মজিদ মাহমুদের কবিতার সামগ্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা একটি পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করতে পারি। প্রত্যেকটি মানুষের কবিতা পাঠের একটা আলাদা ধাঁচ থাকে – যাঁরা কবিতা পড়েন তাঁরা সেই ধাঁচ থেকে কথা বলেন, তাই দেখা যাচ্ছে সবার মধ্যে কিছুটা ঐক্যের সুর রয়েছে অন্তত কয়েকটা প্রসঙ্গে। তাতে বলতেই হয়, আমাদের কবিতার বোধের ও অনুভবের মান এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মজিদ মাহমুদ পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারছেন – এটা এখন নিশ্চিত করে বলা যায়। অর্থাৎ তিনি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছেন। কমিউনিকেটিভ কবি হিসাবে তাঁকে বলা হচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে – কবিতা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আমরা একটা মানকে স্পর্শ করতে পারছি। এর ভাল দিকও আছে, আবার তার খারাপ দিকও আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে যেটা মনে করি – মজিদ মাহমুদ তো আমার ছাত্র ছিলেন; এমনকি যখন তাঁর কবিতার বই বের হয়নি তখনও আমি তাঁর কবিতা পড়েছি। আমি তরুণদের কবিতা বেশি পড়ি তার কারণ এর মধ্যে অরিজিনালিটি অর্থাৎ মৌলিকতা বেশি থাকে এবং মানুষের জ্ঞান যত বৃদ্ধি পেতে থাকে মৌলিকতা তত নষ্ট হতে থাকে। এটা আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি – আসলে বিষয়টা কতটা সত্য এটা তর্ক সাপেক্ষ আমি কিন্তু সেটা মনে করি।
কবিতার মধ্যে যত মেধার অনুশাসন আসছে কবিতা তার মৌলিকত্ব ততটাই হারাচ্ছে – এটা কেন জানি আমার মনে হয়। আমার সেই আদিম কবিতাগুলো বেশি ভাল লাগে। আর কোন কোন কবিতার মধ্যে মৌলিক কিছু চিত্রকর্ম আমাকে প্রবলভাবে টানে কবিকে আমি খুঁজি তাঁর চিত্রকল্পের মধ্যে। আমি তাঁর ঐ রূপের মধ্যে খুঁজি না, কারণ রূপ তো সাধনা করলেই অর্জন করা যায়। কিন্তু মৌলিক যে শব্দগুচ্ছ চিত্রকল্প এগুলো একজন কবির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মজিদ মাহমুদ যখন কবিতা লেখা শুরু করেন তখন তাঁর কবিতার মধ্যে এই অরিজিনালিটি অনেক বেশি ছিল। তিনি তাঁর বোধকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অবশ্য তার সবকিছু যে ভালো লেগেছে তা বলা যাবে না। তবে মজিদ মাহমুদ অনেকগুলো বিন্দুকে মেলাতে চেয়েছেন। সেই বিন্দুগুলো যত না তাঁর চেতনার অভিজ্ঞতাজাতক তার চেয়ে অনেক বেশি তাঁর জ্ঞান নির্ভরতাজাত। যেটা হওয়ার কথা ছিল অনেক বেশি মৌলিক, যেটাকে বলা হচ্ছে যে অনেক বোধের যেখানে ভ্রম আছে – সেখানে ইসলাম ধর্মের অনুষঙ্গ আছে, ভারতীয় পুরাণের অনুষঙ্গ আছে। আর ইসলাম যে কখনো মিথ্যা অনুমোদন করে না সেটাও আমাদেরকে ধরেই নিতে হবে। কারণ সম্মিলিত ধর্ম বিশ্বাস কখনও মিথ্যা অনুমোদন করে না। তা বলার মধ্যে অনেক ঝুঁকিও আছে। আমি যেটা বলতে চাইছি সেটা হল কোন কোন জায়গায় গিয়ে আমার মনে হয়েছে মজিদ মাহমুদ সেই মিশ্রণ ঘটাতে গিয়ে মৌলিকবোধের মান অতিক্রমের পরিচয় দিয়েছেন শুরু থেকে।
‘বল উপাখ্যান’ তাঁর প্রায় প্রথম দিকের কবিতা – যখন মন ও মেধার অনুশাসন তার উপর এতটা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যেমন ‘ব্রহ্মা তখন আমাদের মধ্যে ছিলেন/ আমরা তখন ব্রহ্মার মধ্যে ছিলাম/ ব্রহ্মা কিছুদিন মাটি ছিলেন/ আমরা কিছুদিন আকাশে ছিলাম। আমরা যারা মিথ ও ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ – আফ্রিকান মিথ, ইউরোপিয়ান মিথ এবং ভারতীয় মিথে যে এক একটা ভৌগোলিক অবস্থানগত আলাদা – এখানে কিন্তু সব মিলিত হয়ে গেছে। কবি বলেছেন – তিনি আকাশ ছিলেন এবং আকাশের বোধটি কিন্তু কোন পুরুষের মধ্যেই জাগার কথা। পুরুষ আকাশ হিসাবে সব সময় কল্পনা করে। সেইভাবেই অনুভব করতে গিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি মৌলিক চিন্তার অনুকরণ তৈরি হয়ে গেল। এটা আমার কাছে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এ ধরনের অনেক কথা তাঁর কবিতার সম্পর্কে বলা যাবে। অনেক মৌলিকবোধ তাঁর কবিতায় কাজ করেছে এবং এসবই এসেছে তাঁর মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। তবে আমি অত কিছু বলতে চাই না – দুই একটি প্রসঙ্গ বলতে চাই। একটা কথা বলা হচ্ছে যে বাংলাদেশের কবিতার যে কমিউনিকেটিং ধর্ম এবং এই কবিতা সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়েছে। যেমন জসীমউদ্দীন জনপ্রিয় হয়েছেন। সমসাময়িককালে জনপ্রিয় হয়েছেন জীবনানন্দ দাশ। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ তাঁর সমকালের জনপ্রিয় হননি। তখন কিন্তু ঐ মনন শাসিত কবিতার আধিপত্য ছিল। অনেক বেশি পরে বুদ্ধদেব অবশ্য বুঝেছিলেন এটিই বাঙালিসত্তার মূল বৈশিষ্ট্য। যে কারণে বুদ্ধদেব বসুই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। বহুকাল পরে বাঙালি অনুভব করতে পারে বাঙালি স্বভাবের অনুভূতির কবি। মূলত বাঙালি জীবনের যে অনুভূতি যেরূপ এর সঙ্গে এই কবিতার কাঠামোর একটা সম্পর্ক আছে। কিন্তু মঙ্গলকাব্য কেন টিকে থাকে … মঙ্গলকাব্য লেখা হয়েছে; এই মঙ্গল নামের মধ্যেও কিন্তু আমাদের অনুভূতি ভূগোলের একটা সম্পর্ক রয়েছে। যে কারণে এই ধরনের কবিতা আমাদের চৈতন্যে পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে বলতে থাকলে – আমরা যদি এভাবেই চলতে থাকি।
আমরা মনন শাসিত শহীদ কাদরীর কবিতা খুব বেশিক্ষণ কিন্তু পড়ি না। বলি, খুব ভাল কবিতা লিখেছেন তিনি। আল মাহমুদের কবিতা আমরা বেশিক্ষণ ধরে পড়ি – এটা আমাদের মনের একটা চেতনা-আমাদের চেতনা বিন্যাসের সঙ্গে এসব কবিতার একটি নিবিড় গভীর এবং অবিভাজ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। এ ধরনের কবিতা লিখে আমি ইউরোপীয় ধাঁচের ইমেজ তৈরি করতে পারলাম না … একটি উল্লম্বন রেখা তৈরি করতে পারলাম না – এইভাবে বলা আমার ভূগোলকে, আমার মাটির স্বভাবকে অস্বীকার করা। এজন্য বলব, কবিতা যদি পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এবং আমার ভূগোলকে অতিক্রম করতে না পারে তাহলে তো সেই কবিতাই আমার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। মজিদ মাহমুদের কবিতায় ভূগোলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এই ভূগোল কেবল ভূ-মানচিত্র নয়; ভাষা ও সাংস্কৃতিক ভূগোল – যা মজিদের কবিতায় ধরা পড়েছে।
তাছাড়া এখনও আমি মনে করি না যে, মজিদ মাহমুদের কবিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে। আমরা বলতে পারি যে – এই কবিতাগুলোর মধ্যে এই সম্ভাবনার স্পষ্ট ছায়াপাত ঘটেছে। দেখা যাক পরবর্তী কতদূর পর্যন্ত সেটা চলে যায়। ‘মাহফুজামঙ্গল’র কবিতার একটা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়। কিন্তু প্রেমের মধ্যে একটা প্ৰাৰ্থনা আছে অবনত প্রার্থনা তৈরি এটা পুরুষতন্ত্রের বিরোধী একটা রূপ। যেটা আমার কাছে ঐ সময় মজিদ মাহমুদের কবিতার একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে হয়েছিল। তাছাড়া ঐ কবিতার মধ্যে অনেক কিছু আছে – যেগুলি আমি বলেছি – ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। আর যে কবিতার জন্য এটা খুব একটা মনে রাখার মত বিষয় – যাঁরা কবিতা লেখেন এবং এখানে অনেকে হয়ত কবিতা চর্চা করেন; তাঁরা জানেন, কবিতার কিন্তু অনেকগুলো স্তর আছে। শুধু জনপ্রিয়তা দিয়ে কবিতা মূল্যায়ণ করা কোন কালেই সম্ভব নয়। যেমন সর্বজন গ্রহণযোগ্য কবি শামসুর রাহমান- যাঁর মধ্যে সে ধাঁচটা আছে এবং আর অনেক কবির মধ্যেই আছে সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি রূপ এবং সমকালের পাঠককে দ্রুত আকর্ষণ করার ক্ষমতা। কবি নির্মলেন্দু গুণের মধ্যেও তাঁর কাব্যযাত্রার সূচনাকালে আমরা লক্ষ্য করেছি; নির্মলেন্দু গুণ দুটি প্রান্তকে স্পর্শ করতে পেরেছেন ক্স একটা হল আমাদের আনুভূতিক আর একটা হল সমকালীন প্রিয় প্রসঙ্গগুলো – এই দুটো কারণে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। আর মধ্যবিত্ত মাঝামাঝি পাঠকদেরও স্পর্শ করে কিন্তু কালান্তরের যে স্তরটির কবিতা – সেটা পরিমাপ করাটা একটু দুরূহ। তবে আমি যেটা মনে করি বাংলাদেশের এই কালে মজিদ মাহমুদের কালের যাঁরা কবিতা লেখা শুরু করেছেন এদের মধ্যে দুই তিন জনের মধ্যে কালাতিরিক্ত মনের একটা সম্ভাবনা আমরা লক্ষ্য করেছি এবং এই সময়ে এসে মজিদ মাহমুদ তাঁদের একজন। সে যে কবিতা লিখছে – তাতে আমার মনে হচ্ছে অনুভবকে শিল্পোত্তীর্ণ এবং চিত্র কল্পময় করে তোলার ক্ষেত্রে ঐ ন্যারেটিভ কাব্যধর্মের মধ্যেও যে সম্ভাবনাকে সে লালন করেছে —আমি সে সম্ভাবনাকে তার কালের কবিদের মধ্যে এবং তার ভিতরে আমি অনেক বেশি করে লক্ষ্য করি। সেটা বিষয়ের দিক থেকেও আমি তো বলেছি, শিল্প হচ্ছে একটি বানানো সত্য — সে যত বেশি পরিশীলিত রূপ পাবে তত বেশি নাগরিক হবে এবং বলাই হচ্ছে সেই বহুকাল আগের কথা — তিরিশের দশক হলো গত শতাব্দীর পুঁজিবাদীর গল্প। এ যতই পরাবাস্তবতা হচ্ছে তার একটি খেলনা সে যত সুন্দর করে বানাচ্ছে আমার তাই ভাল লাগছে, কিন্তু ঐ খেলনা আমার ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য কখনও কাম্য হতে পারে না। এই যে ‘গোষ্ঠের দিকে’ যাওয়া সমাজের একটি আকারের দিকে যাওয়ার যে প্রবণতাগুলো- সেই অসম্প্রদায়িক বোধের কথা; কিন্তু আমি একটু দ্বিমত পোষণ করি সেটা হল যে, মিথের মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িকতা প্রমাণ করা যায় না। এই বোধটা হচ্ছে মিথ আক্রান্ত। আসলে সাম্প্রদায়িক বোধ যেটা রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও ছিল। নজরুলকে আমরা যেভাবেই অসাম্প্রদায়িক বলার চেষ্টা করি না কেন – তাকে সর্বধর্ম সমন্বয়কারী বলা যেতে পারে। এটা গুণকীর্তনের বিষয় নয়। আসলে এই বোধগুলো হচ্ছে – আলাদা আলাদাভাবে উপস্থাপন করে আবার স্মরণ করে দেওয়ার ব্যাপার। আমি মনে করি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা হচ্ছে নজরুলকে অতিক্রম করে যাওয়া; নজরুলের অনেক ভাল গুণ আছে আমরা সব সময় স্বীকার করি। এ বোধটাই কিন্তু বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। একজন একটা প্রান্তকে বেছে নেবে এবং বাংলা সাহিত্য অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই জন্য মনে করি যে – অসাম্প্রদায়িকতা বোধ যদি বাংলার মুসলিম কবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমরা খুঁজে পেতে চাই – তাহলে আমাদেরকে জসীমউদ্দীনের কাছে যেতে হবে, এটাই হল আমার বক্তব্য। এই বোধগুলো এখন আমাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। সবগুলোকে ধারণ করে এই যে এগিয়ে দেওয়া- আমাদের শিল্পকে এগিয়ে দেওয়া-এই ক্ষেত্রে আমাদের কবিরা যে ভূমিকা পালন করছেন এবং মজিদ মাহমুদ যে এখনও ভাল কবিতা লিখছেন এবং ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করছেন এটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। আমি তাঁর কবিতার মধ্যে বড় শিল্পের বৈশিষ্ট্য দেখেছি। আমি মজিদ মাহমুদের দীর্ঘ সৃষ্টিশীল জীবন কামনা করি।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। লেখাটি আরসি মজুমদার মিলনায়তনে মজিদ মাহমুদের কবিতার উপর প্রদত্ত বক্তৃতা থেকে সংগৃহীত



