১
‘কথার ঘর’ কবি মজিদ মাহমুদের চতুর্থ উপন্যাস। উপন্যাসটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ না হলেও খোলা কাগজ ঈদ সংখ্যা (২০২৬) এই উপন্যাসটি পাঠের সুযোগ করে দেয়। এই উপন্যাসে পাত্র-পাত্রীর সম্পর্ক মূলত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। উপন্যাসটিতে দেখা যায়—নতুন ক্লাস, নতুন শিক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরিচয়পর্ব, সহাস্য সংলাপ, সাহিত্য ও শিল্প সম্পর্কিত বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নোত্তরের মধ্য দিয়ে মূলত একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হয়, সূচনা হয় নতুন অভিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতার। দিনের ক্লাস শেষে আনিস রেজা বিকেলে বাংলো বারান্দায় এসে চুপচাপ বসে থাকে। চারদিকে সুনশান নীরবতা। বাগানের ভেতর হালকা একটু বাতাস ব্যতীত কাছে কিংবা দূরে কোথাও একটি কাকপক্ষি পর্যন্তও নেই। তবুও আনিস একটি ডাক শুনতে পায়, একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। ঐ কণ্ঠস্বর— হাসলে যার মুখে টোল পড়ে, অতোটা ফর্সা না হলেও যার দিকে চোখ আটকে যায়; যার চটুলতা আছে, যে কথার পর কথা বলতে পারে। ধারের কাছে কোথাও কেউ নেই।তবুও আনিস এই পুরোনো পোড়ো বাংলোয় নিজেকে আর একা মনে করে না। মনে হয়, কোথাও কেউ একজন আছে। কেউ একজন তার হয়ে তারই কথা ভাবছে। কেউ একজন এই বাংলোয় ঢুকে পড়ছে, ঢুকে পড়েছে আনিসের মনোজগতের অন্দরমহলে। আনিসের সাধ্য নেই যে, তাকে আর ঠেকিয়ে রাখে, দূরে রাখে। আনিসের মানসিক অবস্থা এমন হয় যে, রাতে ঘুমোনোর সময় পাতা নড়াচড়ার মধ্যেও আনিস হাঁটার শব্দ শুনতে পায়, শুনতে পায় তার সেই ভুবনভুলানো হাসি। মনে হয়—কেউ একজন হেঁটে হেঁটে তার পোড়ো বাংলার দিকে এগিয়ে আসছে, কেউ একজন জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কপালকুণ্ডুলার মতো পলকহীন দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে আর বলছে—পথিক তুমি পথ হারিয়েছো। বাস্তবিকই আনিস আর নিজের মধ্যে থাকে না। আনিস নিজেই নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
২
আবার ওদিকে প্রথমদিনে, প্রথম ক্লাসে, প্রথম দর্শনেই ফারিয়ার বুকের ভেতর প্রেমের পায়রা বাকবাকুম বাকবাকুম সুরে ডেকে উঠতে চায়। কিন্তু ফারিয়া চঞ্চল হলেও বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে। অতো সহজে, অতো সরবে নিজেকে সে ধরা দিতে চায় না। অতি যত্নে, অতি সন্তর্পণে ফারিয়া ঐ পায়রাটির মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করে রাখে। এক পড়ন্ত বিকেলে ফারিয়া আনিসের বাংলোয় গিয়ে হাজির হয়। বনলতাসেনের মতো দুজন পরষ্পর পরষ্পরের মুখোমুখি বসে কিছুটা সময় কাটায়; সাহিত্যশিল্প নিয়ে কিছুটা আলাপসালাপও করে। প্রস্থানের আগে ফারিয়া বাংলোর ভেতরের নীরবতা ও নিঃসঙ্গতার দিকে ইঙ্গিত করে বলে—‘স্যার, আপনি ভয় পান না—এটাই বড় ভয়।’ ফারিয়ার প্রস্থানে আনিসের মনে হয় যেন, না— সে এখনো প্রস্থান করেনি। সে এখনো এই বাংলোয় তার সামনেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে। আসলে আনিসের মনোজগতের অবস্থা তখন রবিঠাকুরের ঐ গানের মতো হয়ে যায়—‘নয়নের সম্মুখে নাই তুমি, নয়নের মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাঁই।’ কি ঘুমে, কি জাগরণে আনিস ফারিয়াময় হয়ে যায়। এমনকি শ্রেণিকক্ষেও মাঝেমধ্যে আনিসের হাত কেঁপে ওঠে, মাঝেমধ্যেই আনিস হোয়াটবোর্ডে ভুলভাল লিখে ফেলে। এমনকি ফারিয়ার অনুপস্থিতিতে আনিস আরো বেশি করে আনমনা হয়ে যায়, হয়ে যায় অন্তহীন উদাসীন।
৩
আনিস ও ফারিয়ার সাক্ষাৎ মূলত শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি ও বাংলো বারান্দায় এই জায়গাগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকে বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষেই সাহিত্য শিল্প নিয়ে তাদের আলাপ-আলোচনা বেশি হয়ে থাকে। সেই আলোচনায় কখনো বঙ্কিম, কখনো রবীন্দ্রনাথ আবার কখনোবা শেকসপিয়ার উঠে আসে; উঠে আসে তাদের বিচিত্র সব চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব বিশেষ করে ওথেলো, ওফেলিয়া, ডেসদিমোনা, কপালকুণ্ডলা, রোহিণীসহ বঙ্কিমের অপরাপর সাহিত্য, শিল্পচিন্তা, নারীর প্রেমপ্রণয়-পরিণতি ইত্যাকার নানা বিষয়আশয় তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। ওথেলোর ভুলটা কোথায় ছিল, বঙ্কিম কি বুঝতেন—নারীরা এতো কষ্ট পায় কিংবা ওফেলিয়ার ভাগ্যটা কেন এমন হলো—ফারিয়ার এইসব প্রশ্ন, এইসব জিজ্ঞাসার উত্তর আনিস বেশ যৌক্তিকভাবেই যোগায়। শ্রেণিকক্ষে অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও ফারিয়াই এই ধরনের আলাপআলোচনায় বেশি করে অংশগ্রহণ করে।
৪
একদিন লাইব্রেরিতে যাওয়ার সময় আনিসের কর্ণকুহরে ভেসে আসে সেই হাসির ফোয়ারা। থামতে না চাইলেও আনিসের পা দুটো আপনাআপনিই থেমে যায়; থেমে যায় ফারিয়াও—ঠিক কড়িডোরের মাঝ বরাবর। আনিস পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও পারে না। ফারিয়া সামনে এসে দাঁড়ায়। পড়া, লাইব্রেরি, সাহিত্যশিল্প নিয়ে কত কথা, কত জিজ্ঞাসা, কত উত্তরহীন প্রশ্ন, কত প্রশ্নহীন উত্তর! কোন বই খুঁজছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ফারিয়ার জবাব—‘যেটায় বলা আছে— আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে—’। উচ্চারণ ঠিক থাকলেও ফারিয়ার কণ্ঠে কবিতার অভিপ্রায় বদলে যায় অর্থাৎ আবারও লাইব্রেরিতে আসবে, আবারও দেখা হবে—সম্ভবত এই রকমের একটি ইঙ্গিত ও ইশারা। হঠাৎ করেই আনিসের মুখে উত্তর চলে আসে—‘জীবনানন্দ দাশ আসলে ফিরে আসার কথা বলেননি। তিনি থেকে যাওয়ার কথা বলেছেন।’ এই উত্তরটুকু থেকে বোঝা যায় যে, আনিস কোন সাধারণ মানের শিক্ষক নয়। তার চিন্তার গভীরতা, তার ভাবনার গভীরতা কতটা ব্যাপক ও বিস্তীর্ণ। একজন সৃজনশীল শিক্ষক ছাড়া সাধারণ শিক্ষকের চিন্তায় এমন ভাবনা আসার কথা নয়। এইভাবে, এইসব ভাবনা, এইসব চিন্তার হাত ধরে আনিস ও ফারিয়ার সাহিত্য-আলাপ এগিয়ে যায়, এগিয়ে যায় প্রেম।
৫
মজিদ মাহমুদের এই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে শরতের ঐ প্রেমতত্ত্বের কথা মনে পড়ে গেল। বড় প্রেম কেবল কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। বাস্তবিকই কলেজের চৌহদ্দি পেরিয়ে ফারিয়া উচ্চশিক্ষার জন্য প্যারিসে চলে যায়। প্যারিসে গেলেও তার মনটুকু কলেজের ঐ চৌহদ্দির মধ্যেই ঘুরপাক খায়। বেশকিছু দিন পর ফারিয়া চিঠি লিখতে বসে কিন্তু তেমন কিছুই লিখতে পারে না। মনের কথা মনেই থেকে যায়, কলমের মুখে আসতে চায় না। কেবল নিজের সঙ্গে নিজেরই কথা বলা। কেবল পুরোনো ঘরের মতো ভেতরে ভেতরে ঝুরঝুর করে ভেঙ্গে পড়া। কবি মজিদ মাহমুদের ভাষায়—তার এই চিঠি লেখা ছিল তার সুতার টান—‘যার এক প্রান্ত সে ধরে আছে, অন্য প্রান্ত কোথায় সে জানে না। তবু ধরেই আছে। কারণ ছেড়ে দিলে সব ভেসে যাবে’ ওদিকে কলেজে অনুপস্থিতি, পড়ানোয় অমনোযোগ, কারো বেশি কেয়ার নেয়া, প্রথমে সর্তকতা, তারপর বাধ্যতামূলক ছুটি — এইসব ঘটনার প্রচ্ছন্ন প্রভাবে আনিসের মানসিক ভারসাম্যে কিছুটা গোলোযোগ দেখা দেয় আনিস পাবনায় চলে আসে, ভর্তি হয় মানসিক হাসপাতালে।
৬
একসময় ফারিয়া দেশে ফিরে আসে। জেন্ডার, সমাজ কাঠামো, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত পড়ালেখার অভিজ্ঞান এখন ফারিয়াকে পথ দেখায়। ফারিয়া এখন অনেকটাই স্থির। মজিদ মাহমুদের ভাষায়—এই ‘স্থিরতা আনন্দের না, এই স্থিরতা দায়িত্বের।’ ফারিয়া ঐ ঘরটায় বসে যেখানে আনিস একসময় বসতো, এই ঘরে এখন নানা শ্রেণির মানুষজন আসে। কেউ নারী, কেউ পুরুষ; কেউ ছোট, কেউ বড়; কেউ বয়স্ক। এক বয়স্ক একদিন বলেছিল—‘উনি চলে গেছেন…..কিন্তু ঘরটা রেখে গেছেন হয়তো তোমার জন্য’ এই ঘরে একদিন একটি চিঠিও আসে। চিঠির খামের এক কোণায় সিলমারা অক্ষরে লেখা ছিল—‘পাবন’ আর ভেতরে হাতে লেখা ছোট্ট একটি কথা—‘কথার দরজা খোলা রেখো’—এই হলো ‘কথার ঘর’ উপন্যাসের শেষ কথা অনেকটা রবীন্দ্রনাথের ঐ কবিতার মতো—শেষ হয়েও হইল না শেষ।
৭
কাহিনি-কাঠামোর পাশাপাশি ভাষা শৈলী এই উপন্যাসের দৃশ্যমান সম্পদ। কয়েকটি দৃষ্টান্ত — ‘বাংলোটা হঠাৎ খুব বড় হয়ে গেল’, ‘সময়ের গায়ে ধুলো জমা’, ‘ইতিহাসের গায়ে শ্যাওলা ধরা’, ‘বাক্যটা হাওয়ার ভেতরে ঝুলে রইল’, ‘ফারিয়া চলে যাওয়ার পর বারান্দাটা হঠাৎ খুব বড় হয়ে গেল’ কিংবা ‘সন্ধ্যার আলোটা বাংলোর বারান্দায় এসে থেমে থাকে। যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, থাকবে না চলে যাবে’— এইসব পঙতিতে ঔপন্যাসিক মজিদ মাহমুদ তার না-বলা অনেক কথা লুকিয়ে রেখেছেন। তার উপন্যাসে একটি আলোকবস্তুও জীবন্ত মানুষের মতো ফাংশন করে। ভাষার সঙ্গে সঙ্গে তার যাপিত জীবন ও জগতের দর্শনও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে যেমন —‘ফাইল বন্ধ হওয়া আর মানুষের চোখ বন্ধ হওয়া এক জিনিস নয়’, ‘চাকরিটা আমার হাতে এসেছে ঠিকই কিন্তু জীবনটা যেন নিজের হাতে আসেনি’, ‘শিশু যত ভাষা শেখে সে মায়ের কাছ থেকে তত দূরে সরে যায়’, ‘সীমা কেউ ভাঙতে চাইনে বলেই হয়তো ভেতরে এত ভাঙন’, ‘মানুষের সঙ্গে কথা কমে এলে নিজের সঙ্গে কথা বাড়ে’, ‘ভেতরের জগত যত বাড়ছিল, বাইরের জগত তত কমছিল’, কিংবা ‘পাগলা গারদগুলো শুধু মানসিক রোগীদের জন্য গড়ে ওঠেনি। প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য, বন্দি রাখার জন্য| সম্পত্তি দখলের জন্য করা হয়েছিল’—ইত্যকার অনুভব ও উপলব্ধি আমাদের এই যাপিত জীবন ও জনপদের অনিবার্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশই বলা যায়।
৮
বাংলা কথাসাহিত্যে প্রেমের জুটি কিন্তু কম নয়। যেমন দেবদাস—পার্বতী, মহেন্দ্র—বিনোদিনী, সুরেশ—অচলা, কুবের—কপিলা, কুসুম—শশির একে অপরের হাত ধরে পালানো; আল মাহমুদের ‘পুরুষ সুন্দর’ উপন্যাসে তো দেখা যায়, নায়কের সৌন্দর্যে মুগ্ধ নায়িকারা পরষ্পর প্রেমে পড়ার প্রতিযোগীতায় অবতীর্ণ হয়। এমনকি নায়কের উপস্থিতি কল্পনায় নায়িকার তলদেশ পর্যন্ত সিক্ত হয়ে যায়। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাতভর বৃষ্টি’ (১৯৬৭) উপন্যাসে মালতিকে স্বামীর বন্ধু জয়ন্তর সঙ্গে রীতিমত যৌনসংগম করতে দেখা যায়। কিন্তু মজিদ মাহমুদের ‘কথার ঘর’ উপন্যাসে আনিস ও ফারিয়াকে সংযমের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করতে দেখা যায়। প্রেমের আগুনে পুড়ে পুড়ে তারা খাটি সোনায় পরিণত হয়। তাদের প্রেম যত গভীর হয় তত তারা সংযমী হয়। ভেতরে তারা যতটাই ভেঙ্গে পড়ে বাইরে তারা ততটাই ঋজু হয়ে থাকে। প্রেম তাদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে না নিয়ে বরং দায়িত্বে আরো যত্নশীল করে তোলে; আরো মানবিক করে তোলে। একদিকে ফারিয়া হৃদয়ের অলিন্দে তার প্রেমের পাখিকে সুন্দর করে সুযত্নে সাজিয়ে রাখে অপরদিকে এলাকার মানুষের সাথে মানবিক চিন্তায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখে। উপন্যাসটির প্রথমদিকের টানটান উত্তেজনা শেষের দিকে কিছুটা শিথিল হয়ে এলেও আনিস ও ফারিয়ার প্রেমের বলা ও না-বলা কথাগুলো পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে অন্তত আমার পাঠ-অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।
লেখক
সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
পাবনা সরকারি মহিলা কলেজ, পাবনা।



