কোনও কোনও দেখাও না দেখা, কোনও কোনও না দেখাও দেখার অধিক। মজিদ আমার সেই বন্ধুদের একজন যাদের সঙ্গে চোখের দেখার চেয়ে মনের দেখা অনেক বেশি। ১৯৯১-এ মজিদের সঙ্গে দেখা। বাংলাদেশে নির্বাচনী পর্যালোচনার জন্য গেছি। সাংবাদিকতা করি তখন। সাতদিনের থাকার মেয়াদ দাঁড়িয়েছিল ১৫ দিনে। যাঁদের জন্য তাদের মধ্যে মজিদ একজন। যতদূর মনে পড়ে, টি এস সি তে ওর সঙ্গে আলাপ। কবিতা লেখে, সাংবাদিকতাও করে। মিল দুজনেরই। মজিদ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম মানুষ যার সঙ্গে আমার ‘তুমি’ সম্পর্ক। আরেকজন ছিল আবৃত্তিকার আনিস। তাঁর আর কোনও খোঁজ পাইনি ১৯৯৭-এর পর। মোশরেকা মিশুর সঙ্গে ‘তুই’ বলা পর্যন্ত এগিয়েছিল। মজিদ আমাকে বাংলাদেশের এক গোপন কথা খুব সহজ করে বুঝিয়েছিল। বাংলাদেশের ছাত্র ছাত্রীরা তখন সবাই প্রায় দুর্গাপূজার সময়কার সাজে ঘুরে বেড়াত, এপার বাংলায় তখনও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দৈনিক ইস্ত্রি করা জামা, ক্লিন শেভড হওয়া, লিপস্টিক বা ঠোঁটে সিঁদুর পরে, স্নো পাউডার লাগিয়ে আসার রেওয়াজ আজকের মতো চালু হয়নি। যা ১৯৯১এ আমি বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করি। অনেককেই দেখে মনে হতো বেশ বড় লোক। এমনকি ছাত্র ছাত্রীদেরও। মজিদ তখন বোধহয় স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখালেখি করছে। কবি নাসির আহমেদের ঘরে সেদিন ছিল নৈশ যাপনের দাওয়াত। পান করছে অন্যরা। আমি শুধু আহার। নাসির ভাইয়ের বয়স তখন ৩৭। দেখতে ২৪-২৫। আমাদের থেকে সামান্য বড় মনে হয়। নাসির ভাইয়ের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মজিদ বলল, আমি কোন স্থায়ী কাজ করি না। কিন্তু মাসের শেষে দেখতে পাই তিন হাজার টাকা খরচ করেছি এবং এটা বাবার কাছ থেকে আসা নয় বা টিউশনি পড়িয়েও নয়। শুধু লেখালেখির জেরে এই রোজগার সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ এক তরুণের – চমকিত হয়েছিলাম। কারণ, আমাদের এক অতি সুন্দরী তাঁর সব প্রণয় প্রার্থীদের সামনে উচ্চারণ করেছিল, মাসে যে ৫০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা রোজগার করতে পারবে তাঁকে সে বিয়ে করবে। সে সময় কলেজের অধ্যাপকরাও চার হাজার টাকা বেতন পেতেন না। তাই মজিদের ৩০০০ (তিন হাজার) টাকা খরচের কথায় আমি বিস্মিত।
মজিদ-কবিতা তখনও আমাকে টানত। আজও টানে। তার গদ্যে এক সীমিত পরিশীলিত মনের ছোঁয়া। যেসব বিষয় নিয়ে সে সচরাচর লেখে তা নিয়ে এপার বাংলায় অন্তত চর্চা আমি দেখিনি।
১৯৯১ এর পর ১৯৯৩-এ যাই। দেখা হয়। ১৯৯৭-এ দেখা হয়নি। আবার দেখা হল ২০০৭-এ কলকাতায়। কলকাতা ও হলদিয়ার কবি সম্মেলনে মজিদ এসেছে জেনে দেখা করতে যাই। সে আমাকে দেয় ‘বল উপাখ্যান’ (২০০১)। আমি পড়তে থাকি ঘোরের মধ্যে
‘মরণকে একটি পিচ্ছিল জিহ্বার মতো বিছিয়ে রেখে
আমাকে ধরার জন্য ছুটে চলেছ, আর আমি
প্রাণভোমরা একটি সিন্দুরের কৌটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে
তোমার নাগাল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি।’
পালাতে চেয়েও পালানো যায় না মজিদের কবিতার যাদু মাখানো দুনিয়া থেকে ‘আপেল কাহিনি’(২০০২) থেকে সাব এডিটরের যন্ত্রণা পেরিয়ে ‘বনসাই’ গাছের আপাত কুহক এড়িয়ে আপন ভূমির দিকে ফিরে গিয়ে মজিদ শোনাতে থাকেন মধ্যবিত্তের নিগূঢ় গোপন যন্ত্রনা—
‘তুমি কোন দিকে যাবে
বামে গেলে ডান, ডানে গেলে বাম
বড় অরক্ষিত হয়ে পড়ে … ‘
‘ভালোবাসা তোমার প্রভু’ তে যখন শুনি-
ভালোবাসাকে সবকিছু দাও
তোমার অবজ্ঞা ও আজ্ঞাবহতা
ভালোবাসা এক সাহসী প্রভু
চলো ভালোবাসার কাছে যাই
মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করতেও ইচ্ছে হয়
এসব উজ্জ্বল পংক্তিমালা।
ঈশ্বর এবং ভালোবাসা উভয়কেই তুমি এক নামে
ডাকতে পারো’
জানিয়ে মজিদ আমাদের নিয়ে যায় ‘গোষ্ঠের দিকে’। একটু অতীতের লেখা গোষ্ঠের দিকে। নব্বই দশকে। ১৯৯৬-এ। ‘কবিতা ফিরে আসবে’তে মজিদের উচ্চারণ
‘কবিতা ফিরে আসবে ভেবে
পরিত্যক্ত আবাস ছেড়ে কোথাও যাই না আমি
(কবিতা ফিরে আসবে)।
২
‘ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম’-তে কবি মজিদ এক পরিণত দর্শনের সন্ধান দেন
‘মিলনেই তো শুরু আমাদের প্রথম যোজনা (যাত্রার প্রথম গান
‘আমার মার্কসবাদী বন্ধুরা’ কবিতায় আঁকেন এক বাধ্যতার নিঃশেষিত ছবি
‘আমার মার্কসবাদী বন্ধুদের অনেকেই এখন এনজিও কর্মী
কেউ দলবদল করে ক্ষমতাসীন দলে লিখিয়েছেন নাম
অনেকেই মোটা অঙ্কে বেতন পান। কেউ বাড়িগাড়িও করেছেন
খুব ভালো, তাদের জীবনে সত্যিই মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
ভালো থাকার জন্যই তো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন
কিন্তু আমরা যারা তারুণ্যে মার্কসবাদ করিনি
ছিলাম ‘বুর্জোয়া রাইটিস্ট প্রগতিবিরোধী !’
এখন তারাই প্রোলিতারিয়েত।
দলীয় রাজনীতি করেননা মজিদ। কিন্তু রাজনীতি সম্পর্কে অসম্ভব সচেতন। নির্দিষ্ট দলে নাম লেখাননি, কোনও পতাকাও বহন করেননি – তাই খোলা চোখে দেখতে পান বাংলার মাটি, মানুষ, জীবন ও জীবিকাকে।
‘সিংহ ও গর্দভের কবিতা’ (২০১২)-এ ব্যঙ্গের হাত ধরেছে নান্দনিক নির্মাণক্ষম প্রজ্ঞা।
‘সময়ের শরীর জুড়ে আমরা শুয়ে থাকি
সময়ের খাট ও বাথট্যাব, দড়িদড়া – সব
আমাদের বেঁধে রাখে একটি রাত
তারপর সরাইখানার মতো উগরে দেয়
আগামীকাল কেউ শুতে আসবে বলে। (সময়)
‘অণুবিশ্বের কবিতা” (২০০৮) কাব্যগ্রšে’র ‘প্রভু’ কবিতায় মজিদ উচ্চারণ করেন
টাকাই তোমার ঈশ্বর টাকাই তোমার প্রভু
তুমি আলাদা ঈশ্বরের কথা বলো তবু।
‘ভালোবাসা পরভাষা’ (২০১৫)য় শুনতে পাই মজিদের ভিন্নতর উচ্চারণ
‘আমি ভালোবাসায় ভালো নই
কিছু পাপের মাধ্যমে প্রেমে বিশ্বাসঘাতকতা করি’।
মজিদের উচ্চাশী সৃষ্টি ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্য। ঈশ্বর আছেন। তবে মাহফুজা আছে ঢের বেশি। তাই লেখা হয়ে যেতে থাকে
‘ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে
সেই নারী এসে আমার হৃদয়মন তোলপাড় করে যায়।’
আগুনের অঙ্গ ছাড়া কবির কোন পরিচয় নেই, মাহফুজা ছাড়া আর কোনও নামে আলোড়ন নেই রক্তকণিকায়।
গ্রামকুট (২০১৫) কাব্যগ্রšে’ ‘গোলাপ না ফুটলেও ভালো’, জানিয়ে মজিদ ‘চালের দোকানির সঙ্গে কথোপকথনে’ প্রবৃত্ত হন। এই যে কবিতায় চালের দোকানিকে আনা – এই স্বাতন্ত্র্য মজিদের একান্ত নিজস্ব। মজিদ একটি কাব্যভাষা নির্মাণে প্রয়াসী। যে ভাষায় অন্যরা উদ্বোধিত আলোড়িত মথিত এমনকি স্নাত হতে পারেন।
কবিতার জগতের বাইরে প্রবন্ধের দুনিয়ায় মজিদের মেধাবী ঝলক। নজরুল তাঁর একান্ত গভীর চর্চার বিষয়। গ্রন্থাগারের আদি ইতিহাস, কবিতায় মুক্তির আলোকসন্ধান, রবীন্দ্রনাথের ভারতভাবনা, মানিকের উপন্যাস কথনের রীতি নানা বিষয়ে মজিদের অনায়াস নিজস্ব ভাবনার প্রকাশ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
তাঁর পড়াশোনার পরিধিও বিশাল। গ্যালিলিও, মার্কস, যোশেফ ক্যাম্বেল, এইমে সিজারের উত্তর-উপনিবেশ চিন্তা – নানা বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ, অধ্যয়ন এবং বিশ্লেষণ চমকিত করে একই সঙ্গে করে গর্বিত।
মজিদ বেঁচে থাকুক তাঁর কবিতার নিজস্ব মনোবিন্যাসে, তাঁর গদ্যের দ্যুতিময় বিচ্ছুরণে এবং অমলিন সুস্মিত বন্ধুত্বের নিশানায়



