বাংলা কবিতায় এক অনিবার্য নাম


পাবনায় যে অনুষ্ঠান হচ্ছে সে অনুষ্ঠানের সম্মানিত সভাপতি, অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলাদেশের কবিবৃন্দের একাংশ, অনুষ্ঠানে উপস্থিত এই পাবনা শহরের একাংশ; সবাই হয়তো এখন এখানে উপস্থিত নেই, থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু যাঁরা আছেন তাদের মধ্যে আমি দেখতে পাচ্ছি কবির শিক্ষকবৃন্দ, আছেন কিংবদন্তি প্রতীম নাম নরেশ মৈত্র। কবির সমসাময়িক কবিদের অনেকেই এখানে আছেন; অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গ অর্থাৎ বাংলা ভাষার আরেক অঞ্চল থেকে দু’জন সংস্কৃতিমনা মানুষ এসেছেন।
একজন একেবারেই পরিপূর্ণ কবি। আপনারা তাঁকে চেনেন, অনেকেই তাঁকে চেনেন। আমি তাঁকে এখানে পেয়ে চিনতে শুরু করেছি। মজিদ মাহমুদকে আপনারা পঞ্চাশ বছর পরে চিনলেন বোধহয়। এটাই কি সত্যি? আজকে শুরুতে শুধু এ কথাগুলোই আমার মনে হয়েছে যে, যে মজিদকে আপনারা চেনেন ১৯৬৬ সালে জন্মগ্রহণ করা, যে মজিদকে বালক হিসাবে আপনারা চিনতেন, শিশু হিসেবে চেনেন, ভাল ছাত্র হিসেবে চেনেন, অনেক কিছু হিসেবে চেনেন। কিন্তু মজিদ যে একজন কবি, হাজার বছরের বাংলাভাষা বিবর্তিত হয়েছে যে কবিতার হাত ধরে- ভুসুকুপা -কাহ্নপা থেকে শুরু করে কবি মজিদ মাহমুদ পর্যন্ত সবাই এ কবিতা লিখেছেন; বাংলা কবিতার হাজার বছরের এই ধারায় একটি অনিবার্য নাম, যে মজিদ মাহমুদ পঞ্চাশ বছর পার হওয়ার আগে আপনারা কি তাঁকে সেভাবে চিনতেন ?
প্রশ্ন এই, আমরা কয়েক বছর ধরে, দুই দশক ধরে, তিন দশক ধরে, চার দশক ধরে মজিদের সাথে পাশাপাশি জীবনযাপন করছি, কই তাঁকে তো আমি চিনতে পারিনি! চেনা না-চেনার এই যে দূরত্ব এটাই মানুষকে আলাদা করে রাখে। চিনতে পারার জন্য যে বিষযগুলো লাগে সে বিষয়গুলো কি? সে বিষয়গুলি সম্পর্কে আমার পাশেই একজন বিজ্ঞজন আগে বলে গেছেন। তিনি বাল্যকাল থেকে পাঠ করছেন। ‘ইকরা’ পাঠ কর। বলেছেন গ্রষ্টা ‘ইকরা’ পাঠ কর। এই কথা বলেছেন গ্রষ্টা, আমরা কি মজিদকে পাঠ করেছি? আমি কি মজিদকে পাঠ করেছি? মজিদ কি আমাকে পাঠ করেছে? নিজের কাছে প্রশ্ন করলেই আমরা ভাল করে বুঝবো। এই রচনার সাথে আপনারা পরিচিতি পেয়ে যাবেন, যখন পরিচিতি ঘটে যাবে তখন আপনি তাঁর খোঁজ নিতে যাবেন। যখন অপরিচয়ের দূরত্ব থাকবে তখন তা হবে না। আমি লক্ষ্য করেছি ১৯৯৫ সাল থেকে যখন মজিদ মাহমুদ বাংলা একাডেমিতে তরুণ লেখক প্রকল্পে প্রথম ব্যাচে একজন ছাত্র-কবি হিসেবে, শিক্ষার্থী-কবি হিসেবে অংশগ্রহণ করলেন তখন তাঁর প্রথম দিকের কিছু রচনা আমি পড়ি, আমি চমকে উঠে বললাম – এই একজন কবি আসলেন যাঁকে হাততালি দেওয়া যায়, এই একজন কবি আসলেন যিনি আমাকে ভাবাতে পারেন, এই একজন কবি আসলেন যিনি কথা বলতে পারেন, এই একজন কবি আসলেন যিনি কবিতায় নতুন বাক্য রচনা করতে পারেন, এই একজন কবি আসলেন যিনি কবিতার নতুন উপমা তৈরি করতে পারেন, এই একজন কবি আসলেন যিনি কবিতার নতুন একটি রূপক তৈরি করতে পারেন। তাঁর কবিতা পড়ি এবং শেষ করতে বাধ্য হই, মনের মধ্যে এমন একটি অপরূপ গুঞ্জন ওঠে, যে গুঞ্জন আমাকে বলে এই সেই কবি, যাঁর কণ্ঠস্বরের ভিন্নতা আছে, যাঁর বিষয়ের ভিন্নতা আছে, যে একান্ত নিজের মতো, যার কবিতা অন্য কারো মতো নয়। আপনারা বিশ্বাস করেন তাঁর কবিতা বিশ্ব সাহিত্যেরও কারও অনুকরণ নয়, আপনারা জানেন বিশ্বসাহিত্য কিঞ্চিৎ পাঠ করেছি। কিন্তু তাঁর কবিতা এত যে কবিতাময়, এত যে ধ্বনিময়, এত যে অর্থময়, এত যে দ্যোতনাময় এটা আমরা বিশ্বাস করতে পারিনি। ‘মাহফুজা’ অতি সহজ সরল একটি নাম। এই বাংলাদেশে সর্বত্র তাঁকে পাওয়া যায়, কিন্তু মজিদ যে মাহফুজাকে তৈরি করেন তখন যে আমাদের সকলের ভেতরে চির বসবাসরতা এক মাহফুজা। ‘মাহফুজা’এমন কোন ব্যাপার নয়; কিন্তু তাঁর মাহফুজা একটি নৃত্য, এটি একটি দর্পণ, এটি একটি প্রিজম; যে প্রিজমের ভেতরে আপনি যা কিছু দেখতে চান তা দেখতে পাবেন। পৃথিবীর সব বড় কবি এ কাজটি করে থাকেন। যে কারণে যে কবিতার ভেতর এই ভিজটি থাকে, সে কবিতা বারবার পঠিত হয়। যে কারণে আমি দেখেছি হাজার বছর ধরে সে কবিতাগুলো আমরা এখন পর্যন্ত পড়ি, যে কবিতাগুলো আমরা পাঠযোগ্য মনে করি। আমার কেন জানি মনে হয়, আমাদের সময়কালে এই পঞ্চাশ বয়সী, মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়স – এই বয়সী কবি এই যে প্রিজম কবিতার আর্টিক্যাল তৈরি করলেন – এটি যুগ যুগ ধরে বালা কবিতায় টিকে থাকবে এবং বাংলা কবিতা থেকে এটি বিশ্ব কবিতায়ও চলে যেতে পারে। কাজেই আমার বন্ধু হাবিবুল্লাহ সিরাজী যেটি বলেছে, সে কথাটি অত্যন্ত সত্যি, পাবনায় তাঁকে পাগলা গারদে বন্দি করে রাখবেন না, তাঁকে সারা বাংলাদেশের পাগলা গারদে ছেড়ে দিন; তিনি এখন বিশ্ব পাগল-কবিতে পরিণত হচ্ছেন। কবিরা এক ধরনের পাগল, এক ধরনের ইমোশনাল, তাঁরা সত্যি কথা বলে। তাঁরা যা ভাল মনে করে তাই বলে। ফলে একজন ভাল মানুষ না হলে একজন পাগল মানুষ হওয়া যায় না, একজন পাগল মানুষ না হলে ভাল মানুষ হওয়া যায় না। যাঁরা ভালো কবি, ভালো মানুষ তাঁরা সবাই পাগল, সেই ধরনের পাগল আপনাদের সুবেশধারী এই পঞ্চাশ বছর বয়স্ক শিশু মজিদ মাহমুদ।

কবি মজিদ মাহমুদ


মজিদ মাহমুদ আমার কাছে কোন বিস্ময় নয়। আগেও তাঁকে আমি এ কথা বলেছি। কারণ মজিদ মাহমুদের সাথে যখনই তর্ক করতে গেছি, দেখুন আজকেও এখানে আসার পথে, আমি যা বলি, কিছুক্ষণ পর মজিদ মাহমুদ পেছন থেকে তাঁর বিরোধিতা করতে শুরু করে দেয়। পৃথিবীতে জ্ঞান এবং তত্ত্ব এভাবেই এগিয়ে যায়। এটাকেই আমরা বলি দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। মজিদ আজকে বলতে পারে যে, আপনি যা বলেছেন আমি হয়তো তাই বলতাম, যেহেতু আপনি তা বলেছেন বলে আমি তার বিপরীত বললাম। আপনি যদি অন্য কথা বলতেন আমি তারও বিরোধিতা করতাম। জ্ঞান ও গবেষণার পথ এভাবেই এগোয়। আমরা অতীতে যে সব নিয়ম দেখতে পাই, অতীতে যে কবিতা পাঠ করি,সেই কবিতা যদি আমরা মেনে নিই তাহলে কবিতা আর এগোবে না। কবিতাকে যদি এগোতে হয়, তবে রবীন্দ্রনাথকে আত্ম¯’ করতে হবে, গ্রাস করতে হবে; তারপর ছুঁড়ে ফেলতে হবে। ছুঁড়ে ফেলবো এজন্য নয়, তাকে ফেলে দেওয়ার জন্য নয়, তাকে নতুন করে রচনা করার জন্য এবং এজন্য যথার্থভাবে আপনারা অনেকেই বলেছেন, মজিদ কি করেছে। মজিদ আধুনিক কবি, নাকি উত্তর – আধুনিক কবি এটা কোনও ব্যাপার নয়। এই নিয়ে অনেক তর্ক আছে। এই নিয়ে আমি দীর্ঘক্ষণ বলতে পারি। আমি শুধু বলবো, মজিদ মাহমুদ সময়কে হালফিল করার কবি। অর্থাৎ ‘হি নোজ হাউ টু আপডেট হিজ টাইম’। এই সময়ে কি কবিতা কোন ভাষায় বলতে হবে এটি মজিদ মাহমুদ জানে।
মজিদ মাহমুদের পঞ্চাশ বছর বয়স হয়ে গেছে, আপনারা আজকে স্বীকার করলেন, এটা আপনাদের যেমন সৌভাগ্য তেমনি মজিদের সৌভাগ্য পঞ্চাশ বছরের সুন্দর মুহূর্তটি আজ ৫০ তম জন্মদিন, ৫০ তম জন্মবর্ষ আজকে কিন্তু নয়। তাঁকে আপনারা সনাক্ত করলেন, মানুষকে সনাক্ত করতে পারা একটি বড় সমস্যা আমাদের সমাজে। কবিকে সনাক্ত করতে পারা আরও বড় সমস্যা। আপনারা সনাক্ত করেছেন। যেহেতু সনাক্ত করেছেন আজ থেকে আপনাদের দায়িত্ব হলো তাঁকে পাঠ করা। তাঁর ১০-১১টি কাব্যগ্রন্থ যদি আপনারা পাঠ করেন তবে আমার অনেক কথা আপনারা ভেরিফাই করতে পারবেন। আমার অনেক কথা শুনে একমত হতে পারবেন। তাতে কিছু এসে যায় না। আপনি আপনার মতো করে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করবেন। মজিদ মাহমুদকে বাংলাদেশ, আমি বলি ঢাকা সহ বেশ আগে থেকে পাঠ করেছে বলে তাঁর প্রতি অনেকেরই ঈর্ষা আছে। তাঁর প্রতি অনেকের শত্রুতা আছে। এটি এক ধরনের কাব্যিক শত্রুতা। এই শত্রুতা নেতিবাচক নয়, এটি ইতিবাচক। আমি তো আগেই বলেছি আমি আগের কবিদের ভয় পেতাম ওই সময়। কিন্তু এখন পাই না, কারণ যারা মারা গেছেন তাঁরা আর কি করবেন ! রবীন্দ্রনাথ আর নতুন করে কি লিখবেন, যা লিখেছেন তাই। আমার থেকে ভাল লিখেছেন, আমি তাঁর মতো আর ভাল লিখতে পারব না, আমি তো জেনেই গেছি। কিন্তু আমি যদি দেখি একজন নতুন কবি উঠে এসে আমাকে ছাড়িয়ে যেতে চায়, তখন তো আমার খারাপ লাগবে। সে আমার ছাত্র হোক, সে তরুণ লেখক প্রকল্পে আমার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছে, ‘সো হোয়াট’ – তাতে কি? তখন ওই শিক্ষকের মত বলতে ইচ্ছে করে যদি আমারই কাছে শিক্ষা গ্রহণ করা একজন কবি আমাকে শেখাতে পারে, সে যদি আমার শিক্ষক হয়ে ওঠে, তাহলে আমি তাঁকে নমস্য বলে মনে করি। মজিদ মাহমুদ সেই তেমনই একজন কবি।
কবিদের আমরা অনেক সময় পুরস্কার দিই, যেমন এই মুহূর্তে হাবিবুল্লাহ সিরাজী বললেন যিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত। তাঁকে আপনারা বলেননি একুশ পদকপ্রাপ্ত কবি। আপনারা হয়তো জানেন না তাঁর নাম ও আমার নাম একইভাবে এবার প্রস্তাবিত হয়েছে। যে কোন কারণে এবার সে মিস করেছে। আগামী বছরে বা দুই-তিন বছরের মধ্যে যদি পেয়ে যায় তাহলে কি হবে? আপনারা হয়তো জানেন না, মজিদ মাহমুদ এ বছর বাংলা একাডেমির পুরস্কারের জন্য অনেকগুলো নমিনেশন পেয়েছিলেন। আমি নিজেই তাঁর নমিনেশন্ দিয়েছি। মজিদ মাহমুদ সেই পুরস্কার পায়নি। পুরস্কার পেতে হলে যে সমস্ত কাঠ-খড় পোড়াতে হয়, মজিদ মাহমুদ একদিন যে বাংলা একাডেমির পুরস্কার পাবে এ সম্পর্কে আমি শতভাগ নিশ্চিত। এটি আগামী বছর হতে পারে, তাঁর পরের বছর হতে পারে, তাঁর পরের বছরও হতে পারে। তবে পাঁচ বছরের বেশি সময় নেবে বলে আমার মনে হয় না; যদি আমাদের সমালোচক সত্তা এবং বিবেক সত্তাকে আমরা ঠিক রাখি। বাংলা সাহিত্যে এমনও অনেক কবি আছেন যারা অনেক পুরস্কার মিস করেছেন। আবার কেউ কেউ আছেন বড় বড় পুরস্কার পেয়েছেন। এই পুরস্কার দিয়ে না মেপে বরং তাদেরকে তিরস্কার দিয়ে মাপুন। যে কবিরা গড়ে ওঠার শুরুতে অধিক বেশি নিগৃহীত হয়েছে, অধিক বেশি পরিত্যাজ্য হয়েছে, মনে রাখতে হবে তাঁরাই শক্তিমান কবি। সেই ধরনের শক্তিমান কবি একজন হচ্ছেন আমাদের মজিদ মাহমুদ
এই মজিদ মাহমুদ কিছু কিছু পুরস্কার যে লাভ করেননি এমন নয়। পশ্চিমবঙ্গে মজিদ মাহমুদ যতটা পরিচিত, বাংলাদেশে ততটা পরিচিত কিনা সন্দেহ। আমি বলি বাংলাদেশে তাঁর চেয়ে বেশি পরিচিত, কিন্তু তাঁকে অপরিচিত দূরত্বে রাখাটাই কেউ কেউ আমরা ভাল মনে করি। তাঁরা বলে এই মজিদ মাহমুদকে দূরে সরিয়ে রাখবো। এটাই সাহিত্যের ট্যাকটিক্স। আপনি রবীন্দ্রনাথকে জানেন। রবীন্দ্রনাথ জীবনের প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্তকে অস্বীকার করেছেন। সে হলো জানা শত্রু। দেখুন, তারপর যখন তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়ে গেলেন, তাঁর আসন যখন অটল হয়ে গেল, তখন আবার সবিনয়ে তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং বললেন, মাইকেল আমাদের আদি কবি, মাইকেল আমাদের আদি আধুনিক কবি। মাইকেলকে আমি দেখিনি, পুরাণের সেই নবায়ন দেখেছি আমরা কিন্তু অতটা নবায়ন আর দেখিনি। ফলে মাইকেল পুরস্কার পাননি এটি বড় কথা নয়, কিন্তু মাইকেল না হলে বাংলা ভাষা এখনও কত দূবত্বে থাকতো আমরা জানি না। যাঁরা বাংলা ভাষায় সঠিক কাজ করছেন, যারা কবিতার জন্য বাদ পড়ছেন তাঁদের দিকে তাকাতে হবে। ভাল লাগছে মজিদ মাহমুদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এখান থেকে শুরু হলো। এবছর পঞ্চাশ বছরের ঘটা চলবে। সারা বছর ধরে বিভিন্ন জায়গায় কোন আলোচনা- অনুষ্ঠান ইত্যাদি হবে। তিনি স্বীকৃত হবেন। জন্ম নিয়েছেন আশির দশকের কবি হিসেবে। তাতে কিছু এসে যায় না। একজন কবির জন্য আপনারা অনেকেই জানেন সময় খুব বড় ব্যাপার নয়। অনেকে মনে করেন যে তিনি একশো বছর বাঁচুন। আমি মনে করি না। মজিদ মাহমুদ কত বছর বাঁচবে, আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি। এটা আল্লাহ্র ব্যাপার। তিনি যতদিন তাঁকে বাঁচাবেন ততদিন বাঁচবেন। তারপর আমি শুধু এটুকু বলব তিনি যা লিখবেন, তাঁর লেখার আয়ু যেন চিরায়ু হয়, সেটি একশো বছর হোক, হাজার বছর হোক; বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, বাংলা কবিতা যতদিন থাকবে ততদিন যেন আমরা মনে করি ঐ ধরনের পংক্তি আমরা উচ্চারণ করতে চাই।
এই মাহফুজা’র ভিতর কে থেকে যাচ্ছে, স্মৃতি চির বিস্ময়টাই থেকে যাচ্ছে। মাহফুজা’র ভিতর স্বয়ং আমিই থেকে যাচ্ছি। কোরাণ শরীফ বলে আমার ভিতর আল্লাহ্ তায়ালা আছেন। কাজেই তিনি নিজেই থেকে যাচ্ছেন। কাজেই মাহফুজা’র ভূত -নজরে নিজেকে আস্তিক কবি হিসেবে প্রমাণ করেছেন। আমি মনে করি পৃথিবীতে নাস্তিক কবিতা বলে কিছু নেই। যারা নাস্তিক তাঁরা মনে করে সব কিছুই স্বয়ং হয়ে গেছে। স্বয়ংভাবে এসেছে। আল্লাহ্ তায়ালা স্বয়ং কোরাণ বিশ্লেষক। সেই আল্লাহ তায়ালা আমার ভিতরেই আছেন। ‘মাহফুজা’ ও মজিদ, আদম ও হাওয়া, প্লাস এবং মাইনাস দুটি মিলে সৃষ্টির যে যৌগিক অগ্রগমন, সেই অগ্রগমনই সৃষ্টির তত্ত্ব।
মজিদ নিজেই স্বীকার করেছেন, মজিদ তাঁর সহকামী ‘মাহফুজা’কে স্বীকার করেছেন। এটাই চরম সত্য। এই যোগফল আমাদের যোগফল; বাংলাদেশে এই মুহুর্তে আমি মনে করি মানুষে মানুষে যে যোগফল, বিরুদ্ধ মতবাদে বিরুদ্ধ মতবাদের সে যোগফল। একটি সমন্বয় মতবাদ পাড়াটার মধ্যে আমাদের ঐক্য, আমাদের শান্তি। মাহফুজামঙ্গলের ভিতর এই ঐক্যের কথা আছে। কাজেই আমি তাঁকে বলবো, আপনারা সমকালীন যে সংকট মোকাবিলা করছেন সেই সংকটের সমাধানকল্পে একটি রূপক সে তৈরি করে দিয়েছে। যে রূপকের নাম ‘মাহফুজা’। সেই সমাধানের নাম মজিদ যোগ মাহফুজা। মানুষে মানুষে মিলন। আরও কিছু কথা বলার ইচ্ছে ছিল। আর বলব না। অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমি পরিশেষে এই কথাই বলবো তাঁর জন্য দোয়া করবেন যেন যতদিন তিনি লিখতে পারেন যেমনভাবে লিখছেন তেমনভাবে লিখতে পারেন। তাঁর কলম যেন শক্তিহীন না হয়।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা

লেখক : সমকালীন বাংলা কবিতার বহুমুখী কণ্ঠস্বর, জাতিসত্তা অনুসন্ধিৎসু, বাংলা একাডেমি, একুশে ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত, নজরুল ইন্সটিটিউটের সাবেক নির্বাহী পরিচালক। (উপরোক্ত লেখাটি কবির ৫০ বছর পদার্পন অনুষ্ঠান উপলক্ষে উপস্থাপিত অভিভাষণ)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *