মজিদ মাহমুদের কবিতা : পুষ্পিত জীবনের নিবিড় আঘ্রাণ

সাম্প্রতিক কবিতায় শব্দের সাম্রাজ্য জবরদখলের একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বাংলা কবিতার রাজনীতিতে এর প্রভাব সুখকর হয়নি। আমাদের কবিরা হয়ে পড়েন জনবিচ্ছিন্ন। ফাঁকা বুলির বৈচিত্যে পাঠকের ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারেননি তাঁরা। ফলে রবীন্দ্রনাথের সেই ঠাট্টার ঝাঁটাই এখনো অব্যর্থ – পাঠকেরা বলে, ‘এ তো নয় সোজা/ বুঝি কি বুঝি নে সে বোঝা’। কবি ঠাকুরের পর রবির কর অনেককেই উত্তপ্ত করেছে, আমাদের পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জল গড়িয়েছে অনেক। এখন আর অভিধান ঘেঁটে অনাবশ্যক জটিলতার জঞ্জাল জড়ো করে ‘কবিতার ছাঁদ আধুনিক’ বলে পিঠ বাঁচানোর উপায় নেই। যাঁরা এই চেষ্টা করেছেন তাঁদেরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে হয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা বাঁচেন নি।
স্বীকার করছি, কবিতার শব্দে তার সীমাবদ্ধ ভূগোল অতিক্রমণের অভিপ্রায় অপ্রকাশিত থাকলে তা কেবল সংবাদ হয়ে জনারণ্যে ছড়িয়ে পড়ে, শৈল্পিক লাবণ্যে চিন্তাকে আলোড়িত করে না বলেই তা অন্যকে জড়িয়ে ধরতে পারে না। কেবলই গড়িয়ে যায় এবং খুব অল্প সময়ে তা হারিয়ে যায়। ভাব কিংবা বক্তব্যের সঙ্গে শব্দ একাত্ম হতে না পারলে কবিতার সঙ্গে সংসার যাপন তৃপ্তিদায়ক হয় না; দাম্পত্যকলহ অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং এতে শান্তিপ্রিয় পাড়া প্রতিবেশী অর্থাৎ আমাদের সম্মানিত পাঠকেরাও যারপরনাই বিব্রত এবং বিরক্ত বোধ করেন। কবিতার সঙ্গে পাঠকের যে দূরত্বের কথা আমরা প্রায়শই বলে থাকি, তার দায়িত্ব আমাকেও কিছুটা নিতে হচ্ছে। কারণ, ওর সঙ্গে মন দেওয়া নেওয়ার চেষ্টায় আমি এখনও হাল ছাড়িনি।

কবি মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদের কবিতা আলোচনা প্রসঙ্গে আমার উপযুক্ত আলাপচারিতা অর্থহীন। কারণ তিনি দূরত্বের কথা ভাবতেই পারেন না। শব্দের হৃদপিন্ড থেকে তিনি নিঙড়ে আনেন প্রগাঢ় বন্ধনের প্রবল স্পন্দন। দূরত্ব দূর করার দুর্বার শক্তিতে প্রোজ্জ্বল তাঁর পংক্তিমালা। তাঁর আন্তরিক উচ্চারণ নিয়ত কাছে থাকার অম্লান অধিকার অর্জন করে নেয়। (কথাগুলো হয়তো বিশেষ কোন বিজ্ঞাপন চিত্রকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। প্রিয় পাঠক, আমাকে ক্ষমা করবেন। আমাদের বিজ্ঞাপননির্ভর বর্তমান দুনিয়ায় অনুভূতির সকল প্রান্তই যেন পণ্য হয়ে উঠেছে। আসুন আমরা আরেকটু সতর্ক হই। শক্ত হয়ে দাঁড়াই এবং সাহসী মানুষের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কবিতাকে কণ্ঠে ধারণ করি)। তিনি এমনভাবে কথা বলেন যেন একগুচ্ছ সতেজ এবং সপ্রাণ শ্রোতা তাঁর সামনে বসে আছেন। এই অনায়াস উচ্চারণই আমাকে বর্তমান আলোচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে। মজিদ মাহমুদের কবিতার অধ্যাপকীয় বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই, তিনি বরাবরই স্বতঃস্ফূর্ত এবং স্বনির্ভর। মজিদ মাহমুদ পাঠককে ক্লান্ত করেন না, বরং শ্রান্তিবিনোদের এক আকাশ নির্মল বাতাস। তিনি কাব্যপ্রেমিক নামক অলৌকিক মানুষের সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বলেন: আসুন, কিছুটা সময় একটু কাছাকাছি বসি, পরস্পরকে মেলে ধরি এবং অন্তরকে ঢেলে দিয়ে বলি –
‘ভালোবাসাকে সবকিছু দাও
তোমার অবজ্ঞা এবং আজ্ঞাবহতা
তোমার আজকের এবং ভবিষ্যতের দিনগুলো
তোমার হৃদয় সাম্রাজ্য তোমার সুখ্যাতি
পরিকল্পনা, ঋণ, সঙ্গীত এবং জ্ঞান
ভালোবাসাকে দিতে কিছুই কার্পণ্য করো না’।
(ভালোবাসা তোমার প্রভু)
এভাবে ভালোবাসায় সমর্পিত হতে হতে তাঁর উপলব্ধি এক নতুনতর অভিজ্ঞানে আর্দ্র হয়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠ যেন ধারণ করে দৈব উচ্চারণ : প্রকৃত প্রেম ঈশ্বরের মতোই সৃজনশীল এবং মহিমান্বিত। ফলে প্রেম ও পূজার রাবীন্দ্রিক সমন্বয়কে তিনি এমনভাবে স্বীকরণ করেন যে তাঁর কথনভঙ্গি একান্তই মজিদীয় হয়ে ওঠে।

মাহফুজামঙ্গল কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ

‘মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি শ্রমণ গৌতম বোধিসত্ত্ব মহাস্থবির
মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি প্রব্রজিত ভিক্ষুসংঘ
মাহফুজা এবার আমি গ্রহণ করেছি ধর্মং শরণাং গচ্ছামি;
মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি
নির্বাণ শরণাং গচ্ছামি’
(মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি)

এই উচ্চারণ ভঙ্গিতে যে নির্মোহ এবং নৈর্ব্যক্তিক অভিপ্রায় উপস্থিত, তা তাঁর কবিতার পক্ষে স্বাস্থ্যপদ হয়েছে। ফলে তিনি একা কথা বলেই চলে যান না, পাঠকের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে হাঁটতে হাঁটতে অনুভূতির এমন এক ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন তিনি, যেখানে অপ্রাপ্তি এবং অতৃপ্তিও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
‘কাঁটাচামচ’নির্বাচিত মজিদ মাহমুদের কবিতা গ্রন্থটিতে কবির সাতটি গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে। সময়ের বিবেচনায় ১৯৮৯ থেকে আজকে পর্যন্ত কবির জীবনভাবনা ও কাব্যচিন্তার মোটামুটি পরিচয় এই গ্রন্থ থেকে লাভ করা যেতে পারে। প্রকরণকলায় তাঁর ঋদ্ধির ছাপ যেমন চোখে পড়ে, তেমনি বিষয়ের ক্ষেত্রেও তিনি ক্রমাগত আত্ম -অতিক্রমণের চেষ্টা করেছেন। জীবনের একটি দার্শনিক ভিত্তি অনুসন্ধানের পাশাপাশি তিনি কাব্যচর্চার সম্ভাব্য সকল প্রান্তেই ছুটে বেড়িয়েছেন। ফলে তাঁর কবিতার বিষয়- বৈচিত্র্য পাঠকের নজর এড়ায় না। জন্মের যন্ত্রণাকে গৌরবান্বিত করে যে শিল্প, তার সঙ্গে তিনি বিজ্ঞানের সূত্রকে অনায়াসে জুড়ে দিতে পারেন
‘আমার জমজ সহোদরা
সূচিকর্মে নিপুণ সহোদরা
তার হাতে ধরা রুমালে
২৩টি ক্রমজোমের সূতোয় আমাকে কি নিপুণ
গেঁথে নিল সে’
(যাত্রার প্রথম দিনগুলো)

জন্ম-বিষয়ক প্রচুর শিল্পসফল পংক্তি সৃষ্টি করেছেন তিনি। সন্তান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটিকেই তিনি কবিতায় ধারণ করেন এবং এক্ষেত্রেও সেই নির্মোহ উচ্চারণ কৌশল তাঁকে লিবিডো ভারাতুর অশ্লীল কবির অখ্যাতি থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে
ক. সঙ্গম এবং সঙ্গমহীনতা ছাড়া
কী এমন পার্থক্য ছিল আমাদের
(পহেলা ভাদ্র)

খ. কে তোমার প্রকৃত জনক
জননীও ডাকেনি তোমাকে
রক্তমাখা শূন্যতার প্লাসেন্টা ভেদ করে
স্বয়ন্তু দাঁড়িয়েছ তুমি
(নিঃসঙ্গতার পুত্র)
গ. আজ জন্মদান পৃথিবীর সবচে খারাপ ঘটনা
তবু আমার কলম
মহাকালের দিকে অমরতার সন্ধানে ব্যাপৃত !
(আমার কলম)
ঘ. তোমরা ভাবলে-নিরাকার বিন্দু থেকে
কিভাবে তোমাদের সাকার করেছেন
মায়ের ঈষদোষ্ণ স্তন
পিতার নির্বোধ ভালোবাসা ….
বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে গচ্ছিত রেখেছেন আনন্দ
(ঈশ্বর আমাকে বাঁচতে দেননি

কাঁটাচামচ নির্বাচিত মজিদ মাহমুদের কবিতা গ্রন্থের প্রচ্ছদ

মজিদ মাহমুদের কবিতায় পৌরাণিক অনুষঙ্গে জীবনকে পাঠ করে তার মর্মমূলে আধুনিক জীবনযন্ত্রণাকে শিল্পিত করার প্রয়াস লক্ষ্য করার মতো। পুরাণকাহিনীকে তিনি এমনভাবে কবিতায় প্রয়োগ করেন যাতে এই কাহিনী না জেনেও কবিতার রসাস্বাদন ব্যাহত না হয়। অবশ্য পুরাণ জেনে পাঠ করলে কবির সৃজনভাবনার মৌল সূত্রটিকে আবিষ্কার সহজতর হয়। তাঁর পুরাণ প্রয়োগ প্রকৌশল নিয়েই দীর্ঘ নিবন্ধ রচনা করা সম্ভব। কারণ তিনি পুরাণের শক্তিকে নিজের অভিপ্রায়ের অনুকূলে ব্যবহার করতে পেরেছেন। এ প্রসঙ্গে গ্রন্থারম্ভে কাঁটাচামচ প্রকাশন যে বক্তব্য সংযোজন করেছে,তার কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করতে চাই –

‘মজিদীয় সিদ্ধির প্রাণকেন্দ্র তার পুরাণ আশ্রিত দর্শনদগ্ধতা, যেখানে পৌরাণিক পুনঃসৃষ্টির ছক ডিঙিয়ে তিনি ঢুকে পড়েন আধুনিক – ক্ষেত্রবিশেষে-আধুনিকোত্তর মনীষার শাসমূলে। শাস্ত্রশব্দ তিনি ধর্মাঞ্চল বা উপকথার এলাকা থেকে আহরণ করেন সত্য, কিন্তু শাস্ত্রভাষার মর্মর্গত কণ্ঠস্বর আদৌ উচ্চকিত করতে দেখি না তাকে। এক দুর্লভ শাস্ত্রনিরপেক্ষ ধ্যানের নিমজ্জল তাঁর শিল্পভাষাকে আধ্যাত্মিকতার সারসত্যে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ বিশেষ স্বাতন্ত্রের প্রভা তাঁর সৃষ্টির গ্রোতপ্রবাহকে এক বিরলদৃষ্ট নতুন চাকচিক্যে মেলে ধরে।’

উপর্যুক্ত বক্তব্যে কবিতায় পুরাণ ব্যবহারের প্রকৃত উদ্দেশ্যেই মূর্ত হয়েছে। কারণ পুরাণের সঙ্গে ধর্মকাহিনীর যোগ নিবিড় হলেও একজন আধুনিক কবি ধর্মবিশ্বাস থেকে নয়, বরং জীবনের জটিল আবর্তে বিপর্যস্ত ব্যক্তির মানসিক বিভক্ততার পরিচয় দিতে গিয়েই পুরাণের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। পুরাণ প্রয়োগের প্রেরণা কবি লাভ করেন নিজের ভেতর থেকেই। মজিদের কবিতা পাঠে এই বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হয়। তাঁর কবিতায় পুরাণ আরোপিত নয়, যেন অনিবার্য। কয়েকটি উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে
কেনান কেনান বলে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে নুহু
প্রভু! পুত্র ডুবে যায়
(পুত্র ডুবে যাচ্ছে)

‘হে পার্থ, প্রত্যহ প্রাণীগণের মৃত্যু হচ্ছে; তবু
অবশিষ্টেরা চিরকাল বাঁচতে চায়
এর চেয়ে আশ্চর্য আর কী হতে পারে’
(বাতাসের ঘূর্ণাবর্ত ও গুরুপদ)

আমরা ছিলাম কবিতাতান্ত্রিক পরিবারের সন্তান
জলের যোনি থেকে উৎপন্ন হলেও
ক্যাসিওপিয়া আমার মা
ভূমিতে বিচরণশীল প্রাণীদের মধ্যে মানুষকেই
প্রথম বেছে নিয়েছিলাম
(প্রমিথিউস

তাদের জন্য এই পুরস্কার হুর ও গেলমান
দিন পেরুলেই রাত্রি আমার হাত ধরে দেয় টান।
(নিষিদ্ধ কবিতাগুচ্ছ)

নিজপুত্র অশ্বত্থামাকে দিতে পারেননি গোদুগ্ধ
গুর্বী কৃপীর স্তন খাদ্যাভাবে শুকিয়ে গিয়েছিল
(আমার গুরু দ্রোণাচার্য)

পুরাণ ব্যবহারে তাঁর কবিতা লাভ করেছে স্ফূটক সংহতি। কখনো তিনি প্রসঙ্গক্রমে পৌরাণিক প্রসঙ্গের শরণ নেন, আবার কখনো বা পুরাণ কাহিনী অবলম্বন করেই পল্লবিত হয় পুরো কবিতা। উদ্ধৃতিসমূহ থেকে বোঝা যায়, তিনি অবলীলায় যে কোন মিথকেই স্বীকরণের চেষ্টা করেছেন এবং এক্ষেত্রে তাঁর সফলতা সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার বিবেচনায় ঈর্ষণীয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে তিনি অবলীলায় গ্রহণ করেছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের মুখোমুখি তিনি মানবধর্ম তথা মানবপ্রেমের নজির স্থাপন করতে চেয়েছেন এবং এ ক্ষেত্রেও তিনি অবলম্বন করেছেন নূহের কিস্তির প্রসঙ্গ; এখানে মজিদের শৈল্পিক সতর্কতা চোখে পড়ার মতো। মানুষের পাশে থেকে পুত্র কেনানের বিদ্রোহকে নূহ সমর্থন করেছেন ঘুমের ঘোরে। স্বপ্নাচ্ছন্ন নূহের এই কান্নার ভেতর দিয়ে আমরা তাকে প্রকৃত পিতা হিসেবে জেগে উঠতে দেখি। ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে’ কবিতায় মজিদের মুন্সিয়ানা প্রশংসাযোগ্য।
মজিদ মাহমুদ স্বকালের নানা অনুষঙ্গ কবিতায় ধারণ করেছেন। সময়ের চিহ্নকে পংক্তিভুক্ত করার এই প্রবণতা কবির সংবেদনশীলতারই উজ্জ্বল স্মারক। অসঙ্গতির নানা অবয়বকে তিনি অবলীলায় উপস্থাপন করেন। কয়েকটি উদাহরণ দিই –
কবি গেছে শেয়ার মার্কেটে
আর আমি নীলকান্তের পোষা কুকুরের মতো
অভ্যাস বশে
নদীর কিনার ঘেঁষে কেবলই তোমাকে খুঁজি
(স্টক এক্সচেঞ্জ)

গাইনি ও নার্সদের কাজ
মা ও হবু বাবাদের ভয় আরও উসকে দেয়া
গাইনি ও নার্সদের জন্মের আগে মা কি তার সন্তানদের
একা ছেড়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছিল
(ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম)

আমাদের বন্ধুদের শেলফ থেকে পরিত্যক্ত এসব বই
ফুটপাতে নিয়েছে আশ্রয়।
(আমার মার্কসবাদী বন্ধুরা

ক্রসফায়ারেও তো একটা বুলেট অন্তত
এফোড়ওফোঁড় হতে পারে
(পিতা-মাতার অপরাধে)

মজিদ মাহমুদ প্রকরণ সচেতন শিল্পী। তাঁর পরিমিতিবোধ প্রশংসাযোগ্য। সুনির্বাচিত শব্দ তাঁর আজ্ঞাবহ হলেও শব্দকে দিয়ে তিনি এমন কিছু করান না, যা পাঠককে বিব্রত করতে পারে। তিনি উপমার সাহায্যে অভিপ্রায়কে স্পষ্ট করে তোলেন। ক্রমাগত উপমা ব্যবহার করে কখনো বা রচনা করেন ব্যক্তিগত বিবেচনার বর্ণিল সেতু যা পাঠকের সঙ্গে কবির বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। ব্যবহৃত উপমায় কবির বিশ্লেষণপ্রবণতার পরিচয় ধরা পড়ে। একটি ভাব ও বিষয়কে নানাভাবে দেখেও যখন কবির তৃপ্তি নেই, তখন বুঝতে পারি এই শৈল্পিক অতৃপ্তিজনিত অভিনবত্বের মধ্যেই কবির সৌন্দর্যচেতনা মূর্ত হতে চেয়েছে। কয়েকটি উপমা পাঠ করার চেষ্টা করি –
তুমি একমাত্র সন্তানের জননীর মতো
হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়বে আমার অপুষ্ট তনুর উপর
(বল উপাখ্যান)

আর আমি ডায়ানার ছিনালি আর লীজ টেলরের
নিতম্বের অসুখ অনুবাদ করে কাহ্নের মতো
তোমার শরীর স্পর্শ করে খটখট ছুটে চলেছি
(সাব-এডিটর)

গগের রঙের আকাঙ্ক্ষার আর
মকবুলের গজগামিনীর মতো
আমার পতন আর তোমার উত্থানের মতো
বিভাজিত ঈশ্বরের মতো
তুমি আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছ মাহফুজা
(পতনের মতো)

পথভ্রষ্ট হলে তার দূত পাঠিয়ে
বিকৃঙ্খল মেষের পালের মতো তিনি একত্রিত করেন
(ঈশ্বর আমাকে বাঁচতে দেয়নি)

মজিদ মাহমুদ কবিতার শরীর-স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীন নন। যদিও ছন্দ নিয়ে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরিচয় তাঁর কবিতায় নেই। তিনি গদ্যছন্দেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। টানা গদ্যে লেখা যাত্রার প্রথম দিনগুলো (২০০৬) কাব্যগ্রন্থের বেশ কয়েকটি কবিতায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। একটি কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃত করি –

ঝরা পাতার মধ্য দিয়ে তুমি যখন গড়িয়ে যাচ্ছিলে একটি মন্ডুকের মাথার ওপর বৃষ্টির ফোটা বিচূর্ণ হয়ে তোমার চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। তুমি একটি ঘাসের নিচে গড়িয়ে গড়িয়ে সন্তর্পণে মাটির কৌশিক ভেদ করে পাতালের দিকে চলে যাচ্ছিলে। আমি ও রাজপুত্রের মতো তোমার এইসব গোপনযাত্রার পথ অনুসরণ করে এগিয়ে যাচ্ছি সমুদ্রের বিছানার দিকে।

(ঝরাপাতা)

অত্যন্ত সাবলীল এবং সপ্রাণ এই শব্দচয়ন, যেন শব্দগুলোও গড়িয়ে গড়িয়ে গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে। মাঝে মাঝে মিশ্রছন্দে তিনি অনুভূতির নানা প্রান্তে আলোক প্রক্ষেপণের চেষ্টা করেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ আপেল কাহিনি (২০০২) গ্রন্থভূক্ত ‘সমুদ্র দেখার পর’কবিতাটির নাম করা যায়। এই গ্রন্থেরই একটি কবিতায় তিনি অন্ত্যমিলবহুল অক্ষরবৃত্তে নগরবালাদের রাত্রিযাপনকে চিত্রিত করেন-
গাড়ি করে নিয়ে গেল চন্দ্রিমা উদ্যানে
কবরে শব কাতরে ওঠে মরা জোছনার বানে

আমার শুধু কানে এলো পুলিশের হেট হেট
মনে হলো পরপারে ফেরেশতাদের গেট
(নিষিদ্ধ কবিতাগুচ্ছ

ছন্দের ওপর তাঁর দখলের প্রমাণ গদ্যছন্দে রচিত কবিতাগুলোই বিধৃত। ছন্দবৈচিত্র্য কবির প্রাকরণিক সমৃদ্ধিকেই চিহ্নিত করে। বিষয়টি মজিদ অনুভব করবেন আশা করি।
কবিতার যৌবন অক্ষুন্ন রাখার নানাবিধ কৌশল মজিদ মাহমুদের আয়ত্তে। তাঁকে মৃদুভাষী বলা গেলেও মিতভাষী কিংবা স্বল্পভাষী বলা যায় কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। তিনি আয়েশী ভঙ্গিতে শব্দ গেঁথে যান। তিনি চোখ রাখেন শ্রোতার দিকে। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত ভান্ডারের সমৃদ্ধি থেকে দু’চারটি দুর্বল শব্দকেও তিনি আনমনে তুলে নেন। ভাবের ক্ষেত্রেও এই অনুযোগ উত্থাপন করা যেতে পারে। ফলে মজিদ মাহমুদকে পাঠ করতে করতে অনেক সময় হোঁচট খেতে হয়। পুরো কবিতার মধ্যে দু-একটি দুর্বল পংক্তির অস্বস্তিকর অবস্থিতি তাঁর অনেক সফল কবিতার স্বতঃস্ফূর্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এ বিষয়টি উদ্ধৃতি দিয়ে পরিষ্কার করা কঠিন। কারণ আমার এই বক্তব্যকে পুরো কবিতার পটপ্রেক্ষায় বিবেচনা করতে হবে। ‘অব্যক্ত কান্নার গান’ নামের একটি কবিতায় কবি অত্যন্ত চমৎকার সরসতায় এবং সরলতায় জলপরী ও আকাশপরীর স্বপ্নমগ্ন শৈশবের স্মৃতিচারণ করেছেন। কবিতাটি পাঠ করতে করতে কবির ব্যক্তিগত পরী-পুকুরে একটু ডুব দিয়ে পাঠকের নিজস্ব শৈশবকেও উদ্ধার করতে ইচ্ছে করে। কবি প্রশ্ন করেন
তোমরা কি সেই পরীপুকুরের কথা বলো
বলতে বলতে হাস
হাসতে হাসতে কেঁদে ওঠো মানবিক ব্যথায়
তখনও কবির দীর্ঘশ্বাস পাঠকের হৃদযন্ত্রকে নাড়া দিয়ে যায় কিন্তু কবি যখন আশঙ্কায় আক্রান্ত হন এবং বলেন-
আমার তো মনে হয় না তোমাদের সেই ব্যথা
কোনদিন জানা হবে আমার !

তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। এ-রকম পরিসমাপ্তির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমরা। এ প্রসঙ্গে ‘তাজমহল’ কবিতাটির কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ কিংবা নজরুলের মতো করে তিনি তাজমহলকে দেখেননি। শাজাহানের এই অম্লান কীর্তিকে তিনি নিজের চোখ দিয়েই দেখেছেন এবং এই দেখার ও লেখার ক্যারিশমা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু তাজমহলের মহিমা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি যখন ভিন্ন মতাবলম্বীদের মুখোমুখি দাঁড়ান, তখন আর কবি মজিদ মাহমুদকে খুঁজে পাওয়া যায় না। তিনি রীতিমত বলিষ্ঠ গদ্যে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন
অথচ নিন্দুকেরা বলে কোনো এক দাম্ভিক রাজার
ঐশ্বর্য প্রকাশ এই তাজমহল
মানুষের রক্ত ও ঘাম, শোষণ ও নির্যাতনে নির্মিত স্মারক
গরীবের প্রেম করেছে উপহাস
আজ কোথায় সম্রাট, কে তার বাপ
পুত্রদের কথা হয়তো লেখা রয়েছে ইতিহাসের পাতায়
কিন্তু এই তাজ মানুষের মেধা ও শ্রমের মূর্তিমানরূপ
ভেঙ্গে পড়া প্রেমিকের জাগার মন্ত্র

এ-জাতীয় বর্ণনায় তিনি যতটা বস্তুনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন, ততটা শিল্পনিষ্ঠার পরিচয় পাই না। ‘ভেঙ্গে পড়া প্রেমিকের জাগার মন্ত্র’ ছাড়া এই উদ্ধৃতির শব্দ-গ্রন্থনায় মজিদীয় বাক-প্রকৌশল অনুপস্থিত। অথচ এই কবিতাতেই তিনি নিবিড় হৃদ্যতায় তাজমহলের প্রতিটি পাথরকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। এ রকম উদ্ধৃতির তালিকা খুব দীর্ঘ হবে না স্বীকার করছি, কিন্তু মজিদ ইতোমধ্যেই আমাদের প্রত্যাশার অনেকটা জায়গা দখল করে নিয়েছেন, তাই আমরা তাঁকে ভালোবাসার ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত করে অপরিসীম আন্তরিকতায় নেড়েচেড়ে দেখতে চাই।
মজিদ মাহমুদ কবিতার সম্পন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। বিচূর্ণ ভাবনার বিকৃঙ্খল উপস্থাপনার পরিবর্তে তিনি ভাবকে একটি স্বাস্থ্যসম্মত অবয়ব দিতে চান। তাঁর সুকৃঙ্খল শব্দসম্ভার সত্যিকার অর্থেই কবিতা হয়ে উঠতে চায়। ‘শব্দকে ভাবের খরগ্রোতে ডুবিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় পূর্বাপর প্রতিশ্রুত’ মজিদ মাহমুদ ক্রমাগত ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়ে পরিপূর্ণতার দিকেই এগুচ্ছেন। ভাবকে বিস্তৃত কিংবা শিল্পিত করার ক্ষেত্রে শব্দের অভাববোধজনিত অস্বস্তি নেই তাঁর কবিতায়। মজিদ মাহমুদ তাই বলতেই পারেন ‘আমার কলম সাপের জিহ্বায় ভর দিয়ে কালোত্তীর্ণ কবিতা লিখছে।’ কিন্তু এই সগর্ব ঘোষণার আগে আরো দীর্ঘ, বিস্তৃত এবং বন্ধুর পথে হাঁটতে হবে তাঁকে।
মজিদ মাহমুদের শক্তি ও সম্ভাবনার প্রতি আমাদের আস্থা আছে।

ড. কবি তারেক রেজা

লেখক : কবি, গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *