অল্প কয়েকদিন আগে ‘কারুভাষ’ সম্পাদক মানসী কীর্তনীয়া হাতে তুলে দিলেন মজিদ মাহমুদের ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’। মজিদের কোন লেখা এর আগে পড়িনি। বন্ধু রফিকউল্লাহ খান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের তিন দশকের কবিতা’ সংকলন গ্রন্থের তাঁর তিনটি কবিতা পড়েছিলাম (‘মাতাল ডোম’, ‘অভিজ্ঞান’, ‘গাছ জীবন’)। ফলে, মজিদের নির্বাচিত প্রবন্ধটি পড়বার আগে একটু প্রস্তুতি নিতে হয়। তার কারণ, মজিদ মূলতঃ কবি। আর কবিদের গদ্য স্বাভাবিক কারণেই স্বয়ংস্বতন্ত্র, তাদের স্বরায়নে কবিতার উদ্ভাস জড়িয়ে থাকে। কিন্তু ভূমিকায় তাঁর উচ্চারণ, তাঁর প্রাতিস্বীকতাকে একটি অবয়ব প্রদান করে : ‘সাহিত্যকে আমি নিছক সাহিত্য হিসেবে দেখতে নারাজ। সাহিত্যের নন্দনতত্ত্ব বিচারের যে মান্য মাপকাঠি রয়েছে, আমার কাছে তার মূল্য প্রত্নতত্ত্বের মতো। সাহিত্যকে এখন আমরা কেবল আনন্দ তৈরির উপাদান হিসেবে দেখতে পারি না, ছন্দ শব্দের মধ্যে বেঁধে রাখতে পারি না। এমনকি কলা বিজ্ঞানের শাখা থেকে সাহিত্যকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে। যে অর্থে সামাজিক বিজ্ঞানের শাখাগুলো বিকশিত হচ্ছে সেই অর্থে সাহিত্য জ্ঞানকান্ডের সকল শাখার বর্ণনামূলক ও ঐতিহাসিক রূপ বর্ণনায় প্রাথমিক উৎস হিসেবে স্বীকৃত। মানুষ এমন কোনও আচরণ করে না, যা একক এবং সংঘবদ্ধ মানুষের সম্পর্কের বাইরে থেকে সংঘটিত হয়, অর্থাৎ সাহিত্য একটি আন্তঃসম্পর্কীয় বিষয় হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত। গদ্য রচনার ক্ষেত্রে আমি এসব প্রাধান্য দিতে সচেষ্ট থেকেছি।’ – প্রবন্ধকার মজিদ মাহমুদের এই প্রতিন্যাসের প্রকাশ কীভাবে এই গ্রন্থে প্রতিভাত হয়েছে সে প্রসঙ্গে পরে আলোচনা করা যাবে। তার আগে ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ সংকলনের বিষয় বৈচিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। শিরোনামের দিক থেকে ‘কবিতা’,‘রবীন্দ্রনাথ’,‘নজরুল’, ‘জীবনানন্দ দাশ’,‘কবি ও কবিতা” একটি ভাবনাবৃত্তের মধ্যে, ‘কথা সাহিত্য ও কথাশিল্পী’, ‘চিন্তা ও চিন্তক’ দ্বিতীয় ভাবনাবৃত্ত, এছাড়া তৃতীয় ভাবনাবৃত্তের ভিতরে আছে বিবিধ ভাবনা বিষয়ে রচনা ‘গ্রন্থ ও যোগাযোগ’, ‘ভাষা’, ‘বুদ্ধিজীবি ও সুশীল সমাজ’, ‘বিকল্প ভাবনা’,‘সাহিত্য সমাজ অর্থনীতি’। এত বিবিধ ভাবনার বিন্যাসে গ্রথিত এই সংকলনের রচনাগুলোর নির্দিষ্ট কোন অভিমুখ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
প্রথম ভাবনাবৃত্তটি এই গ্রন্থের অনেকটা পরিসর জুড়ে আছে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, ১৯৮৫ সালে তাঁর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩২। এই তথ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এক একটি গ্রন্থ রচিত হয়েছে অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে এবং এর একটি কারণ মজিদ মাহমুদ পেশায় সাংবাদিক। পেশাগত কারণেই তাঁকে অবিশ্রামভাবে নানা বিষয়ে লিখতে হয় নানা উপলক্ষে। তাই তার রচনাগুলিতে লক্ষ্য করা যায় কবির প্রজ্ঞা আর সাংবাদিক মননের এক আশ্চর্য মিশ্রন। এই গ্রন্থটির মূল বৈশিষ্ট্য, আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায়, সেটাই। ‘কবিতা নিয়ে কথকতা রচনায় তিনি বলেন :
‘মহাভারতের মহাবীর অর্জুন, দেবতারা একদিন যাকে দিয়ে অসাধ্য সাধন করেছিলেন কিন্তু জীবন সায়াহ্নে দেবতারা কেড়ে নিল তার গান্ডীব; দিনে দিনে যেসব অর্জন একদিন অনিবার্য হয়ে পড়ে সেসবই ধূলার ধন; ব্যক্তি মানুষের কাছে যার কোন মূল্য নেই। যুধিষ্ঠিরের মতো নিষ্পৃত জীবনই কেবল আত্মবিকৃতির হাত থেকে রেহাই পেতে পারে। পাঁচপতির মহা সতী স্ত্রীও রেহাই পায়নি। কেননা পাপ তাকেও স্পর্শ করেছিল। কিন্তু মানুষের কি করার আছে ? অর্জুন তো মহাভারতের হত্যার রাজনীতি সমর্থন করতে চায়নি। কিন্তু ভগবানের রাষ্ট্রে তারা তো আগেই খুন হয়ে আছে। অর্জুন কেবল নিমিত্ত মাত্র। তাহলে প্রশ্ন গুজরাটে নরেন্দ্র মোদিও কি একই গান্ডীব ধরে আছে? জীবনানন্দ দাশ অবসরের গান কবিতায় বলেছিলেন, ‘যোদ্ধা জয়ী বিজয়ীর পাঁচ ফুট জমিনের কাছে, পাশাপাশি জিতিয়া রয়েছে আজ তাদের খুনির অট্টহাসি।’
ইচ্ছে করেই এই দীর্ঘ উদ্ধৃতিটি দিতে হল মজিদ মাহমুদের ভাবনা প্রণালীর উদাহরণ হিসেবে। রচনার যে প্রকরণ তিনি ব্যবহার করেছেন সেটিতে স্পষ্টতই সাংবাদিক -সুলভ মননের প্রকাশ ঘটেছে। তা না হলে মহাভারতের অর্জুনের পাশে গুজরাটের নরেন্দ্র মোদীর উপমা কোন লেখকের ভাবনায় আসা সম্ভব নয়। আবার কোন কোন রচনা তাঁর কবিস্বভাবের আত্মকথনের বিবরণী হয়ে ওঠে :
‘মানুষ এমন একটি প্রাণী যে পুরোপুরি বাস্তবের জগতে বসবাস করতে পারে না। বাস্তবতার জগৎ কল্পনার আবরণে মোড়ানো না হলে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। মানুষের মধ্যে তখন হনন ও আত্মহননের প্রবণতা ভর করে। ফলে মানুষ নিজেকে সর্বদা একটি অবিনশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। আর এই অবিনশ্বরতা-ই কবিতা ও শিল্প বোধ।’ (কবিতার দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে)
আবার অন্য আর একটি কবিতা-বিষয়ক রচনায় তাঁর উচ্চারণের ভিতরে জল বিভাজিকার মতো থেকে যায় কবির প্রজ্ঞা আর সাংবাদিকের মন : ‘আমরা আজ সামাজিক কিংবা সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কোন আন্দোলনের সঙ্গেই জড়িত নই। কেবল পিঠ বাঁচিয়ে পেট বাঁচানোর রাজনীতিতে ব্যস্ত আছি। ইঁদুর দৌড়ের অবসান না হলে এর চেয়ে ভালো কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও আপাতত দেখছি না। আজ যেমন ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, আজ পাঠক বলেও তেমন অবশিষ্ট নেই। যারা কবিতা নিয়ে কথা বলে তারা কেউ কবিতার পাঠক নয়, রাজনৈতিক দলের পান্ডা। কবিতার সৌন্দরে্যর চেয়ে ক্ষমতা আর মালের সৌন্দরে্যর প্রতি তাদের দৃষ্টি বেশি’ (ভবিষ্যতের কবিতা)। একেবারে শেষ লাইনের উচ্চারণ থেকে তার মনঃ প্রতিন্যাসের স্বরূপটি চিহ্নিত করা যায়। মজিদের বেশিরভাগ রচনাই মনে হয় শ্রোতা বা পাঠকের দিকে তাকিয়ে বলা। স্বাভাবিক কারণেই তাঁর উচ্চারণ আত্মগত নয়।
উপরের উদ্ধৃত অংশগুলির মধ্যে পাঠক হিসেবে আমাদের যে অনুভব সেটি উপস্থাপিত করার চেষ্টা করেছি। লেখার শুরুতে প্রথম যে ভাবনাবৃত্তটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার বড় অংশ জুড়ে আছেন কবি নজরুল ইসলাম। প্রকৃত প্রস্তাবে, নজরুল বিষয়ে তাঁর পাঠের পরিধিও যে বিস্তৃত তাও অনুভব করা যায়। কিন্তু অনেক সময়ই তাঁর প্রকাশভঙ্গি আমাদের অনুভবে কিছু সঙ্কট সৃষ্টি করে। ‘নজরুল সাহিত্যে তারুণ্য’ প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘এমনকি তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আঙ্গিকে ও বিষয়-সৌন্দরে্য বাংলা কবিতায় মনুমেন্ট হলেও নজরুলের ব্যক্তিগত বিদ্রোহ পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী ছিল না। তার প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, মার্কসবাদ কিংবা তৎকালীন রাজনীতি বিষয়ক অল্পবিস্তর জ্ঞানগম্যি সত্ত্বেও তিনি নিজেকে একনিষ্ঠ পার্টি সদস্যরূপে হাজির করেন নি।
নজরুল-বিষয়ক আরও একটি নিবন্ধ ‘নজরুল : অভিশাপ ও আশীর্বাদ’ প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি লিখছেন, ‘নজরুলের কোন গ্রন্থ আর এখন বাজেয়াপ্তের তালিকায় নেই; কিংবা নজরুলকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করবার সাহস কোন পক্ষ দেখায় বলে মনে হয় না। তাহলে ফলাফল দাঁড়ায় এমন, নজরুল-সাহিত্য বর্তমানে একটি নির্বিষ পৌরুষহীনতায় আক্রান্ত যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। এমন কি তরুণ প্রজন্ম অন্তত তরুণ কবিদেরও উজ্জীবিত করার ক্ষমতা তাঁর সাহিত্য হারিয়ে ফেলেছে। কিংবা নজরুল-সাহিত্যে যাচিত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার চূড়ান্ত প্রাপ্তি লাভ করেছে, যার বিরুদ্ধে কখনো আর কলম ধরতে হবে না’। মনে পড়ছে মুস্তাফা নূরউল ইসলাম তাঁর ‘সময়ের মুখ তাহাদের কথা’ গ্রন্থের ‘অগ্রপথিক ডাক দেয়’ নিবন্ধে নজরুল ইসলাম বিষয়ে তাঁর কিছু আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন : ‘সরকারী ও অন্য অন্য প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের কথা থাক, হেতুটা কোথায় যে, এই প্রজন্মের জন্যে সমকালীন অনিবার্যতায় নজরুল? সুষ্পষ্ট জানতে চাই। ‘নজরুল-সত্যের সন্ধান চাই।’ (৩০ আগস্ট, ১৯৯৫)।
মজিদের এই উক্তির মধ্যেও অবশ্যই বাংলাদেশের সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতির প্রেক্ষিত জড়িয়ে আছে। তবুও আমাদের পক্ষে তাঁর এই অনুভবের সহযাত্রী হওয়া কষ্টকর। ‘নজরুল -জীবনানন্দ মানস সাযুজ্য’ তাঁর একটি শ্রমশীল সুবিন্যস্ত রচনা। কিন্তু সেখানেও তাঁর প্রকাশভঙ্গি আমাদের বিস্মিত করে: ‘আমরা যে জীবনানন্দকে চিনি ‘ঝরাপানকে’ সেই জীবনানন্দকে পাওয়া যাবে না ঠিক কিন্তু যে দ্রোহের আগুনে সেঁকে পরবর্তীকালে তিনি যে রান্না প্রস্তুত করেছেন তার প্রথম পর্যায়ের রান্নাপর্বের মধ্যেই যে সত্য নিহিত রয়েছে।’ এই প্রবন্ধে নজরুলের ‘বেলাশেষে’ এবং জীবনানন্দের ‘নির্জন স্বাক্ষর’ কবিতা দুটি পাশাপাশি বিন্যস্ত করে যে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক তা খুব স্পষ্ট নয়। বিশেষতঃ নজরুলও জীবনানন্দের স্বরায়নের স্বাতন্ত্রের গোপন সূত্রটি লক্ষণীয়। অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত একটি রচনায় মন্তব্য করেছিলেন ‘নজরুলের বাচংযম তাঁর যৌবন বিদায়ী গীতিগুচ্ছে, পদ্যবন্ধে নয়। এই পদ্যভাষণগুলি মহতী জনসভার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত হলেও গানগুলি একান্তভাবেই স্বগতস্বনন। একযোগে ইমেজপূজারী ও নিহিতার্থনিষ্ঠ
জীবনানন্দের কবিতা ঐ স্বগতস্বনন বা অন্তর্লীন মনোকথনে আশ্রিত’ (বাংলা কবিতা, আধুনিকতা)। জীবনানন্দ প্রসঙ্গে লেখকের একটি পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যময়। ‘জীবনানন্দ দাশ: জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা’ প্রবন্ধে ‘রূপসী বাংলা’ কেন জীবনানন্দের মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে সে প্রসঙ্গে তিনি তিনটি সম্ভাব্য সূত্রের উপস্থাপন করেছেন। তার মধ্যে তৃতীয় সূত্রটি হল : ‘কবি এমন একটা সময়ের বাংলার রূপকল্প অঙ্কন করেছেন, যখন এ দেশে মুসলমান আসেনি, ইংরেজ আসেনি এই বাংলা কেবল হিন্দুর। এই চেতনা দেশকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদী চেতনার বিরুদ্ধে। (জওহরলাল নেহরু ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘এক জাতীয়তার চারিদিকে জমে ওঠে প্রীতির অনুভূতি, নানারূপ জাতীয় প্রথা বা সংস্কার এবং একই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সমস্ত জাতির জীবনকে একসূত্রে গাঁথতে চায়’)। এক জাতীয়তার ক্ষেত্রে নিষ্পাপ বইটিও প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ছিল।’ লেখকের এই বিশ্লেষণের সঙ্গে আমাদের একমত হবার উপায় নেই এইজন্য যে, পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলাদেশে জীবনানন্দ-চর্চা আমাদের এই ভাবনায় প্রাণিত করতে পারে নি। জীবনানন্দ বিষয়ে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ করেছেন তিনি : জীবনানন্দ মৃত্যুর বহু বছর পরেও উপেক্ষিত ছিলেন, তার প্রমাণ মিলবে ১৯৭২ সালে ভারতে আকাদেমির আয়োজনে বাঙালি কবিদের একটি হিন্দী সংস্করণে। জীবনানন্দের দুই দশক পরের কবিরা যেখানে ঠাঁই পেয়েছিলেন কিন্তু জীবনানন্দ ছাড়া। এমনকি কবিগুরুর সবার প্রতি অবারিত আশীর্বাদও জীবনানন্দের জন্য অবিমিশ্র ছিল না। একটু বিরক্ত হয়েই যেন বলেছিলেন – ‘তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নাই। কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি করো কেন বুঝতে পারি নে’ এই দু’টি অভিযোগ সম্পর্কে জানাই, পশ্চিমবাংলায় দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশের আব্দুল মান্নান সৈয়দ; কারো গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা নেই। এমনকি বাংলাদেশের বাংলা একাডেমির জীবনানন্দ দাশের জন্মশতবর্ষ প্রকাশিত ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় (১৯৯৯) এমন তথ্য সমাবেশ দেখিনি।
ভারতের সাহিত্য অকাদেমির কলকাতাস্থিত গ্রন্থাগারে অনুসন্ধান করেও এমন তথ্য আমি পাইনি। মজিদ এই বিষয়ে বিশদে জানালে কৃতজ্ঞ থাকবো। দ্বিতীয়ত জীবনানন্দকে লেখা রবীন্দ্রনাথের যে চিঠির উদ্ধৃতি দিয়েছেন লেখক, তার তারিখ ২২ অগ্রহায়ণ ১৩২২। এ বিষয়ে বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ দাশ : বিকাশ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা আব্দুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত জীবনানন্দ গ্রন্থের (চারিত্র, ঢাকা, ১৯৮৪) ১৮৩ পৃষ্ঠায় জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের তিনটি উদ্ধৃতি আছে। ১২ মার্চ ১৯৩৭ রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দের ‘ধূসর পান্ডুলিপি’ পড়ে লিখছেন, ‘তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে’ (১২ মার্চ ১৯৩৭)। কবি বুদ্ধদেব বসুকে লেখা একটি চিঠিতে জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে’ (৩ অক্টোবর, ১৯৩৫)। এই তিনটি চিঠিরই পূর্ণাঙ্গ রূপ দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ দাশ : বিকাশ প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে আছে। তাই, লেখকের এই ধরনের কোন খন্ডিত মন্তব্য সাহিত্য চর্চার আভ্যন্তর অভিজ্ঞানকে ধ্বস্ত করে। ‘জীবনানন্দ দাশ : প্রতিবাদ ও মানববন্ধন প্রবন্ধের এক জায়গায় বিষ্ণু দে সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘বিষ্ণু দে বলেছিলেন – ‘রবীন্দ্র-ব্যবসা শিখিনি’। কিন্তু পাঠক জানেন রবীন্দ্র-ব্যবসা বলে যদি বাংলা সাহিত্যে কিছু থাকে তার একমাত্র এজেন্সি ছিল বিষ্ণু দে।’ বিষ্ণু দে সম্পর্কে এই ধরনের অশ্রদ্ধেয় ও অসতর্ক মূল্যায়ন কিভাবে তিনি করতে পারলেন ভেবে বিস্মিত হচ্ছি। আর ‘রবীন্দ্র-ব্যবসা শিখিনি’ এই উক্তি বিষ্ণু দে কোথায় করেছেন? ‘নাম রেখেছি কোমাল গান্ধার’ কাব্যগ্রন্থের ‘২৫ শে বৈশাখ’কবিতার লাইনঃ ‘রবীন্দ্র-ব্যবসা নয়, উত্তরাধিকার ভেঙে ভেঙে/ চিরস্থায়ী জটাজালে জাহ্নবীকে বাঁধি না;’ – কিন্তু রবীন্দ্র-ব্যবসা শিখিনি এমন উক্তির কথা জানা নেই।দ্বিতীয়ত ‘রবীন্দ্র-ব্যবসা বলে যদি বাংলা সাহিত্যে কিছু থাকে তার একমাত্র এজেন্সি ছিল বিষ্ণু দে’। ভয়ে ভয়ে বলি, বিষ্ণু দে’র ‘রবীন্দ্রনাথ ও শিল্প সাহিত্যে আধুনিকতার সমস্যা’ গ্রন্থটি লেখককে আরো একবার পড়তে অনুরোধ করবো। অথচ বাংলাদেশের বেগম আক্তার কামালের ‘বিষ্ণু দে-র কাব্য : পুরাণ প্রসঙ্গ’ (১৯৭৭) গবেষণাগ্রন্থটি তো বাংলাদেশ থেকেই প্রকাশিত। আর সে গ্রন্থের মুগ্ধ পাঠক তো আমরাও।
আলোচনার শুরুতে মজিদ মাহমুদের প্রবন্ধের যে তিনটি ভাবনাবৃত্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে দ্বিতীয় ভাবনাবৃত্তের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রচনা ‘কথা সাহিত্য ও কথা শিল্পী’,‘চিন্তা ও চিন্তক’। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘আবু সয়ীদ আইয়ুবের চিন্তাজগৎ ’আর ‘বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ’। আবু সয়ীদ বিষয়ে কোন গভীর মননশীল চিন্তার নয়, বরঞ্চ একটি সামগ্রিক পরিচায়িকা রচনা করেছেন তিনি। যদিও আবু সয়ীদ আইয়ুব ‘আধুনিক কবিতা সংকলনে’ ফররুখ আহমেদের কবিতা অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য তিনি লিখেছেন, ‘তার মতো মনীষী অনেক ক্ষেত্রে দ্বিধা অতিক্রম করতে পারেন নি। আইয়ুবের বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহের কথা মনে রেখে তাঁকে ‘বিশ্বভারতী কোয়ার্টারলি’ পত্রিকার আবু সয়ীদ আইয়ুব বিশেষ সংখ্যাটি (১৯৭৫-৭৬) দেখবার অনুরোধ রইলো। বুদ্ধদেব বসু বিষয়ে তাঁর মূল্যায়ন ‘বুদ্ধদেব ঔপন্যাসিক – সে সত্য আজ তিরোহিত; বুদ্ধদেব বসু কবি – সে কেবল স্মৃতি।’ আসলে এই ধরনের মন্তব্য করার নেপথ্যে থেকে যায় লেখকের সাংবাদিক সত্তা। যে কোন কবির সংবেদী ভাবনায় ‘বুদ্ধদেব বসুর কবি- সে কেবল স্মৃতি’ এই মূল্যায়ন করা দুরূহ। বিশেষতঃ তাঁর কাব্যনাট্যগুলি আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। এখানেও, আবারও বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত দু’টি গবেষণা গ্রন্থের উল্লেখ করবো: মাহবুব সাদিকের ‘বুদ্ধদেব বসুর কবিতা: বিষয় ও প্রকরণ’ (১৯৯১) এবং বিশ্বজিৎ ঘোষের ‘বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসে নৈঃসঙ্গ চেতনার রূপায়ণ’(১৯৯৭)। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশের কবি-ভাবুকদের প্রবন্ধ যতটুকু পড়বার সুযোগ হয়েছে মজিদ মাহমুদের গ্রন্থটি তার থেকে ভিন্ন চরিত্রের এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই গ্রন্থটি পাঠ করার পর বেশ কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সাহিত্য বিচারের সংবেদী অভিমুখ সংশয়ী হয়ে ওঠে।
আমাদের কাছে এ-গ্রন্থের বড়ো প্রাপ্তি রশীদ করিম, আবু ইসহাক, শওকত ওসমান, শহীদুল জহির, হুমায়ুন আহমেদ বিষয়ে রচনাগুলি। আর ‘রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যচিন্তা ও পারস্য ভ্রমণ’ রচনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। মজিদ মাহমুদের এতগুলি প্রবন্ধ আমাদের মননের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে থাকা উপাদানগুলিকে পুনর্নব ক’রে তুলতে পেরেছে। এই গ্রন্থের কেন্দ্রীয় বিভাব হয়তো তাই।



