ভালোবাসা যদি ভালোবাসা পেয়ে থাকে ….(মজিদ মাহমুদের কবিতায় প্রেমভাষ্য নিয়ে কিছু কথা)

সে ছিলো গুটি বাঁধার দিন, গুটি কাটার দিনও বটে। আসলে সব সম্পর্কই লার্ভা, শুককীট, মূককীট থেকে ডানা মেলে ক্রমে ওড়ার ক্লান্তি নিয়ে চালসে মেরে যায় একদিন। ধূপের গন্ধ দম বন্ধ করে দেয়। অনেক রঙের আসরে হঠাৎ করেই একটুকরো বর্ণহীন নির্জনতা চেয়ে বসি আমরা। যে প্রেমের হাতে ধরা দেব বলে আজীবন বসে রইলাম, সেই প্রেমই একদিন চরম উদাসীনতা শিখিয়ে মনকে গেরুয়া করে দিয়ে চলে গেল। হয়ই তো এমনটা প্রায়শই। সত্যিই বলুন হয় কি না? তখন আমরাও সুনীল গাঙ্গুলীর মতন করে মনে মনে বলে উঠি ‘আগে এই পৃথিবীটাকে জয় করে নেবার বাসনা ছিল/ এখন মনে হয় আমার এই পৃথিবীটা/ বিলিয়ে দিই সকলকে …’
কিন্তু সূর্য তো এত বৈরাগ্য নিয়ে ওঠেনি। আকাশ তো তখন ছিল লাল। উষা সবে ভূমিষ্ট হয়েছে তখন। কত স্বপ্ন তখনও আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরছে, কত বাস্তব তখনও চৌকাঠের ওপারে প্রতীক্ষমান। ভালোবাসা সেদিন পরম্পরাকে নষ্টালজিয়ায় মুড়ে রেখেছিল। ভোরের আলোয় সেদিন রাধার পদচ্ছাপ, ইভের প্রথম পদস্খলন। মাটির পৃথিবীতে ভালোবাসা কামনার ছাঁচে গড়া। নশ্বর জীবনে প্রেমের কালও ক্ষণস্থায়ী। আসলে প্রেম হল জন্মপূর্বের স্বপ্ন থেকে মৃত্যুপরের জিজ্ঞাসা অবধি বিছানো এক সেতু। মাঝখানটা কেবলই যাতায়াত, প্রতীক্ষা আর সন্ধানে সন্ধানে ঘেরা। আজকের এই আড্ডায় আসুন আমরা বসি মজিদ মাহমুদের কবিতায় ভালোবাসার কথা শুনবো বলে, বলবো বলে, ভাববো বলেও বটে। দেখতে পাব স্বপ্ন, স্বপ্নপ্রয়াণ ও স্বপ্নের পুনর্জন্মের এক ধারাবিবরণী কোথাও ধ্বনিত হচ্ছে মজিদের প্রেমের কবিতায়।
এক নারীর হৃদয়ের আশ্রয়ে কোনো এক পুরুষ তার রাজ্যপাটকে ফিরে-পেতে পারে। রাজা হয়ে যেতে পারে সে এই মর-পৃথিবীর সকল জীর্ণ বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। বলে উঠতে পারে
‘আমি যদিও জয় করেছি একটি গোটা দেশ
সেই দেশেতে একটি মাত্র বাড়ি
যে বাড়িটি আমার
যদিও সেটি অনেক কক্ষের বাড়ি
তার একটি মাত্র ঘর
আমি সেখানে বাস করি
সেই ঘরেতে একটি মাত্র খাট
সেই খাটেতে একটি মাত্র নারী
সেই তো আমার সকল রাজ্যপাট’
(সম্রাট।। ভালোবাসা পরভাষা)

হ্যাঁ, এমনটাই ঘটে কোথাও কোথাও, ঘটে কখনও কখনও। হৃদয় চায় হৃদয়ের আশ্বাস। কামনা এসে হাত রাখে নিগূঢ় লালে। সে লাল অগ্নির, নাকি আরম্ভের? প্রথম খুঁজে পাওয়া উত্তাপের সত্য সেই আগুনে আছে ঢাকা। অন্যের আরশিতে নিজেকে খুঁজে পাওয়া। মনের তটভূমিতে অচেনা পদচ্ছাপের শিহরণ। বালিতে বালিতে মিশে দুই উন্মুখ মনে চোরাগ্রোতের টান। পথ দীর্ঘ হয় ক্রমে।
প্রণয় থেকে পরিণামে জীবন এগিয়ে চলে। দর্শনে দর্শনে প্রাজ্ঞ হয় আমাদের জ্ঞান, প্রৌঢ় হয় আমাদের সতেজ চোখ। তবু যাকে বুকে পেয়েও মন ভরে না, যার হাত ধরেও অপেক্ষা ফুরোয় না, যাকে পদে পদে হারাবার ভয়, সেই ভালোবাসার শরীরী -অশরীরী অস্তিত্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে মজিদ বলেন
‘তুমি যাকে ভালোবেসে ছিলে কিংবা যে তোমাকে
সেই সব আলো ও পানির কণিকাগুলো এখন মৃত
অথবা পরিবর্তিত হয়ে ফিরে আসছে তোমারই কাছে

যদিও তোমার হৃদয় ভারাক্রান্ত সেইসব অভিঘাতে
তবু এ সব পুরনো পৃথিবীর গান
আমাদের শরীর একদিন ধূলিকতার মতো বাতাসে মিশে যাবে
আমাদের রসনা করবে না অভিযোগ
আজকের দিনের পরে সবই আমাদের অতীত।’
(স্বপ্নে ভালোবাসা খুঁজি না।। ভালোবাসা পরভাষা)

আসলে প্রেম মরে যায় তার বন্ধন দোষে, দাবিতে। নদী সরে গেলে যেমন ধু ধু চরা পড়ে থাকে, তেমনই কিছু স্মৃতি ফেরানো সম্পর্কের পলি নিয়ে পড়ে থাকে মনে;
নতুন বসতের অপেক্ষায়। সেই বসতে শাশ্বত কেবল এই মন, এই প্রেম-অন্বেষণ। পাওয়া, আবার হারাবার আয়োজন। চিরন্তন এক আকাঙ্খা কেবল অবয়ব বদলে ফিরে ফিরে আসে। আসলে অধ্যায়ে অধ্যায়ে বেড়ে চলে আমাদের প্রেমের গল্পটাই। কবি লেখেন – ‘তোমাকে আমি তুমি বলেই জানি / তুমি এক, কিন্তু বিচিত্রগামিনী / তোমাকে মসজিদে দেখেছিল যারা / মন্দিরে তারা চিনতে পারেনি।’
(বহুগামী।। অণুবিশ্বের কবিতা)

কত জীবন পার হয়? এক জীবনই ফোরায় বুঝি গল্পটা? হয়তো ফোরায় না। তাই নোঙর তোলা আর নোঙর ফেলার খেলাটাও চলতেই থাকে। অচেনায় অভিযানের রোমাঞ্চ ফুরিয়ে যায় জানার গতানুগতিকতায়। সব সম্পর্কই মধ্যাহ্ন পার হয়ে বিকেলের কোলে ঢলে পড়ে। দেওয়া-কথা আড়ালে আড়ালে হাত বদলে হারিয়ে যায়, বহু বিচ্যুতি এসে বাসা বাঁধে দিন-প্রতিদিনের ফাঁক ফোকরে। একনিষ্ঠ হয়ে ওঠা, হয়ে ওঠে না আর কোনোদিনই। মনের খবর পেতে কেবলই এ দ্বারে, ও-দ্বারে ফেরা। একদিন আমরা দেখি আমাদের সেই কল্পনার মানচিত্র থেকে সরে এসে পথ তার আপন খেয়ালে পায়ে পায়ে কবেই গন্ডী ভেঙে, সীমান্ত টপকে নিরুদ্দেশ হয়েছে। আপন মনেই তখন শুধু বলা ‘আমরা একসঙ্গে ছিলাম/একসঙ্গে করেছি জন্মদান/ আমাদের প্রতীজ্ঞা ছিল/ নিজেদের জানাবো অকপট/ আজ যাবার সময় হলো/ ভাবছি অহেতুক/ আমাদের প্রতীজ্ঞা কপট।’
(কপট।। সিংহ ও গর্দভের কবিতা)

বড্ড পাপ লেগে যায় বাঁচার গায়ে। পুণ্যকে ছুঁড়ে ফেলে পাপকে আপন করে আঁকড়ে ধরতে চায় কেউ। ব্যাক ক্যালকুলেশনে বাঁচার সূত্রটাকে খুঁজে পেতে চায়। যে জীবন ষড় রিপুর তাড়নায় কাঁপে, যে জীবন পঞ্চেন্দ্রিয়ের উৎসবে মাতে, জগতের আনন্দযজ্ঞে যার নিত্য নিমন্ত্রণ-তাকে কি সন্ন্যাস মানায়? এই বিপুল আয়োজন যে তবে ব্যর্থ হবে, মিথ্যে হয়ে যাবে। মানুষের কামনার কর্ষণে জন্ম নিক আগামীর দেবশিশু। কবি বলেন-
‘যিশু বলেছিলেন মিলনে পাপ/ ত্যাগ করো কামার্ত বাসনা/ তিনিও তো বিদ্ধ হয়েছিলেন আদমের পাপে/ পিতার অপরাধে আমাকেও ক্রুশকাঠ দাও/ আমার পুত্র থাকুক ঈশ্বরের হত্যার ওপার।
(পাপ।। সিংহ ও গর্দভের কবিতা) এভাবেই আগামীকে আমরা চিরটাকাল তুলে রাখি কোনো এক পুণ্যময় সময়ের আশায়। তবু কোনও সত্যযুগ সত্যি সত্যিই এসে পৌঁছয় না। অস্থিরতার ব্যাসার্ধ ছুঁয়ে অনিশ্চিত বাঁচার বৃত্ত ক্রমেই পরিধি বাড়াতে থাকে। এক্সপায়ারি ডেট মেনে সম্পর্কও ফোরায় নির্দিষ্ট দিনে। ভালোবাসার একঘেয়েমি মনকে অলস করে। ব্যথা খুঁজি আমরা। দুঃখ চাই। ‘চোখের জলে দুখের শোভা’ – গাইতে গাইতে দেখি গ্লেসিয়ার গলছে, ভার নেমে যাচ্ছে বুক উজাড় করে। ক্ষণিকের বলে, অতিথি বলেই না সে এত আদরের, এত আপন, এমন সুখে মোড়া। শেষের কান্নাটাও যে বুকে আঘাত করে জানিয়ে যায়, মন বলে একটা কিছু এখনও স্পন্দিত হয় হৃদয়ের তলে, এখনও ব্যাকুল হয় সে বর্ষায়, এখনও দহন জাগে। হারানোর মধ্য দিয়ে সম্পর্ক আসলে শেষ হয় না। সে আকাশের মত অনন্ত হয়ে যায়। দিগন্তের মতন হাতের নাগালের বাইরে চলে যায় কেবল। শুধু মাঝে মাঝে কর্মব্যস্ত দিনের ফাঁকে আমাদের কখনও সখনও চোখ চলে যায় তার দিকে। দেখি অসমাপ্ত গল্পটা রামধনুর মতন হালকা রঙে, আলগোছে আকাশের গায়ে টাঙানো আছে। মজিদ লেখেন-
‘আমি ভালোবাসায় ভালো নই
কিছু পাপের মাধ্যমে প্রেমে বিশ্বাসঘাতকতা করি
কারণ প্রেমের পরিসমাপ্তিতে চাই করুণ দুঃখ
মুহূর্তে হয়তো হয়েছিল শুরু
শেষ বিদায়ের তিক্ততা
এটাই হয়তো আমার ভালোবাসার জয়।’
(আমি ভালোবাসায় ভালো নই।। ভালোবাসা পরভাষা)

আসলে মথুরার পথ কোনোদিনই আর বৃন্দাবনে ফেরে না। পদাবলীতে পদাবলীতে কেবল বিরহ জমা হতে থাকে। শূন্যতাকে বুক জুড়ে অনুভব করতে ভালো লাগে কখনও কখনও। রাজা সাজার পালা ফুরোল মাঝে মাঝে হাসিতে ভরা আকাশের তলে ভিখিরি সেজে রঙ্গ করতে সাধ জাগে। পরকীয়া চেয়ে পথ প্রায়শই চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে চলে যায়, তলে গেছে বহুবার … চিরকাল ধরে। যে পেয়ালা সুধা ভরে দেয়, সেই সাকীই আবার গরলও দেয় ধরে। ফুরিয়ে ফেলার, হারিয়ে ফেলার নেশায় মাতে মন। বাউন্ডুলে ধূলোয় থাকে না সঞ্চয়ের কোনো ক্লান্তি। দুষ্মন্তের মতন কোনও এক বিস্মৃতি নিয়ে আমরাও শকুন্তলার তপোবন ছাড়ি। ব্যথায় করুণ হওয়া কোনও দৃষ্টির আলোতে হয়ত নিজেদের চলার পথটাকেই খুঁজি, খুঁজি সার্থকতা। অমন একটুকরো ব্যথা পেলে বুঝি অর্থময় হয়ে ওঠে আকাশতলের এইসব দিনরাত্রি, অস্তিত্ব আমাদের। আসলে প্রতিটি গোলাপই জন্মায় প্রজাপতির জন্য। আর প্রতিটি শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয় ফুলের আলিঙ্গন পাওয়ার আকাঙ্খায়। আর এসব বুঝতে বুঝতেই ফেলে আসা আটচালাটার দিকে তাকিয়ে মাঠ পেরোনো হাটুরে শুধু ভাবে-
‘আজ যখন ভাবি তোমাকে নিয়ে শেষ লেখাটি লিখব; তখন
ঠিক বুঝতে পারি না; ভাবি কোথায় শেষ আর কোথায় শুরু
প্রতিটি কবিতার শেষে থাকে একটি পরিত্যক্ত চরণের ব্যথা।’
(তার জন্য শেষ কবিতা।। ভালোবাসা পরভাষা)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *