মজিদ মাহমুদ-এর কবিতা নিয়ে এই যে আমার গ্রন্থসমীক্ষা, যার শিরোনাম আমি নির্বাচন করেছি তাঁর সাম্প্রতিকতম ‘কাটাপড়া মানুষ’ থেকে, পংক্তিটিকে এ-বইয়ের পক্ষে সবচেয়ে উন্মোচক ও নির্ধারক বলেই আমি বিবেচনা করি। ভিন্ন মত থাকতেই পারে, তার পাশে এ আমার একান্ত ব্যক্তিগত এক অভিমত। নিছক সরল সাদামাটা আটপৌরে এক বিবৃতি, কিন্তু ভেতর-ব্যঞ্জনা নিয়ে যেন প্রচ্ছন্ন থেকে যায় আরও অনেক অর্থবহ কথা : কবি সর্বত্রচারী হতে চান, ছুঁয়ে দেখতে চান যে-কোনও বিষয়ভাবনাকে, ঋদ্ধ হতে চান কবিতার বিশাল সাম্রাজ্যকে উচ্চারণের পরতে-পরতে অন্তর্ভূক্ত করার অবকাশে, এবং পাঠককেও নিয়ে যেতে চান যেখানে যেমন খুশি নিজের হাত ধরে। ‘কবিতা” নামে এই উদ্বোধক নিবেদনটিই বোধহয় সবচেয়ে জরুরি ও অনিবার্য ছিল এই বইটির পক্ষে। চমকে দেওয়ার মত এর প্রাথমিক কয়েকটি ছত্র পেশ করা যাক : কবিতাকে কবিতা হতে দেখলেই আমি বিরক্ত হই
কবিতা কবিতার মতো হলে আর পড়তে ইচ্ছে করে না
মনে হয় সাজানো গোছানো
মনে হয় কেউ লিখতে চেয়েছিল
মনে হয় বিয়ের আগে পার্লারে গিয়ে সেজেছে অনেক
এসব সাজাটাজা তো একদিনের ব্যাপার
সবাইকে দেখানোর জন্য, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়ার জন্য
এই ক’টি নির্ভার গদ্যময় লাইনের সূত্রেই আমরা বুঝে নিতে চাই যে মজিদ মাহমুদ সেই গোত্রের কবি যিনি কবিতাকে বাড়তি পোশাক পরাতে চান না, চান না অকারণ অলংকারে তাকে সজ্জিত করতে, কবিতার কৃত্রিম লাবণ্যেও তাঁর আস্থা নেই
কতামাত্র। এ বইয়ের যাবতীয় পাঠযোগ্য কবিতার মধ্যে এ-অপর্যাপ্ত বিশ্বাস তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন আমাদের জন্য, আমরা জেনে স্বস্তি বোধ করেছি যে তাঁর প্রত্যয় ও প্রয়োগের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই, ব্যবধান নেই, দূরত্ব নেই সামান্যতমও।
কবিতাকে সঙ্গী করে সময় থেকে সময়ান্তরে অনেকটা পথ হাঁটতে হয়েছে আমাদের, উৎকর্ত হয়ে শুনেছি বিভিন্নজনের কবিতাভাবনার কথা এবং সমৃদ্ধ হয়েছি একেকজনের একেকটা কবিতার ভাষা ও ভাষ্যের সৌজন্যে। ‘কাটাপড়া মানুষ’-এ এমন বেশ কিছু কবিতা তিনি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন যা থেকে আমরা আশ্বস্ত হতে পারি এটা ভেবে যে মজিদ মাহমুদ নতুন কথা নিজস্ব ভঙ্গিতে বলে উঠতে চাইছেন, অগাধ সাহস তাঁর অবলম্বন, সেই সঙ্গে স্পষ্ট ভাষণেও তিনি অনায়াস, সাবলীল ও দ্বিধাহীন :
১. এখনো যারা কবিতা লিখছেন –
তারা বাজারের ফর্দ লিখছেন, পুলিশের বিধিমালা লিখছেন
শেয়ালের হুক্কাহুয়া লিখছেন, জঙ্গিদের ইশতেহার লিখছেন
ইন্দো-মার্কিন ভিসা খুঁজছেন, মক্কায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন
আর যারা অর্থের আড়ালে অন্ধকার কক্ষে কবিতায় রয়েছেন জারি
তৈয়ার করছেন নশ্বর দেহের অবিনশ্বর মমি!
– কাটাপড়া মানুষ
২. চাষির কাজ চাষ, বিক্রেতার বিক্রি
আমিও কবিতার চাষি, নেই অন্য দক্ষতা
রোদ-বৃষ্টি-শীত-গ্রীষ্মে করি কবিতার চাষ
শব্দের সঙ্গে শব্দ যোজনা করি –
- আমার কবিতা
৩. এবার এসেছে শব্দ-বদলের দিন
কবিতাকে বদলাতে চাইলে আগে শব্দকে বদলাতে হবে
শব্দ বদলালে কবি বদলাবে, কবি বদলালে পাঠক
-একজন স্বৈরাচারি কবির উক্তি
৪. কবিরা আমলা হিসাবে ভালো
না আমলারা কবি, এই তর্ক অক্ষমের রসিকতা
আমার বরং রয়েছে একটি সাধু প্রস্তাবনা
কবিদের জন্য চাই একটি সম্পূর্ণ দপ্তর
সরকারি বেসরকারি কবিদের তালিকা প্রকাশ
কবিদের জন্য যদিও রয়েছে দুঃস্থভাতা
প্লট বরাদ্দের কাজও গোপনে হয়ে থাকে বেশ
তবু কবিদের প্রকাশ্য পরিষেবা
কবিতাকে বহুদুর নিয়ে যেতে পারে!
- কতিপয় আমলা ও হাজারী মশাই
কবিতার শরীরে উচ্চারণের প্রেক্ষিতে নতুন কিছু কথা শোনার জন্য আমাদের একটা প্রতীক্ষা তো থাকেই, আমরা উদ্গ্রীব থাকি আমাদের উন্মুখতা নিয়ে। আমাদের এই কবি জানেন কবিতা হলো সেই শব্দশিল্প, সময় গড়িয়ে যাওয়ার পর প্রাকৃতিক অনিবার্যতায় যার মধ্যে বদল ঘটানো জরুরি, শব্দ না পাল্টালে কবির বোধও পাল্টাবে না, আর একই অবস্থানে থেকে যাবে পাঠকেরও রুচি-সংস্কৃতি-প্রবণতা। সেই কত যুগ আগে একটা সময়ে কবির সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে মধুসূদনকে বলতে শুনেছিলাম, ‘শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন’,তারপরে গঙ্গায়-পদ্মায় অনেক জল গড়িয়ে গেল; মধুসূদনের কাছে সেটাই ছিল এক সার্থক কবির অভিজ্ঞান। আর আজকের ওপার বাংলার কবি মজিদ মাহমুদকে তাকাতে হচ্ছে ব্যর্থ অক্ষম কবিদের দিকে যারা অদক্ষতায় লিখে চলেছেন বাজারের ফর্ম, পুলিশের হুকুমনামা, কিংবা জঙ্গিদের ইশতেহার। কবিতার এই নৈরাশ্যজনক সাম্প্রতিক পটবদল তাঁকে বিপর্যস্ত করে, বিচলিত করে, বিভ্রান্তও করে নিরন্তর। আর করে বলেই বিতৃষ্ণায় তিনি মাঝে-মাঝেই কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, নির্দ্বিধায় সটান বলে উঠতে পারেন, ‘আমি আর কবিতা লেখায় উৎসাহ পাই না’ (‘কাটাপড়া মানুষ’)।। একই সঙ্গে সদর্থক ভাবনাতেও যুক্ত থাকতে দেখি তাঁকে, যখন তাঁকে বলতে শুনি, ‘কবিতা বহুরূপী / স্থান ও কালভেদে অর্থ হেরফের হয় / তবু কবিতার গূঢ়ার্থ কবির পদবি’ (বিবিধার্থ), কিংবা ‘একটা কবিতার অর্থ অনেক রকম হতে পারে / তারুণ্যে ও বার্ধক্যে তার মূল্যায়ন পাল্টে যেতে পারে। বস লিখলে এক, অধস্তন লিখলে বিপরীত মানে’(ঐ)। সময়সম্মত এই তৃতীয় পক্তির জন্য মজিদকে পাঠক হিসেবে আমার তরফে বাড়তি অভিনন্দন।
অনেক কবিতায় মজিদ মাহমুদ আমাদের অভিজ্ঞতার বৃত্তের বাইরে একটা অচেনা জগতকে যেন নতুন করে চিনিয়ে দিতে চাইছেন, উসকে দিচ্ছেন নতুনতর ভাবনা, যাপিত জীবন থেকে তুলে আনছেন এই মুহূর্তের সময়-সংকট, ঘৃণ্য রাজনীতি, সম্পর্কের বৈষম্য, অমানবিক যুদ্ধের বাতাবরণ, অসহায় প্রাণের আর্তি। এসবই হয়ে উঠতে পারে তাঁর কবিতাশ্রয়ী উচ্চারণের উপজীব্য, তাঁর একান্ত স্বকীয়তার নজির,
১. আজ কেউ সরকারের বিরুদ্ধে কবিতা লিখলে
সে দেশদ্রোহী হবে, কারণ রাজা চলে গেছে অন্য দেশে
এখন কেবল রয়েছে দেশ; দেশদ্রোহীর শাস্তি ভয়াবহ
কোনো কবিই আর তার পাশে দাঁড়াতে পারবে না
কবিদের আগেই স্টিগমা মেরে দেয়া আছে
- গিভ আপ ইয়ুর হাঙ্গার স্ট্রাইক
২. প্রতিদিন প্রাতঃরাশের আগে আমিও
মানুষের ভেতরের মানুষ জাগিয়ে তুলি
যেভাবে একটি কাক কা কা করে ওঠে
বলতে চাই – অসংখ্য পিপীলিকা
একটি বৃহত্তর কামানের চেয়ে বড়
জেগে ওঠো প্রবঞ্চিত প্রেমিকের দল, সম্ভ্রম হারানো বোন
- আমার কবিতা
৩. যুদ্ধ কেবল মারার উৎসব, কাটার উৎসব
যুদ্ধে মানুষ মারার জন্য সজ্জিত হয়,
যে যত বেশি মারবে তার মূল্য তত বেশি
যুদ্ধ ফেরতার থাকে গাল ভরা খেতাব
পোশাকে সজ্জিত থাকে মেডেল
- যুদ্ধ
৪. ক্ষমতা হলো একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যাপার
ক্ষমতা কারো ভাই নয়
পিতা কিংবা সন্তান নয়
ক্ষমতা একটি মডার্ন মেশিন
- রাজা
৫. হত্যাকান্ড দেখলেই আমি তার প্রতিবাদে কবিতা লিখি না
জানি এই হত্যাকান্ডের বিনিময়ে ঘটবে আরেকটি হত্যাকান্ড
এমনকি বর্তমানের হত্যাকান্ডটিও পূর্বের হত্যাকান্ডের ফল
হত্যার প্রতিবাদ মানে আরেকটি হত্যাকান্ড প্ররোচিত করা
হত্যার প্রতিবাদ মানে তাজা শোকের উদ্যাপন
একটি হত্যাকান্ডই পারে আরেকটি হত্যাকান্ডের শোক ভোলাতে
- হত্যাকান্ড
৬, এমনকি যে তোমাকে দুঃখ দিয়েছে
তারও রয়েছে নিজস্ব দুঃখ
প্লাথ ও উলফের দুঃখ অগ্নিজলে নির্বাপিত হয়েছিল
পো ও হেমিংওয়ের দুঃখও তো হয়নি জানা
ট্রামে কাটা দুঃখ, নীরবতার দুঃখও সয়েছেন কবিরা
দুঃখই তো কবির বাড়ি ফেরার পথ
- দুঃখ
আমার এ-সমীক্ষার পাঠক ইতিমধ্যেই হয়ত টের পেয়ে গেছেন যে, মজিদ মাহমুদ মূলত একজন গদ্যপ্রধান কবি, গদ্যই তাঁর ভরসা, গদ্যই তাঁর একান্ত মাধ্যম, তাঁর যাবতীয় উচ্চারণের স্ফুর্তি ও টানা গদ্যের হাত ধরেই। এ-প্রসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্নে আমি রীতিমত তাড়িত হই। শুধুমাত্র গদ্যই হবে কেন একজন কবির একমাত্র আশ্রয়, একপেশে অবলম্বন? চার-ফর্মায় আশ্রিত বইটির কোনও কবিতায় নজর-কাড়া উল্লেখযোগ্য ছন্দ-কবিতার দৃষ্টান্ত প্রাপনীয় হলো না,- এটা একটা ভাবনার বিষয় হয়ে রইলো বই কি! অন্ত্যমিলও সব সময় স্বস্তিদায়ক হতে পারেনি। ঘুরে-ফিরে বলতেই হয়, গদ্যই তাঁর
জোরের জায়গা, কিন্তু যেহেতু গদ্য, আরও মিতবাক হতে পারলে কবি আরও অনেক কবিতাকে সাফল্যের মুখ হয়ত দেখাতে পারতেন। কোনও অভিযোগ নয়, শুধু পাঠক হিসেবেও নয়, এ-বইয়ের একজন দায়িত্বশীল আলোচক হিসেবে এই পর্যবেক্ষণ মুদ্রিত রাখাটা আমার দিক থেকে বোধহয় জরুরীই ছিল। কথাগুলো সদর্থক সমালোচনা ব’লে গ্রাহ্যতা পেলে, খুশি হওয়া যাবে। এ-লেখায় ইতি টানার আগে এ-বইয়েরই আমার প্রিয় একটি কবিতা উপস্থাপন করি, সম্পূর্ণত –
অ্যানাটমি
চারিদিকে এত এত ধর্ষণ ও শিশুহত্যা
আমার প্রেমকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে
এক একটি ঘটনার পর আমি তার থেকে
এক এক মাইল দূরে চলে যাচ্ছি
কোন মুখে দাঁড়াব তার কাছে গিয়ে
জীবন-মোহন করে এতদিন যেসব আলো
আমরা জ্বালিয়ে রেখেছিলাম
আমার হাতের বিস্তার, চুম্বনের গভীরতা
তার ভালোবাসার চিহ্ন হয়ে ছিল
কেউ কি ভেবেছিলাম –
এই হাত কামুকের, ধর্ষকের, মৈথুনকামীর
আজ আমাদের পবিত্র ইচ্ছেগুলো
কামনার পঙ্কিলে নিমজ্জিত-
কেবল ক্ষরণের পাত্র হয়ে আছে
অথচ এই শরীর ছিল একদিন
দেহের ভেতরে দেহাতীতের গান
যে সব কন্যা শুয়ে আছে পিতাদের বুকের ভেতর
যে সব বোন জেগে উঠছে ভ্রাতার আদরে
ভোরের দৈনিকগুলো তারা আজ কোথায় লুকাবে
যে শরীর ছিল মানুষের মায়া ও সম্পর্কের পরিচয়
সেই শরীর আজ কেবল অ্যানাটমির বিষয়
এ এক ছন্নছাড়া মূল্যবোধবর্জিত পরিত্রাণহীন সময়ের পান্ডুলিপি, যেখানে মায়া নেই, মোহ নেই, মুগ্ধতা নেই। ভালোবাসার সংজ্ঞায় শুধু ভাঙন আর ভাঙন, বিপর্যস্ত সম্পর্কের ভিত। এখানে ছন্দ ছিল অবশ্যই ব্রাত্য; এ-কবিতার অবধারিত অবলম্বন ছিল ওই গদ্যই, আর সে-গদ্যের জাতটাই এখানে চিনিয়ে দিয়েছেন মজিদ মাহমুদ। তাঁর আগামী কবিখ্যাতির জন্য রইলো আমাদের ঐকান্তিক শুভেচ্ছা, প্রত্যাশা ও ভালোবাসা।



