এই কবিতাগুলোই আমি। আমার সময়। আমার দেশ ও মহাকাল। আমার মায়ের মৃত্যু ও পিতার অনুশাসন। প্রথম কন্যার জন্ম ও অসুস্থ সন্তানের শিয়রে বসে থাকা। কৈশোর পেরোবার কালে কোনো এক মানবী ডেকেছিল দ্ব্যর্থ ইশারায়। এগুলো অবলম্বন করে জেগে আছে সোমপুর বিহারের সিদ্ধাচার্যগণ, গৌরাঙ্গকে ঘিরে বৈষ্ণব পদকর্তাগণ, রোসাং রাজ দরবারে পুঁথি হাতে বাঙালি কবিগণ, সেন দরবারে জয়দেব- বোধায়ন, রেড়ির প্রদীপ জ্বেলে মনসার ভাসান রচয়িতা বিজয়গুপ্ত। এই কবিতাগুলো মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে না আসা সন্তানের অপেক্ষায় থাকা মা, নুহের প্লাবনে ডুবে যাওয়া কেনান, ক্রুশবিদ্ধ যীশু, তীক্ষ্ণ ছুরির নীচে হাজেরার পুত্র, পিতার অনুগত কাসাবিয়ানকা, যুদ্ধে পরাস্ত সৈনিক, প্রমত্ত দামোদরের সন্তরণরত ঈশ্বর শর্মা।
কথাগুলি উচ্চারণ করেন কবিতামালায় কবি মজিদ। এই উচ্চারণ ছাড়া আরও বিস্তৃত তাঁর উচ্চারণ। যে উচ্চারণ আমাদের জানায় মজিদ মাহমুদ কেবল ভাবাবেগের কবি নয়, তাঁর কবিতার মনোবীজে যুক্ত দেশ-কাল-ঐতিহ্য-জ্ঞান-ধেয়ান সহ আরও নানান মেজাজ – যা একজন কবি হওয়ার পথে জরুরী আবশ্যিক শর্ত।
১) ব্যক্তি সম্পর্ক –
গুন্টার গ্রাস মারা যাবার কয়েকদিন আগে উচ্চারণ করেছিলেন, মানবসভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে। এ সময়কার কবি বাংলাদেশের মজিদ মাহমুদের ব্যক্তি উচ্চারণে প্রেম এমনই এক বিষয়। তুলনায় অন্য সম্পর্কগুলি সহজ।
ক) এখন প্রেম :
কয়েকটি ব্যক্তি-উচ্চারণ থাকে তার কবিতায়। ২০১৫ সালে লেখা ‘ভালোবাসা পরভাষা’ (২০১৫) কাব্যগ্রন্থের নির্বাচিত কিছু কবিতার কিছু অংশ দেখুন –
‘আমি ভালোবাসায় ভালো নই’ কবিতায় লেখেন:
‘আমি ভালোবাসায় ভালো নই
আমি ভালোবাসার শরীরে আঘাত করেছি
আমার নিদ্রাহীন চোখে সন্দেহের অশ্রু।
ভালোবাসার ভালোরা ভালোবাসার গাছটাকে, যা নির্মিত হয় দুজনের মনোজগতে তাকে আঘাত করে না।কবি যেন কোথাও সেই গাছকে আক্রমণ করেছেন ভাবেন। আক্রমণের কারণও বলেন, ‘সন্দেহের অশ্রু’। সেই কারণে কবিকে ছেড়ে যায় ভালোবাসা।
‘ভালোবাসা ছেড়ে গেছে’ কবিতায় লেখেন, উচ্চারণ করেন আশ্চর্য বলিষ্ঠতায় :
‘আলোকিত হয়ে উঠল আমার অন্ধকার হৃদয়
বেজমেন্ট থেকে উড়ে গেল এক ঝাক কবুতর
দুরন্ত শিকারির মতো গেঁথে নিলে তোমার বর্ণায়
আমার পতন, আমার রক্তপাত সেই থেকে তোমার মুঠোয়’
সময়ের মধ্যে নাগরিক ভালবাসার মঞ্চ থেকে বিশ্বায়নের ক্রুর হিংসা, জ্বলন্ত দগ্ধতা যুক্ত হয়। তা থেকে মুক্ত নয় মজিদের প্রেমের কবিতা। আবার দোদুল্যমান সময়ে মানুষের চিত্তও অস্থির – যেন জীবনানন্দ শেষ হবে না কোন কালেই। জীবনানন্দ উচ্চারণ করেন
‘সুরঞ্জনা ওইখানে যেয়ো নাকো আর
কথা আর বোলো না কো ওই যুবকের সাথে।
মজিদও বোঝেন একথা। আর তাই লেখেন সন্দেহ সংশোধিত রূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। কবিতার নাম ‘আমি তোমাকে ধরতেও পারি না ছাড়তেও পারি না
‘আমি তোমাকে ধরতেও পারি না
ছাড়তেও পারি না
তোমাকে ধরার এবং ছাড়ার কারণ খুঁজতে থাকি’
কখনো উচ্চারণ করেন সম্রাজ্ঞীর উদ্দেশ্যে তার আক্ষেপকে ‘স্বেচ্ছাচারী সম্রাজ্ঞী’
কবিতায় –
‘যখন তোমার বিশাল ঐশ্বর্যকে উপেক্ষা করে
আনুগত্যের পরিবর্তে দিয়েছিল কেউ ঘৃণা
বাজারে যে যুবরাজ্ঞীর সহবত জানে না
পথের ধলা কী করে বুঝবে প্রাসাদের মহিমা’
ভালোবাসার অজগ্র অনুভূতি এভাবেই ধরা পড়ে নিঃসঙ্গ নায়কের মতো। যেন কবি একক, এক প্রান্তের বাসিন্দা। আর তারই প্রেয়সী, প্রেমিকা থাকে অন্যপ্রান্তে। তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। মেদুরতার আবেগে বিহ্বল হওয়া যায় না থাকেভালোবাসার উঠোন ঘিরে, কাঁদে প্রেম, কাঁদে বাস্তব না ছোঁয়া মনন নির্মাণী তাজমহলের একক বাসিন্দা। যে মনে নির্মিত হয় বাস্তব ছাড়িয়ে নিজস্ব রোমান্টিক স্বতন্ত্র জগৎ জগতে নেই কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত, সেই জগতে থাকে একটি হতাশা – না না। কেন?
কবি কী সত্যিই কি বাংলা আধুনিক কবিদের মতো না এর পথে হাঁটেন – যার সূচনা জীবনানন্দ থেকে যে কবি মর্কিড বলে গালাগালি খান তাঁর একাংশের সমালোচকের থেকে। যে কবিতার ইতিহাসমালায় সুধীন দত্তও টেলিফোন করে কই লীলা,
অথচ রঙ্গিলা
নয় সে দীপ্তির মতো।
কহনারী সঙ্গকারীর মন তুলনার ছবি আঁকেন সুধীন্দ্রনাথ। কিন্তু এ কবির প্রেমিকা এক-সে রক্তাক্ত হৃদয়ের উষ্ণতায় দীপ্ত নয়, বরং সন্দেহের কালো অন্ধকারে নির্মিত, নিণাত, চিহ্নিত, দলিত মানুষ।
খ) কন্যার কথা :
কবি উচ্চারণ করেছিলেন অসুস্থ কন্যার কথা। ‘নিরুদ্দেশ যান’ কবিতায় লেখেন –
‘তোমাকে ডাকতে ডাকতে অন্ধকার রাত্রি পেরিয়ে যাই
বসে থাকি অসুস্থ কন্যার শিয়রে
এটুকুই। তারপরই আসে ‘মাহফুজামঙ্গল’ থেকে নামা মাহফুজার কথা। লেখেন –
‘তুমিই তো ওদের মা
তবু ভয় পাই – ফিরে দেয়ার শর্তে করেছিলে দান
এখন দরোজায় দাঁড়িয়ে আছে তোমার শকট
মাহফুজা আমার মনে জেগেছে অঙ্গীকার ভঙ্গের পাপ
ফিরে যেতে বলো তোমার নিরুদ্দেশ যান’
কন্যার অসুস্থতায় পিতার চিন্তা – বাংলা কবিতায় প্রথম নয়। শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ এ প্রসঙ্গে মনে আসে। কিন্তু নিরুদ্দেশ যান শব্দের ব্যবহার কন্যার অসুস্থতার জন্য অঙ্গীকার ভঙ্গ বড় হয়ে দেখা যায়। নিরুদ্দেশ যান ফিরে যেতে বলার মধ্যে প্রকট হয় বিশ্বাস না রাখার কথা। শেষ পর্যন্ত তাই কবিতাটি ততখানি মেয়ে সম্বন্ধীয় থাকে না, হয়ে ওঠে আর এক ব্যঞ্জনায় আভাসিত।
গ) পুত্র ডুবে যাচ্ছেঃ
যদিও ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে’ কবিতায় লেখেন
‘আমি পুত্রের মায়া চাই
আমার পুত্র আজ ডুবে যাচ্ছে গজবের জলে
সেই জলে আমি নৌকা চালাব
এক জোড়া মানুষের নমুনা নিয়ে!’
কবিতাটিকে মনে হয় পুত্রের মায়া চাওয়া কবি বোধহয় কোথাও আকুল সন্তানের জন্য। পুত্রের ডুবে যাওয়া কষ্ট হায় কুরে কুরে খায় তাকে। কিন্তু এই কবিতাটিকে আরও নৈর্ব্যক্তিক করেছেন। লেখেন –
‘আমিও জলে যাব আমার পুত্রের সাথে
আমিও থৈ থৈ আগুন পানির মধ্যে হাবুডুবু খাব
জীবন মৃত্যুর স্বাদ মেখে নেব শরীরে
তোমার কিশতি প্রভু তুমিই সামলাও … ‘
কবিতাটিতে ধ্বনিত হয় ‘অন্নদামঙ্গল’র কবি ভারতচন্দ্রের মতই,
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’
সন্তানের জন্য কামনা। কিন্তু ভারতচন্দ্র ধনাত্মক ভাবনায় ভাবিত। অন্যদিকে মজিদের সন্তান থৈ থৈ জলে ডোবা – সময়ের গ্রোতে – যেন অনেকখানি শঙ্খ ঘোষের ‘বাবরের প্রার্থনা’ কবিতার মতো – ঋণাত্মক ভাবনার বহনকারী –
‘ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাকে’।
ঘ) আমার বাবা বড় শক্ত ধাতের মানুষ ছিলেন :
কবিতার নাম ‘বাবা’। কবিতার প্রথম চরণ ধরেই এই অংশের নাম- “আমার বাবা বড় শক্ত ধাতের মানুষ ছিলেন’। চল্লিশোত্তর বয়স মানে, বাবার শাসনের ছবি, যে ছবির ভেতর থাকে বাঙালি পরিবারের ছোট্ট ছোট্ট সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য – সেই পরিবারের অধীশ্বর বাবা। সেই অধীশ্বরও একদিন ভেবেছে ক্স আমার বাবা বড় শক্ত ধাতের মানুষ ছিলেন। বাবা মানেই আগল – সামন্ততান্ত্রিক বন্ধনের আগল। এ কবির বাবা আবার অভিধানে ‘না’ রাখেননি। কবি বলেন,
‘মোগলরাজের শেষ সীমানায় পা রেখেছেন
ইংরেজের রেজিমেন্টে নাম লিখেছেন
ভারত ভাঙার আন্দোলনে সামনে ছিলেন’
ব্যক্তিগত আরও কিছু কথা উচ্চারিত হয়। বাবার সঙ্গে আসে মা। যে মা’র কাছে বাবা নরম। কবি লেখেন
‘মা বলে সে নরম ছিল
পিঠের পরে কাল গোখরার খড়ম ছিল
আমার মা’র কাছে সে নরম ছিল
হানাদারের আঘাত সয়ে ভাইয়া যখন চলে গেলেন
বাবা তখন আদর করে ভাইয়ার গালে চুমু খেলেন
উতাল করা ঝড়ের মুখে আমরা তখন হাবুডুবু
দিকভ্রান্ত নাবিক তখন দক্ষপেশী হাল ধরেছে
মুচকি হেসে বলতো খোকা ভয়টা কিসের?’
২) কখনও সাহিত্যে –
ক) শ্রদ্ধার্ঘ্য লেখককে
বাংলা বা অন্যান্য ক্লাসিক কখনও কখনও তাঁর কবিতায় স্থান পায়। যেমন ‘বসন্তগত জীবনে’ কবিতায় লেখেন
‘যখন মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথ
এক অজানা বাতাসে দখিণের জানালা খুলে যায়
হয়তো জোছনার মোহন শরীর ছুঁয়ে যাবে দেহ’
শরৎচন্দ্রের সব থেকে জনপ্রিয় লেখা বোধহয় দেবদাস যা ভারতেরও সব ভাষায় ছড়িয়েছে। কবি লেখেন :
‘গভীর নিশীথে একাকী রোজ উঠে আসে পার্বতী
বৈধব্যের সজ্জাতে বিরহিণী ধরে আছে চর
কিছু একটা উপায় বলো দেবদাস’
কখনও ফিরে যান হাফিজে। ‘হাফিজ ১’কবিতায় লেখেন :
সে ছিল কবি – জগতের গুরু
কবিগুরু মায় তাহার বাপ
স্বীকৃতি তার দিয়েছিল অবাধ
মজিদ ত নয় তাহার মাপ।
এই কবির চরিত্র নয়, প্রেম ভাবনাকে রূপ দিয়েছেন কবি। অবশ্য কবির দর্শনও বাদ যায় না।
‘তার একটা যাজ্ঞা ছিল
সরাইখানায় সাকির সাথ
শুরুটা হবে মদিরা দিয়ে
অক্ষয় হবে প্রতিটি রাত।
খ) কখনও কাব্যে :
কবি নয় শ্রদ্ধা নামে কবির কাব্য ঘিরে। প্রতিভাবান মধুসূদন দত্তর বিখ্যাত চরণ- ‘রেখ মা দাসেরে মনে’ কবিতায় নামে ব্যবহার করেন। লেখেন এ যুগের আশার ছলনা। উচ্চারিত হয়
‘আশার ছলনে ভুলি কি কুক্ষণে দেখেছিলি
বানতলার নেহারবানু অনিতা ইয়াসমিনের লাশ
আশার ছলনায় ভরা সময়ের কবিতা যে বেদনা বিচ্ছুরণ করবে, চারপাশে ঋণাত্মক ঘটনাকে আঁকড়ে আঁজলা ভর্তি করে নেবে এই তো স্বাভাবিক।
গ) অস্পষ্ট আভাস :
কখনও কবির লেখা কাব্যের নামে হয়। জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ কবিতার নামানুসারে এ কবিও লেখেন ‘রূপসী বাংলা’। কিন্তু তার রূপসী বাংলায় বাবুদের বাংলো পানোৎসবে উন্মত্ত থাকে
‘পানোন্মত্ত মানুষের কোলাহল রঙিন সাকুরা বার
সোডিয়াম আলোতে ভাসে ওপারের সুইমিং পুল
কোনও কোনও কবিতায় দুখু মিয়া অর্থাৎ নজরুল আসে। ‘দুখু মিয়ার কবিতা’ কবিতায় লেখেন :
আগুনের বীণা বাজে সারারাত, গোখরোর ফুা
‘আপনার বিষজ্বালা মদ’ তোমার কী পোষাবে না
চিতার শরীর থেকে ক্ষীপ্রতা খুলে সন্তর্পণে চলি
বর্ধমান পথ ভোলে, হারায় আসানশোল গলি।
৩) মহাপুরুষ ক্রম –
‘বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী’,‘প্রমিথিউস’,‘সিদ্ধার্থ’ এবং প্রভৃতি কাহিনীগুলি চিনিয়ে দেয় ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সম্পর্কে জ্ঞানী কবিকে। তিনি ‘বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী’ কবিতায় লেখেন :
‘এই বিক্ষুব্ধ ঝড়ের রাত আগুন পানির মত
ফুঁসে উঠছে দামোদর নদী
নদীর মধ্যে মহিষ
মহিষের শিং ধরে ভেসে যাচ্ছে
আদিম মেয়োসিস
কেবল অস্তিত্বটুকুতে দেখিয়ে বাকি রূপক কবিতাটিকে অন্য অর্থ দেয়।
‘প্রমিথিউস’ কবিতায় লেখেন :
‘আমরা ছিলাম কবিতাতান্ত্রিক পরিবারের সন্তান
জলের যোনি থেকে উৎপন্ন হলেও
ক্যাসিওপিয়া আমার মা
তখন হিমযুগ
সোনা মাছ তেরচা মাছ আর কাঁচা মাছ মাংস দিয়ে
উদর আর নাভিমূল পুরিয়েছে
যে অগ্নিতে সংস্থাপিত ঈশ্বর
যে আগুনে পুড়েছিল তুর
আমরা আমাদের সন্তানকে সেই আগুন চুরির
কৌশল শিখিয়েছিলাম
‘সিদ্ধার্থ’ কবিতায় লেখেন :
‘কাম ক্রোধ মাৎসর্য অনেক আগেই নিভে গেছে তোমার
তবু নির্বাণ বলবে না কেউ
সেদিনই আমাদের যথার্থ জন্ম হতে পারে কেবল
প্রাণকে লোভনীয় এক টুকরো মাংসের মতো
যারা ঝুলিয়ে রেখেছিল কাল, সেইসব কুকুরের
জিহ্বা থেকে লালা গড়িয়ে পড়ার আগেই
এক লাফে দেয়াল টপকে কেউ যদি ধরে ফেলে
ঈশ্বরের হাত
এই পর্যায়ে ‘বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী’ বা ‘প্রমিথিউস’ বা ‘সিদ্ধার্থ’কবিতায় বলা বাহুল্য ব্যক্তি নাম বা নাম পুজো নয়, সেখান থেকে চলকে আসা অনুভূতিই এবং সেখানে নিজের আত্মানুসন্ধানই কবির লক্ষ্য। আত্মানুসন্ধান অবশ্যই সময়ের প্রেক্ষাপটে সত্যি। একথা ঠিকই অনুভবী কবির লেখা তার সময় ও সমাজের সঙ্গে সহাবস্থান করেই সত্যতা পায়। আর রবীন্দ্রনাথ তো লেখেন, সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নয়। নির্ণেয়মান ভাব সত্যই কল্পচক্ষে এই কবিতাগুলিকে মহান জীবন থেকে ভিন্ন করে ছিন্ন করে অন্য আর এক ভাব সত্যে পৌঁছে দিতে চায়। যদিও তিনটি এই ধরনের কবিতাতেই যে ভাব প্রকট, সেটি সময়কালীন পচন এবং শুদ্ধির দৃঢ়তা। যে দৃঢ়তা বা শক্তির জন্য প্রমিথিউসের কাছে, বিদ্যাসাগর জননীর কাছে (বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী ডাকাতের হাত থেকেও বাঁচান পরিবারকে) ফিরে যেতে হয়। কেন? এ সময়ে নয়, ঐ সময়ে ফিরতে হয় কবিকে, এও এক জিজ্ঞাসা পাঠকের কাছে রাখেন হয়তো কবি।

৪) দেশকাল জুড়ে অনুভব
আমরা দাঁড়িয়ে আছি একুশ শতকে। যে শতকে দালাই লামা লেখেন :
We have become long on quantity
but short on quality.
These are times of fast foods
but slow digestion;
Tall man but short character;
steep profits but shallow relationships.
কবি মজিদ কোন কথা অনুভব করেন? পশ্চিমবাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন, সরকার গঠন হয়, রাশিয়ার পেরেস্ত্রৈকার ঝড়ে সাম্যবাদ ভেঙে যায়, আসে ভোগবাদ, যা গ্রাস করে মানুষকে – মনুষ্যত্ব নড়বড়ে হয়ে যায়, লোভী হাত ক্রমাগত বাড়ে, বাড়ে হিংসা, দ্বেষ, কলহ। ঠিক এ সময় বাংলাদেশেও র্মাক্সবাদী দর্শন ছড়িয়ে পড়ে, ‘আমার মার্কসবাদী বন্ধুরা’ কবিতায় লেখেন
‘আমার মার্কসবাদী বন্ধুদের অনেকেই এখন এনজিও কর্মী
কেউ দলবদল করে ক্ষমতাসীন দলে লিখিয়েছেন নাম
অনেকেই মোটা অঙ্কে বেতন পান। কেউ বাড়ি গাড়িও করেছেন
খুব ভালো, তাদের জীবনে সত্যিই মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
‘আমেরিকা’কবিতায় কবির বক্তব্য :
‘স্বাধীনতা, মুক্তি ও গণতন্ত্র শব্দত্রয়কে বস্তুত আমরা
ঘৃণা করতে শুরু করেছি; কিছুদিন আগেও যা
ছিল আমাদের প্রাণের দোসর
আর ওয়াশিংটন ঘাড়ের ওপর
তুলে ধরেছেন অন্য এক পৃথিবী
সেই পৃথিবীতে বলি হয়ে যাওয়া মানিপ্ল্যান্টের উপর
বসে থাকা মানুষ কী জানে, সে কিসের জন্য দেশ ছেড়ে অন্য দেশে
পাড়ি জমাচ্ছে,
প্রশ্নটা উঠে আসে ‘আমেরিকা’কবিতা পাঠের পর।
ঠিক এরই উত্তর আসে ‘বাংলাদেশ’ কবিতায়। কবিতাটি গদ্য আকারে লেখা –
‘বিদেশের অভিজ্ঞতা আমার বড় খারাপ। সারাক্ষণ মন ভারি হয়ে থাকে
……… তারা জিজ্ঞেস করে আমি কোথা থেকে এসেছি..
তারা বলে ও! ইন্ডিয়া ? ……… তোমাদের পৃথিবী এত ছোট
পৃথিবীতে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল কারা। আমরা স্বাধীন হয়েছি,
তোমাদের অনেক রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি জীবনের বিনিময়ে।
অথচ ৪শ বছর আগেও ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার জানতেন,
পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী দেশ হলো বাংলাদেশ।’
ঠিক এইখানে এসেই বাঙালি হিসাবে আমাদেরও গর্ব। আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গীয় তাদের আসল দেশ বাংলাদেশ – কারণ পশ্চিমবঙ্গীয়দের মাতৃভাষা বাংলা ও সেই মাতৃভাষার স্বীকৃতি বাংলাদেশে। নদনদী বেষ্টিত সবুজ-ঘেরা দেশের জন্য বাংলাদেশের মাটিই তাদের কাছের। মর্শিদাবাদের বরকত ঢাকায় গিয়েই ভাষার জন্য শহীদ হন। দুই বাংলার বাংলার মন, চিন্তা, ভাবনা, হিংসা, দ্বন্দ্ব, ঝগড়া, খাওয়া, অতিথিপরায়নতা, ভোজন বাহুল্য বেঁচে আছে ওই দেশে। তাই মজিদ যখন গর্ব করেন – পৃথিবীতে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল কারা – সেই গর্বে মজিদের সঙ্গে আমরাও গেয়ে উঠি গর্বে – ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ – দিনে।

কাঁটাতার আর মনে থাকে না – হাজার দূরত্ব দিলেও ভাষার টানে বাঙালির মনে চেতনায় বাংলাদেশ এক হয়ে যায়। আমাদের সন্তানদের ক্রমাগত আমেরিকা যাত্রায় প্রচুর টাকা কামানো ভাবায় এবং কমিউনিস্ট সরকার পতনের পর আমাদের র্মাক্সবাদী বন্ধুরা, অনেকেই মার্কসবাদী জীবনে টাকার অঙ্ক মেলান যেভাবে – সেই ভাব আমাদের বেদনাদগ্ধ করে।
৫) মুক্তিযুদ্ধ –
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলশ্রুতি ১৯৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ বাংলাভাষীর কাছে ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসে। চল্লিশোর্ধ মজিদের দেখা এই মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর কাছের। তাদের বিষয় আশয় ঘুরে ফিরে আসে। ‘যুদ্ধ’ কবিতায় লেখেন :
‘শত্রুরা হত্যা করল আমার পিতাকে আর ওরা আমার বেড়ে ওঠার বয়স
তুমি কেবল যুদ্ধের গল্প বলো
কবিতার বয়স যৌবন অন্যপ্রান্তে নিয়ে গেলেও যুদ্ধের অস্বীকার নেই। ‘মুক্তিযোদ্ধা কবিতায় সরাসরি বলেন,
‘আমি এক মুক্তিযোদ্ধাকে চিনি
যুদ্ধে যার একটি পা খোয়া গেছে
আমাদের স্বাধীনতা তার একটি পা নিয়েছে
বর্তমানে সে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা’
“সৈনিক’ কবিতায় লেখেন :
‘তবু প্রকৃত যোদ্ধা
পায় না ভয় সম্মুখে শত্রুর তরবারি
সবখানে মৃত্যু হাত পেতে আছে
মারো না হয় মরো’
‘যুদ্ধমঙ্গল’ কাব্যে এক আট সংখ্যক যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা লেখেন। কবিতাগুলির অনেকাংশে গদ্যে লেখা। কবিতাটি মাহফুজা নাম্নী নারীর উদ্দেশ্যে। যুদ্ধ ও জীবনযুদ্ধ কবিতাগুলিতে একাকার। যেমন ‘যুদ্ধ ২’ কবিতায়,
‘আমরা যারা যুদ্ধের ময়দানে মারি কিংবা যুদ্ধ না করলেও যারা মরি।’
‘যুদ্ধ ৭’ কবিতায় লেখেন :
‘যুদ্ধ শেষ হলে আরেকটি যুদ্ধ শুরুর প্রতীক্ষা থাকে’
‘যুদ্ধ ৮’ কবিতায় বলেন :
‘একটি জাতিকে পল্টনে দাঁড় করিয়ে
কথার ছুরিতে দ্বিখন্ডিত করা
এও এক বিকৃত যুদ্ধের নাম’
অবশেষে ‘সন্ধি’ কবিতায় লেখেন :
‘অথচ আজ আর কেউ পরাস্ত নই
সন্ধি তো যুদ্ধের নিয়মে।’
যুদ্ধ থেকে জীবন, জীবন থেকে অনন্ত অনুভবের দিকে যাত্রা পাঠককেও সেই অনুভবে অংশী করাই তো স্রষ্টার কাজ।
কবি মজিদ সেই কাজটা করেছেন।

শেষ কথা
কবি মজিদ মাহমুদের জন্ম ১৬ এপ্রিল, ১৯৬৬ পাবনায়। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর কবিতার বিষয় বিচিত্র, ভাবনা বহুমুখী ও গভীর। ছন্দ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা তাঁর কবিতাবলীতে বৈচিত্র্য নিয়েই উপস্থিত। কিন্তু ছন্দ পৃথক আর এত বৃহৎ বিষয় বলেই এখানে আলোচনা করলাম না। কিন্তু পয়ার, মহাপয়ার সনেট রচনাতেও তিনি বেশ দক্ষ দেখলাম।
তাঁর কবিতার সঙ্গে আগেই পরিচিতি ছিল। কিন্তু কবির সঙ্গে পরিচয় হয় ভালভাবে ২০১১ বা ২০১২ সালে। কবিতা নয়, আরও বিবিধ বিষয় নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। পাঠকরা বোধহয় জানেন না, গদ্য, প্রবন্ধতেও মজিদ স্বচ্ছন্দ। তাঁর লেখালেখিও অনেক, বই সংখ্যা বহু। সম্ভবত মজিদ মাহমুদ সম্পূর্ণ সময়ই লেখাতেই মনোনিবেশ করেছেন। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর লেখা উত্তরোত্তর পরিণমনের দিকেও।
সবশেষে বলি, কবিতার শবব্যবচ্ছেদে অনেক সময়ই কবিতার ভাব সৌন্দর্য নষ্ট হয়। তাই উপরোক্ত আলোচনা, ব্যাখ্যার থেকে কবির কবিতার দৃষ্টান্ত বেশি রাখলাম। মজিদের কবিতা আগে যারা পড়েননি তাদের জন্য থাকল অনেক অনেক চরণ, জনান্তিকে বলি স্বল্পে সম্পূর্ণ হয় না, পুরো কবিতাগুলি নিজেরা পড়ুন ও পড়ান।
আর কবি মজিদের জন্য রইল এপার থেকে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা – সেই সঙ্গে এও বলি দীর্ঘ সুস্থ’ জীবনে তিনি আরও আরও লিখুন।



