মজিদ মাহমুদ-এর বেশ কয়েকটি বই আমাকে দিয়েছিলেন বন্ধু মানসী কীর্তনীয়া। আমার তখনকার আবশ্যিক পাঠ্যসূচির মধ্যে সেই বইগুলির সম্পূর্ণ অন্তর্ভূক্তির আগেই এক পারিবারিক দুর্ঘটনায় আমার বইপত্র ইত্যাদি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে ও আজও তা সম্পূর্ণ শৃঙ্খলায় ফিরে আসেনি। তখন ও তার পরে, বিচ্ছিন্ন ভাবে তাঁর লেখাগুলির কিছু কিছু আমাকে পড়তেই হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কারণে। এমনি তো তিনি গবেষক লেখক, তাঁর প্রতিটি তথ্যই তিনি পরীক্ষার পরে ব্যবহার করেন। তথ্যের বাইরে কোনও মত বা মন্তব্য তিনি বড় একটা করতে চান না। তাঁর লেখার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার সেটা একটা প্রধান কারণ। আমার এটা বহুদিনের আফশোস যে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অধ্যয়নে বাংলাদেশের নতুন গবেষণাগুলি পশ্চিমবঙ্গের অবশ্যপাঠ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। মধুসূদন সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ-এর গবেষণা মধুসূদন-পাঠকে আমূল বদলে দিয়েছে। অথচ আমি পশ্চিমবঙ্গের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে সেটা আবশ্যিক পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্তি দেখিনি। কিন্তু বছর চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে যে বইগুলো মধুসূদন-পাঠে অপরিহার্য বিবেচিত হতেন, এখনও তাঁরাই মধুসূদন বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। উনিশ শতকের সমাজ বিকাশের আলোচনায় মুনতাসীর মাসুন-এর সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র সংকলন সম্পাদনা পশ্চিমবঙ্গের কোনও সমাজবিকাশ গবেষণায় ব্যবহৃত হচ্ছে এমন সাক্ষ্য আমি পাইনি। ১৩০০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত বাংলাপ্রদেশে হিন্দু মুসলিম সংস্কৃতির আঞ্চলিক বিকাশ নিয়ে আহমদ শরীফ-এর তথ্যসংগ্রহ ও তথ্যসংশ্লেষ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস অধ্যয়নে পশ্চিমবঙ্গে আলোচিতই হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুঁথিশালার সংগ্রহ সম্পর্কে কোনও ধারণা পর্যন্ত আমাদের নেই। কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র তো একটা বিস্তারিত পুঁথি-তালিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগ্রহ করতে পারতেন। ইউনিভার্সিটি মঞ্জুরি কমিশন তো শুধু এই কাজের জন্য একজন গবেষককে ঢাকায় পাঠাতে পারতেন। ফলে বাংলা সাহিত্য নিয়ে যে বিভিন্ন ধরনের পঠন পাঠন পশ্চিমবঙ্গে চলে তা অনিবার্যত খন্ডিত ইতিহাস। দেশ তো ভাগ হয়েছে ১৯৪৭-এ। তার আগে যে সুবে-বাংলার সীমান্ত অনেকবার রদবদল হয়েছে, সেই সুরে বাংলার সমাজবিজ্ঞান, সমাজ-ইতিহাস, সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ইতিহাস বাধ্যত অসম্পূর্ণ ও অসম্পূর্ণই রাখা আছে। গত প্রায় ৫০ বছরে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা উপন্যাস চর্চার শিকড়শুদ্ধু বদলে গেছে কিন্তু ইতিহাসচর্চার মূল গ্রন্থ এখনও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘বাঙ্গালা সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা”। সেখানে প্রযুক্ত উপন্যাস বিচার পদ্ধতি অন্তত দু’শো বছরের পুরনো, লেখকদের বিন্যাসের কোনও নিরিখই গ্রন্থকর্তার নিজস্বচিন্তার বাইরে নয় অর্থাৎ কোনও বস্তুদৃষ্টি নেই এই নিরিখ নির্মাণে।

বিদ্যাচর্চার এই পশ্চিমবঙ্গীয় পরিবেশে মজিদ মাহমুদ-এর মত এক তরুণ চিত্তকের (জন্ম ১৯৬৬) চিন্তাভাবনা আমরা জানতে পারব, এটা আশা করা ভুল জেনেও তাঁর ভিতরে যখন চিন্তাসখ্য পাই, তখন কেমন একটা আত্মবিশ্বাস জন্মায় যে প্রকাশ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাচর্চার গভীরে হয়তো নিজেদের বিষয়ের দরকারেই আমাদের দুই বাংলার কোনও কোনও বিশেষ বিনিময় ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু এমন বিনিময় যথেষ্ট নয়। এই বিনিময়কে বিদ্যাচর্চার প্রধান সড়কে নিয়ে আসতে হবে। মজিদ মাহমুদ-এর চর্চিত কয়েকটি বিষয়মাত্র আমি এখানে উল্লেখ করছি।
১. ‘বাঙালির ইতিহাস কি খুব প্রাচীন? বাংলা ভাষার ইতিহাস বড়জোর টেনেটুনে হাজার দেড়েক বছর নেওয়া সম্ভব। সুতরাং কুলীন ভেবে বাঙালির শ্লাঘা শেষ করার কোনও কারণ নেই। … বাংলা, ভাষা হিসেবে সংগঠিত হওয়ার অনেক আগেই পৃথিবীর বহু প্রান্তে ভাষা ও ভাষাকেন্দ্রিক সভ্যতা নিয়ে গর্ব করার বহু উপাদান তৈরি হয়ে গেছে। ’ (‘বাংলা ভাষা কি বদলে যাচ্ছে?’)
এই মত পড়ার সময় আমাদের থাকা উচিত যে ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাতত্ত্বের ইতিহাস থেকে আমরা যে এক প্রভুভাষার অস্তিত্ব প্রায় বৈজ্ঞানিক বলে বিশ্বাস করে নিয়েছি – সেটা কতই ভুল। বাংলা কোনও প্রভুভাষার বিচার নয়। কোন এক আঞ্চলিক ভাষার সঙ্গে সেই কাল্পনিক প্রভুভাষার মিশ্রণের ফল।
২. ‘কড়ি ও পয়সা শব্দের যেমন বিলুপ্তি ঘটেছে, ঠিক টাকা শব্দটিরও দৃশ্যগত পরিবর্তন বা বিলুপ্তি ঘটা আগতপ্রায়। টাকা একটি সময়ে দৃশ্য সংখ্যাতত্ত্ব হিসেবে থেকে যাচ্ছে; রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় সেই সেই হিসাব আজ রক্ষিত হচ্ছে যে ব্যক্তি এই টাকার মালিক সে তার চেহারা দেখতে পাচ্ছে না কিংবা দেখা দরকার হচ্ছে না। এমন কি টাকা বিনিময় মাধ্যম হলেও একজন ব্যক্তির কাছে এর সঠিক মূল্য অজানা থেকে যাচ্ছে।’ (‘ভাষার অর্থনীতির শাব্দিক তাৎপর্য’)।
এই ব্যাখ্যা আমি অন্যত্র পড়েছি বলে তো মনেই পড়ছে না। যাকে বলা হয় ব্যবহার থেকে শব্দের স্থায়ী অর্থ তৈরি হয়ে ওঠা; মজিদ মাহমুদ আমাদের জানালেন, সেই প্রক্রিয়ারই প্রয়োগে অব্যবহার থেকে শব্দের স্থায়ী অর্থ ঘুচে যাওয়া। কতটা ভবিষ্যৎ দৃষ্টি নিয়ে তিনি এখনকার ভাষা-ব্যবহারের ভবিতব্য নির্ণয় করেছেন ও ভাষাতত্ত্বকে এক নতুন জায়গায় এনে ফেলেছেন। আমার মনে হচ্ছিল তখন শব্দ তার বস্তু ও ব্যবহারিক অর্থ হারিয়ে মিথিক শব্দে বদলে যায়। ‘ঢেঁকি গেলা’ এ-প্রবাদে ঢেঁকি আর বস্তু-অর্থনীতির অঙ্গ নয়, মিথিক ব্যবহারবিধির অঙ্গ। মজিদ কি এই বিষয় নিয়ে কিছু লিখেছেন?
৩. তৃতীয় দৃষ্টান্তটি উদ্ধৃতি-আয়ত্ত নয়। ‘রবীন্দ্রনাথের প্রাচ্যচিন্তা ও পারস্যভ্রমণ’ প্রবন্ধটিতে বিস্মিত হয়ে গেছি। মজিদ মাহমুদ ঠাকুর-পরিবারের পিয়ালি সম্পর্ক, তার ফলে বৃহত্তর হিন্দু সমাজের ভিতর তাঁদের বিচ্ছিন্নতা, সেই বিচ্ছিন্নতা থেকে দেবেন্দ্রনাথের সুফি-সহানুভূতি ও হাফিজ প্রীতি, বালক রবীন্দ্রনাথের উপনয়নাস্তিক প্রথম দীর্ঘ ভ্রমণ পশ্চিম হিমালয় পর্যন্ত। মজিদ তাঁর অনুভবের অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা আভাসমাত্র তৈরি করেছেন – পিতা দেবেন্দ্রনাথের হাফিজ মুগ্ধতা, উপনিষদের এক নির্বাচিত অংশ থেকে দেবেন্দ্রনাথের একটা ধর্মাদর্শ তৈরি করে গেল যা প্রচলিত হিন্দু ধর্ম থেকে পৃথক অপৌত্তলিক, অব্রাহ্মণ্যবাদী ও ঈশ্বরকে শত মূর্তিতে বিচ্ছিন্ন না করে তাঁর একক ভাবমূর্তি ধ্যান করা ও সেই ধ্যানকে ব্যক্তিগত উপাসনার মাধ্যমে অনুভব করা। এইখানেই ছিল সুফিভাবনার সঙ্গে রাবীন্দ্রিক কল্পনার মিল।
এই আলোচনায় মজিদ একেবারে অনুচ্চ স্বরে পৃথিবীর প্রতিষ্ঠিত ধর্মচিন্তার দুই মেরুকে মিলিয়েছেন অথচ কোনও সমীকরণ করেন নি। ‘গীতার যে ধর্ম মানুষ মারার বিধান দেয় রবীন্দ্রনাথ ধর্মের সেই বাণীকে উপহাস করতে ছাড়েন নি। খ্রিষ্টান অনুসারী যারা মানুষ মারে রবীন্দ্রনাথ তাদেরকে বিশ্বাস করেন না। খ্রিষ্টান ফৌজ পারস্যে শেখদের গ্রামে নিয়মিত বোমা বর্ষণ করে চলছিল সে সময়ে।
একটি তথ্য মজিদ উদ্ধার করেছেন। ১৯৩২-এর ৮ মে পারস্যে কবি এক জনসভায় ভাষণ দেন। ‘সেই বক্তৃতার মধ্যে ধরা পড়েছে বৃদ্ধ কবির এশিয়া উত্থানের স্বপ্নময় বাণী। পারস্য ভ্রমণ গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় এই অংশটুকু মুদ্রণ থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমাদের ঠিক জানা নেই রবীন্দ্রনাথ কেন এই অংশটুকু গ্রন্থাকারে সংরক্ষণ করেন নি। … এই অংশটি উদ্ধৃত করা প্রয়োজন মনে করছি : ‘এশিয়াকে আজ ভার নিতে হবে মানুষের মধ্যে এই দেবত্বকে সম্পূর্ণ করে তুলতে, কর্মশক্তি ও ধর্মশক্তিকে এক করে দিয়ে। অতীতকালে এক এশিয়ায় সৃষ্টির যুগপ্রবণ (?) শক্তিতে দেখা দিয়েছিল। তখন পারস্য, ভারত, চীন নিজ নিজ জ্যোতিতে দীপ্যমান হয়ে একটি সন্মিলিত মহাদেশীয় সভ্যতার বিস্তার করেছিল। তখন এশিয়ায় মহতী বাণীর উদ্ভব হয়েছিল এবং মহতী কীর্তির। তখন মাঝে মাঝে এশিয়ার চিত্তে যেন কোটালের বান ডেকে এসেছে, তখন তার বিদ্যার ঐশ্বর্য বহু বাধা অতিক্রম করে বহুকাল ধরে বহু দেশে পরিব্যাপ্ত হয়েছে। তারপর এসেছে দুর্দিন। ঐশ্বর্য বিনিময়ের বাণিজ্যপথ ক্রমে লুপ্ত হয়ে এল। যুদ্ধে দুর্ভিক্ষে বিশ্বনাশা বর্বরতার নিষ্ঠুর আক্রমণে এশিয়ায় মহাদেশীয় বন্ধন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তারপর আর এশিয়াকে মানবিক মহাদেশ বলতে পারি নে ক্স আজ এ কেবল ভৌগোলিক মহাদেশ।’
মজিদ-উদ্ধৃত এই অংশটি কিন্তু ‘বিশ্বভারতী’ প্রকাশিত রচনাবলীর ২২ খন্ডের গ্রন্থ পরিচয়ে আর তার পরে ১৩৭০-এর ‘পারস্য যাত্রী’তে পুলিন বিহারী সেন কর্তৃক সংকলিত হয়। বর্জিত অংশের এই পাঠোদ্ধারে পান্ডুলিপির বর্জিত অংশও সংকলিত হয়। এইসব তথ্যই শঙ্খ ঘোষ পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’র ২০০১-এর সংস্করণের ১৬শ খন্ডে, গ্রন্থ পরিচয়ে একত্রিত করে দিয়েছেন। মজিদ-উদ্ধৃত অংশটি একটি বৃহত্তর বর্জনের ছোট অংশ।
কিন্তু তাতে মজিদ মাহমুদ-এর প্রধান জিজ্ঞাসার প্রাসঙ্গিকতা একটুও কমে না, বরং বাড়ে। বর্জিত অংশগুলি পড়লে বোঝা যায় – রবীন্দ্রনাথ এশীয় উত্থানের ধারণা থেকে সরে আসছিলেন। তেমন সরে আসার কারণ ছিল – পারস্য ভ্রমণের পর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি ঘনিয়ে আসছিল আর সে-যুদ্ধে পশ্চিম এশিয়ার তেল ছিল এক প্রধান নিয়ন্ত্রক উপাদান। তাই পশ্চিম এশিয়া নিয়ে ইয়োরোপের প্রধান শক্তিগুলির মধ্যে প্রাকযুদ্ধ যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
মজিদ একটি আলাদা প্রবন্ধে এইমে সিজায়ের-এর সৃজনকে উপলক্ষ্য করে উত্তর-ঔপনিবেশিকতা নিয়ে অনেক নতুন কথা তুলেছেন। সেই কথাগুলি নিয়ে তাঁর সঙ্গে অনেক কথা জমা হয়ে থাকল। এমন চিন্তাসখা তো কত কথা উস্কে দেন। কবে দেখা হবে যে অনন্ত আড্ডার অবকাশ নিয়ে?



