষ্টির অনিবার্য নিয়তি। কেউ কাউকে অতিক্রম করতে পারছে না। কেবল ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে নতুন নতুন ফর্মের মধ্যে গ্রষ্টা এবং সৃষ্টি এগিয়ে চলছে – এ এক অভিনব খেলা। এ খেলা কখনও ফুরাবার নয়। এসব ধারণা যদিও প্রাচীন তবু মজিদ মাহমুদ অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে মহাসৃষ্টির সেই সব অভিজ্ঞতা কবিতাতে ব্যবহার করেছেন। মানবিক দৃষ্টিকোণের মধ্য দিয়ে মজিদ মাহমুদ সেই অনিঃশেষ যাত্রার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন-
এই যাত্রা একদিন শেষ এবং নিঃশেষ হয়ে
তোমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে
তুমি একমাত্র সন্তানের জননীর মতো
হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়বে আমার অপুষ্ট তনুর উপর
আমি বলবো, মাগো তোমার বাবা কে
তুমি বলবে, ‘তুই,
আমি তোর জননেন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে গড়াতে গড়াতে
বেরিয়ে এসে তোকেই করেছি ধারণ’ ..
মজিদ মাহমুদ এই কাব্যের মাধ্যমে সৃষ্টি জগতের, মহাবিশ্বের গভীরতর রহস্য অবলীলায় ফুটিয়ে তুলেছেন। ভাষাকে করে তুলেছেন কবির অনুগামী বাহন। গড়েছেন গ্রষ্টার পারসনিফিকেশন-সুফিবাদের গুঢ়প্রমূর্তি। গ্রষ্টা থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতর পরমাণু পর্যন্ত একই বৃত্তে ঘূর্ণায়মান, সম্ভবত মজিদ মাহমুদ এ কথাটিই বলতে চেয়েছেন।
আমরা যখন বাতাসের কতা ছিলাম
দুই অণু হাইড্রোজেন এবং এক অণু অম্লজান ছিলাম
তখন ব্রহ্মার নাকের মধ্যে ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত
ব্রহ্মা তখন আমাদের মতো ছিলেন
আমরা তখন ব্রহ্মার মতো ছিলাম
ব্রহ্মা কিছুকাল মাটি ছিলেন
আমরা কিছুদিন আকাশ ছিলাম
তারপর একটি মোরগের মত কুরুক্কুরু করে
আমরা মানুষের ঘুম ভাঙাতে থাকি এবং
একটি জবে করা শূকরের মাংস এবং রক্তের সঙ্গে
মানুষের রক্ত এবং মাংস মেশানোর কাজ
বহুকাল ধরে করে চলেছি
আমার কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, উপর্যুক্ত কবিতাটি বাংলা ভাষার যে কোনও স্বাতন্ত্র্য নির্ণায়ক কাব্যের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসতে পারে। স্বাতন্ত্রের দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, সুধীন্দ্রনাথের ‘অক্রেষ্ট্রা’ এবং বিষ্ণু দে’র‘ঘোড়সওয়ার’কবিতার সঙ্গে সমান বিবেচ্য।
এ গ্রন্থের দ্বিতীয় কবিতা ‘বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী’ এক ভয়াল অভিজ্ঞতার কবিতা। জানা এবং অজানার তীব্র সংঘাত। আমাদের জানা এবং অজানা অদূরকালের একটি কাহিনীকে অবলম্বন করে এ কবিতার জাইগোট গঠিত হলেও কাহিনীকে অতিক্রম করে কবিতাটি সর্বাঙ্গে একটি মিথে পরিণত হয়েছে। বর্তমান ও আদিম পৃথিবীর অপরিবর্তনীয় গল্প এই কবিতায় বিবৃত হয়েছে- যার ব্যাখ্যা প্রায় অসম্ভব। কবিতা থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক
এই ভয়াল রাতে অভয়ার কাছে যেতে হবে
অভয়া আমার মা; আর দামোদর
পৃথিবীর আদিমতম নদী
তরঙ্গনৃত্যের মধ্যে লুফে নিচ্ছে আমার শরীর
আমি শুশুকের মতো ভেসে উঠছি
ডুবে যাচ্ছি; নদীর সমার্থক হয়ে
মহিষ ধেয়ে আসছে আমার দিকে
আমার রক্তের মধ্যে দামোদর
আমার রক্তের মধ্যে মহিষ
মাগো তুই মহিষাসুর বধের মন্ত্র শেখা
আমি তোর কাছে যাবো
আমার অর্ধেকটা শরীর জলের কাছে রেখে
বাকি অর্ধেক তোকে দেব…
মজিদ মাহমুদের এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা একক স্বাতন্ত্র্য ও আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। ঠিক আলাদা আলাদা করে বিশ্লেষণ করা যাবে না। তবে সমগ্র কবিতার মধ্যে রয়েছে অবিচ্ছেদ্য অন্তর্নিহিত সুর। শুরু থেকে সমগ্র কবিতা একই ঐতিহ্যপথে এগিয়ে চলেছে। কবিতাগুলো যেমন আলাদা তেমন এ গ্রন্থের সবগুলো কবিতা মিলে একটি টোটাল বক্তব্য তৈরি করেছে। নাম কবিতাকে জীবনের সূত্রপাত বিবেচনা করলে শেষ কবিতা ‘পহেলা ভাদ্র’কে জীবনের অন্তিমযাত্রা বলা যেতে পারে। হয়তো কবি সে কথাই বিবৃতি করেছেন। তাছাড়া ‘পহেলা ভাদ্র’বাক্যবন্ধের অর্থও তাই- ‘অগস্ত্যযাত্রা’- অগস্ত্যমুনি এদিন আশ্রম ছেড়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেননি’ এদিনে কোনও আচারনিষ্ট হিন্দু ঘর থেকে বেরুন না। কিন্তু জীবনের অমোঘ নিয়মে কবি রাত ১২টা ৩৫ মিনিটে, বোয়িং সাতশ’ সাত বিমানে নিউজার্সির উদ্দেশ্যে পৃথিবীর মাটি ছেড়ে গেলেন। বর্ণনার মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবে বোঝার উপায় নেই, কবি এই কবিতায় মৃত্যুত্তর অনন্তযাত্রার নতুন একটি শব্দকোষ তৈরি করেছেন।
শূন্যতা আরো অসংখ্য শুন্যতায় বিভাজিত হয়ে
কেবল জিজ্ঞাস্যের পবন একটি বিশেষ
চিহ্নের মতো ফুসে উঠছে ভ্যকুয়াম
আর পৃথিবী একটি ক্ষুদ্রাকার বিন্দুর মতো
আমার দৃশ্যেন্দ্রিয় অতিক্রম করে যাচ্ছে….
এখানেও সেই প্রথম কবিতা ‘বল উপাখ্যান’র মতো অনন্ত অনিশেষযাত্রা। নারী পুরুষের পার্থক্যসূচক লিঙ্গরেখা অনুপস্থিত এখানে / তবু মিলনের প্রগাঢ় আকাঙ্খা / আমাদের শূন্যতায় টেনে নিচ্ছে। মজিদ মাহমুদের কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তার গতি এবং মহাকাব্যিক দ্যোতনা। আমাদের চেনা পৃথিবীর মধ্য থেকে একটি অচেনা পৃথিবীর গল্প। এবং প্রতিটি কবিতার মধ্যে ঢুকে পড়ছে অসংখ্য টুকরো গল্প। মিথের রাজ্য থেকে সে সব গল্প উঠে এসেছে নতুন গল্প সৃষ্টির প্রয়োজনে। মজিদ মাহমুদ মিথের কাহিনী কীভাবে নির্মাণ করেন তার একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে’ কবিতা থেকে-
কেনান কেনান বলে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে নুহু
প্রভু! পুত্র ডুবে যায়
অবাধ্য! তবু সে পুত্র আমার
মানুষের পাশে থেকে করেছে বিদ্রোহ
সবাই জানে তোমার নৌকায় সে লেখায়নি নাম
তাই বলে তার ধান ডুবে যাবে !
পর্বতের গোড়ালির মতো অহংকার নিয়ে জেগে আছে
একদিকে নবুয়ত অন্যদিকে পুত্রের মায়া
আমি পুত্রের মায়া চাই
আমার পুত্র আজ ডুবে যাচ্ছে গজবের জলে
সেই জলে আমি নৌকা চালাব
এক জোড়া মানুষের নমুনা নিয়ে !
মানবসন্তান
তোমার নতুন স্বর্গগড়ার স্বপ্নে আমার কোনো ভালোবাসা নেই
আমি মানুষের পিতা
মানুষ আমার ভাই
নবুয়তের লোভ দেখিও না
তোমার কিশতি থেকে নেমে যেতে একটুও দেরি হবে না
পুত্র ডুবে যাবে আর পিতা থাকবে প্রমোদতরীতে!
সেই ভিতুদের নবী আজ গতায়ু প্রভু
আমিও জলে যাব আমার পুত্রের সাথে
আমিও থৈ থৈ আগুন পানির মধ্যে হাবুডুবু খাব
জীবন মৃত্যুর স্বাদ মেখে নেব শরীরে
তোমার কিশতি প্রভু তুমিই সামলাও ….
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে কবিতাটি ধর্মের একটি প্রচলিত উপাখ্যানকে বাৎসল্য প্রেমের উপযোগী করে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এই আপাত সত্য মেনে নিলেও কবিতাটির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে সমকালীন রাজনীতির অসার কাহিনী।
মজিদ মাহমুদের বল উপাখ্যানে নারী পুরুষের চিরন্তন সম্পর্কগুলো প্রচলিত অর্থে বিবৃত হয়নি। প্রেম রিরংসা ক্রোধের কারণ ঘটেনি। শান্তস্নিগ্ধ বৌদ্ধিক জীবনের উৎকর্ষ ধরা পড়েছে পরম প্রজ্ঞায়। সম্ভবত মহামতি বুদ্ধ তার প্রিয় চরিত্র। গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জাতক কাহিনী, অহিংস এবং এক সজ্ঞাময় ঈশ্বরের উপস্থিতি। কবি সব কিছুই দেখেছেন মহাকালের চেতনার মধ্য দিয়ে। তবু বর্তমান জীবনাবসানের একটি কষ্টও টের পান কবি- কেননা খোলসের একটি মায়া রয়েছে সর্বত্র। ‘গাছজীবন’কবিতায় কবি বলেছেন-
সিদ্ধার্থের ইচ্ছার সন্ততি বোধিদ্রুম
সিদ্ধার্থ গাছ হয়েছিলেন, গাছের শাখাতে বসেছিল পাখি,
বল্কলের পেটে রেখেছিল হাত, সুজাতার হাত, পায়েসা
নির্বাণ দিয়েছিলেন তাঁকে, করাতকলের শব্দে আমি সেই
মুক্তির আহ্বান শুনি, মুক্তি কেবল দৃশ্যের রূপান্তর
তবু এই খোলসের মায়া আমাকে ব্যথিত করে তোলে …

মজিদ মাহমুদ তাঁর কবিতার মাধ্যমে আমাদের একটি ভিন্ন জগতের সঙ্গে পরিচিত করে তোলেন। যদিও সেই জীবনের মহাসত্য আমরা উপেক্ষা করতে পারি না কিন্তু মজিদ সেই সত্য আমাদের কাছে পরম দৃশ্যময়তার সঙ্গে আমাদের কাছে হাজির করেন। এক অপ্রত্যাশিত সত্য তিনি একের পর এক উদ্ভাসিত করে তোলেন। মৃত্যু ও মড়কের হাজার হাজার দুয়ার পেরিয়ে তিনি আমাদের এক নতুন জীবনের সঙ্গে পরিচিত করে তোলেন। গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই মহাগ্রন্থের মতো আলাদা আলাদাভাবে মহাজীবনের সারাৎসার, যা জীবনকে করে তোলে আরও অর্থবহ এবং বিশ্বসংস্থার অপরিহার্য শরিক। ‘জাতক’ কবিতার উদাহারণ দিয়ে এ আলোচনা শেষ করতে চাই –
তোমাদের তো আগেই বলেছি, তখন আমি ছিলাম একটি পুচকে খরগোশ
আমার কান দু’টি কেবলই খাড়া হয়ে উঠছিল, আর
পেছনের পা মাটিতে সমান্তরাল রেখে আমার মা
শেখাচ্ছিলেন ছুটে চলার কৌশল
খরগোশদের সামনের পা ছোট হয় বলে তখন আমার কী যে আক্ষেপ
মা বলতেন মানুষের তো দুটি পা-ই নেই
ওদের বাচ্চারা দুপায়েই দেখ কেমন লাফিয়ে চলে
তারপর একদিন একটি শেয়াল সত্যিই আমাকে
তাড়াতে তাড়াতে লোকালয়ের মধ্য দিয়ে
একটি বেগুন ক্ষেত পার করে দিল
আমার পায়ের যন্ত্রণা মাংসের স্বাদ
সে সব এখন আর মনে নেই
কেবল মনে আছে
ঘাসের নরম ডগা নিয়ে ফিরে আসতেন মা, আর
মাটির বিছানায় শুয়ে আমার সহোদর মায়ের উদোরে
আদর ঘষে খুঁটে খেত ঘাসের ডগা।



