মজিদ মাহমুদ কবি, তাঁর কবিতার বই ‘মাহফুজামঙ্গল’ আসলে প্রেম এবং প্রার্থনার কবিতা, নাকি প্রার্থনা ও প্রেমের কবিতা সেটি নিয়ে সংশয় আছে। কাকে আগে বসাব প্রেম নাকি প্রার্থনা? আমাদের বাংলাদেশে কবির তো অভাব নেই। এখানেও অনেক কবি আছেন, কারও কারও কণ্ঠস্বর সহসাই চেনা যায়। শুরুতেই চেনা যায়, কারও বা কণ্ঠস্বর চিনতে অনেক সময় লাগে, কারও বা কণ্ঠস্বর চেনাই যায় না। সেই বাইশ-তেইশ বছরের এক কিশোর সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মজিদ মাহমুদ-এর ‘মাহফুজামঙ্গল’ প্রথম কাব্যেই কিন্তু নিজেকে চিনিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। অথচ প্রথম বলে আগেরটা অনেক কবিই অস্বীকার করে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের মত মানুষ পরবর্তীতে তাঁর কবিতা অচলিত বলে বাতিল করে দিয়েছেন, বুদ্ধদেব বসু বাতিল করে দিয়েছেন। তাঁরা আগের কবিতাকে অস্বীকার করেন।
আগে ছড়ার বই বেরিয়েছে বটে, কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে মজিদ মাহমুদ প্রথম আত্মপ্রকাশ করেছেন ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর মধ্য দিয়ে। সেই বিবেচনায় বলি যে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থই তিনি নিজস্ব কণ্ঠস্বর নিয়ে কবিতাপ্রেমী পাঠকের কাছে বোধ করি পৌঁছে যেতে পেরেছেন। মজিদ মাহমুদের এটুকুই সার্থকতা। আর দ্বিতীয় সার্থকতা তাঁর কবিতায়- এই বয়সের কবিতায় প্রেম, ফুল, পাখি, নদীর কথা থাকে; মজিদ সেই দিকে যাননি। অন্তরের গভীর বিশ্বাস থেকে, গভীর একটি প্রত্যয়ের জগৎ থেকে তিনি বড় একটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন; এবং সেই পরীক্ষায় আমার বিবেচনায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি এক চিরায়ত নারীর আদলে গ্রষ্টাকে দেখেছেন অথবা গ্রষ্টার অবয়বে চিরায়ত নারী হাজির হয়েছে। সাহস বা দুঃসাহস বলা যেতে পারে। কারণ এই কাব্যের
প্রথম যে দুটি চরণ-
‘ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে
সেই নারী এসে আমার হৃদয়মন তোলপাড় করে যায়’
খুব সাহসের উচ্চারণ। ঝামেলা হতে পারতো। কিন্তু ঝামেলায় পড়েনি, এটা তার ভাগ্য। একজন কবি বাইশ বছরে যখন লেখেন মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি – তখন একটু মেরুদন্ড সোজা রাখতে হয়। ব্যাপারটা কি এতই সহজ- মাহফুজাং শরণং গচ্ছামি বলা, আর সেটি কবিতা হয়ে ওঠা কম কৃতিত্বের ব্যাপার নয়। কবিতা হয়ে ওঠাই বড় বিষয়। সেটি হয়ে উঠেছে; এবং ঐতিহ্য, ধর্ম, গ্রষ্টা, নারীকে কবি মজিদ মাহমুদ এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিয়েছেন। যেটি গভীর বিশ্বাসে পৌঁছেছে। কিন্তু যাঁরা পরবর্তীকালে পঞ্চম সংস্করণ বইটি দেখবেন তাঁরা দেখবেন এর সঙ্গে আরও দুটো অংশ যুক্ত হয়েছে। উত্তরখণ্ড ও যুদ্ধমঙ্গল। একটি প্রশ্ন করা যেতেই পারে- এটি না করলে কি চলত না। আমি জানি না মজিদ মাহমুদ আমার কথায় প্রতিবাদ করবেন কিনা, সেই কিশোর বয়সের যে গভীর বিশ্বাসের উচ্চারণ তার সঙ্গে চল্লিশের উচ্চারণ মিলবে কিনা। মাহফুজা তো জোর করে যুদ্ধমঙ্গলে হাজির হয়েছে। তবে নিশ্চয় কবির কোনও যুক্তি থাকবে। কাব্য সমালোচকদের কোনও যুক্তি থাকবে, কাব্য পাঠকদেরও যুক্তি থাকবে। তবে পাঠ করতে ভাল লাগে যেন মনে হয় এ কথার সাথে কোথাও আমার বিশ্বাসে কোথাও ভাবনায়, আমার দর্শনে সাদৃশ্য আছে। তাঁর এই গ্রন্থেও তিন পর্বের মধ্যে তিনটি আবিষ্কারের কথা বলব; যদিও কবিতাগুলোতে কবি মজিদের দার্শনিক ভাবনা ব্যক্ত হয়েছে। কিন্তু প্রথম দিককার কবিতায় বিশ্বাস, ভাবনা, প্রেম, ঈশ্বর এক কাতারে মিলে গেছে। আমি আশা করব মজিদ মাহমুদ কবিতার ভান্ডারকে কেবল পরিমাণ দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন না, গুণ দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত; এটি মাহফুজামঙ্গলের পঁচিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বক্তব্য আকারে উপস্থাপিত।



