কাব্যের শিরোনামে ঐতিহ্যের আবহ সৃষ্টির চেষ্টা আছে, আয়োজনে আছে বন্দনার আবেশ, আছে আরাধ্যের সৃজনপ্রয়াস। মজিদ মাহমুদের‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্য সম্পর্কে এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলা চলে। একগুচ্ছ পরীক্ষাকামী সনেট আর বেশ কিছু আন্তরিকতা-ভরা কবিতায় মাহফুজার নামে এই কাব্যে হয়েছে মাঙ্গলিক উচ্চারণ। কবি এখানে গায়েনদের মতো মাহফুজার নাম-সংকীর্তনে অক্লান্ত; জিকিরানদের মতো ওই এক নামের ধ্বনি তুলে বিভোরতায় যেন অর্ধচেতন। হোরেস-লঙ্গিনাসের অভিমতে কবিদের উন্মাদনার যে ভাষ্য ছিল, আধুনিক কালে তা অনেকটাই গেছে কেটে। আবেগের সাথে অভিজ্ঞতাও জারিত হয় কবিতায়, এ কথা আজ স্বীকৃত। তাই কবি তিনি ততো বড়, যিনি যত বেশি এ দুয়ের মিথষ্ক্রিয়া ঘটাতে পেরেছেন; আত্মাগতভাবে, প্রকাশেও। মজিদ মাহমুদের কাব্যে আবেগটা যে খুব বেশি তা নয়। তবে বুদ্ধির প্রয়োগ যেখানে স্পষ্ট চোখে পড়ে। এ দুটোকে এক করে মেশাতে পারলে ভালোই। মজিদ হয়তো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তিনি একটি আধুনিক মঙ্গলকাব্য রচনা করবেন। উত্তরাধুনিকতার এই যুগে ঐতিহ্য-সচেতন হবার যে প্রেরণা দেখা যায়, মজিদ হয়তো সে ধারাটাই মান্য করতে চেয়েছেন। ‘মাহফুজা’র চেয়ে নায়িকা করার মতো অনেক আধুনিক নামগ্রহণের সুযোগ থাকলেও অপেক্ষাকৃত অনাধুনিক নাম গ্রহণ করে সাম্প্রতিক সৃষ্টিতে মজিদ পুরনো আবহ আনার চেষ্টা করেছেন।
বিষয়টি কাকতালীয় হয়তো, অবশ্য কেউ কেউ ইচ্ছে করেই করেন এমন। মজিদ মাহমুদের কাব্যগ্রšে’র নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’; সংক্ষেপে দাঁড়ায় মমা এবং মাম। প্রতীকবাদীদের কাছে এ সবের অর্থ আছে। কিন্তু মজিদ প্রতীকবাদী নন। তবে যখন তিনি একটি নারীকে সামনে রেখে তার প্রশস্তি রচনায় ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, মূর্তির মতো কল্পনা করেন তাকে, তখন পৌত্তলিকতার প্রতীকময়তাই যেন মুখ্য হয়ে ওঠে। ‘কুরশিনামা’
কবিতার কয়েকটি পংক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাক:
ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে
সেই নারী এসে আমার হৃদয়মন তোলপাড় করে যায়
তখন আমার রুকু
আমার সেজদা
জায়নামাজ চেনে না
সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই
এ মাটিতে উদ্গম আমার শরীর
এভাবে প্রতিটি শরীর জানি বিরহজনিত প্রার্থনায়
তার গ্রষ্টার কাছে অবনত হয়
তার নারীর কাছে অবনত হয়’

এ কবিতায় ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা’র মতো ধারণা ব্যক্ত হলেও দেহ কেন্দ্রিকতাই এখানে মুখ্য। কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় মাহফুজার কথা উল্লেখ থাকলেও মাহফুজা নারী নয়, রমণী। কখনো দেবী, কখনো নষ্টা যুবতী, কখনো বা দুই পরাশক্তির মধ্যস্থতাকারী; যেভাবেই তাকে উত্থাপন করা হোক না কেন, ‘মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা … এটাই যেন মাহফুজার পরিচয়। লক্ষ্য করার ব্যাপার হচ্ছে, শরীরে তছবির দানার সন্ধান কিংবা রুকু, সেজদা, জায়নামাজ ইত্যাদি প্রসঙ্গের অবতারণা করলেও মাহফুজাকে মজিদ দেবী বলে অভিহিত করেছেন এবং তাকে প্রার্থনার কথা বলেছেন। অথচ মাহফুজা কোন ‘নারী পয়গম্বর’ বলে কল্পিত হতে পারত। ‘দোয়া’যদিচাওয়া হতো তার কাছে, তাহলে তছবি, সেজদা, জায়নামাজ ইত্যাদি নিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সাহসী কবিকল্পনার সৃষ্টি হতো। লাবণ্যময়ী কৃষ্ণবর্ণের কালী প্রতিমায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাঁওতাল নারীর রূপ কল্পনা করে সমালোচিত হয়েছেন সত্য, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রূপকল্পটি তিনি দেখেছেনই, ছাড়েননি। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির জন্য সাহসী হতে হয়। মাহফুজামঙ্গলের ‘চার’ অংশে উল্লিখিত হয়েছে:
ঈশ্বরের প্রতিনিধি হয়ে সশরীরে তুমি থাকো রোজ কাছে
আমি শুধু তোমার মাহাত্ম্য ভাবি প্রভু কী যে আশ্চর্য অদ্ভুত’
মজিদ তার নায়িকাকে যতই দেবীর সঙ্গে তুলনা করুন না কেন, উল্লিখিত কবিতার প্রথম দুই পংক্তিতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে তুলনা করে তার মাহাত্ম্যে আশ্চর্যান্বিত হন না কেন, শেষ পংক্তিদ্বয়ে তিনি অন্য কোন ‘সার্বভৌম’ সত্তাকেই স্বীকার করলেন। আর এতেই ‘মাহফুজামঙ্গল’ অবশেষে আর মাহফুজার থাকলো না, নিয়ে গেল সেই ‘ঝঞ্ঝা বিপদ’তারিণীতে। তবে আয়োজনে মজিদ বেশ সাহসী, বহুচারী ও বিস্তৃত নিশ্চয়। তা না হলে তিনি কবিতার বিষয়পরিধি জায়নামাজ থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিগানের শয়নকক্ষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারতেন না। আর একটি বিষয়, শুধু প্রান্তিকে পূর্ণচ্ছেদ দিয়ে পুরো কবিতার আর কোথাও যতিচিহ্ন না দেওয়া, কাব্যগ্রন্থটির একটি বৈশিষ্ট্য; এটি মজিদ মাহমুদের চিন্তার মুক্ততা প্রকাশের ইঙ্গিতও বটে।



