ঐতিহ্যের পুনর্জন্ম : মজিদ মাহমুদের কবিতা


কবিতা জীবনের সঙ্গে নানারকমের রোমাঞ্চকর অনুষঙ্গ জড়িয়ে পড়ে আপনা থেকেই। যেসব হয়তো একান্তই ব্যক্তিগত, কোনও কোনও সময় তার প্রকাশ জরুরি হয়ে ওঠে। কবি মজিদ মাহমুদ-এর কবিতা প্রসঙ্গ ভাবতে গিয়ে এমনই একটি রোমাঞ্চকর অনুষঙ্গ মাথায় এসে যাচ্ছে। এখন থেকে প্রায় আঠাশ বছর আগে প্রকাশিত (১৯৮৯) কবির প্রথম কবিতাগ্রন্থটির নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। পরবর্তী গ্রন্থগুলি ‘গোষ্ঠের দিকে’ (১৯৯৬), ‘বল উপাখ্যান’ (২০০১), ‘আপেল কাহিনি’ (২০০২) ইত্যাদি পেরিয়ে এসে আপাতত তিনি ‘দিওয়ান-ই-মজিদ’(২০১০)এ এসে থমকে দাঁড়িয়েছেন। মজার বিষয় হল এই, বাংলা ভাষার কবিতা পাঠকের কাছে তিনি ‘মাহফুজামঙ্গল’এর কবি হিসেবেই বিশেষভাবে সমাদৃত। ইতিমধ্যেই গ্রন্থটির পাঁচটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, কবিতা গ্রন্থটির পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিশিষ্ট কবি এবং চিন্তাবিদদের রচনায় সমৃদ্ধ একটি গদ্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে ‘মজিদ মাহমুদ-এর মাহফুজামঙ্গল পঁচিশ বছরের পাঠ’ এই শিরোনামে (২০১৪)। সেখানে সম্পাদনা পর্ষদ-এর পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে : ’ … গ্রন্থটি নানা কারণে বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাজনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে। বিশেষত ঔপনিবেশিক কালপর্বে বাংলা সাহিত্যের যেসব সম্ভারকে আমরা পর করে দিয়েছিলাম, মজিদ মাহমুদ এই গ্রন্থের মাধ্যমে তার পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন। তবে তিনি মোটেও মধ্যযুগের কবিতা লিখতে চাননি; সাহিত্যের পরিচয়সূত্রে আমরা যা হারিয়ে ফেলেছিলাম, তিনি তার ব্যবহার উপযোগিতায় তা পুনরায় দেখিয়ে দিয়েছেন। আমরা যখনই আধুনিক সাহিত্যের কথা বলি, তখনই আমাদের পূর্বসূরি সাহিত্যিকগণ কালচেতনার দোহাই দিয়ে বাইরে থেকে যান, মজিদ মাহমুদ এই কাব্যে সেই ব্যবধান অনেকখানি ঘুচিয়ে দিয়েছেন। এখন মুকুন্দরাম, বিজয়গুপ্ত ও ভাবতচন্দ্রকে আমাদের আর পর বলে মনে হয় না। … আমার তো মনে হয় কথাগুলি সর্বাংশে সঠিক। পাঠক অবগতির জন্যে আমি কিছু পংক্তি সামনে টেনে আনছি।
(ক)
মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়
(এবাদত)

(খ) সুউচ্চ পর্বতের শিখর থেকে গড়িয়ে পড়ার আগে
তুমি পাদদেশে নদী বিছিয়ে দিয়েছিলে মাহফুজা
আজ সবাই শুনছে সেই জলপ্রপাতের শব্দ
নদীর তীর ঘেঁষে জেগে উঠছে অসংখ্য বসতি
ডিমের ভেতর থেকে চঞ্চুতে কষ্ট নিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে
কিন্তু কেউ দেখছে না পানির নিচে বিছিয়ে দেয়া
তোমার কোমল করতল আমাকে মাছের মতো
ভাসিয়ে রেখেছে
(নদী)

(গ) গোরস্তানের কঙ্কালে তুমি ফুঁ দিয়ে বাজিয়ে দাও রাত্রির শিস
একটু জেগে আমি আবার ঘুমিয়ে পড়ি পরিচিত লাশের ভেতর
তোমার বামহাতের অন্ধকারে সূরে‌্যর লণ্ঠন
ডান হাতের শূন্যতায় আমাদের নাড়াতে থাকো
(কঙ্কালের শিস)

(ঘ) প্রভু তোমার ফেরেশতাদের কিছুদিন ছুটি দাও
মাহফুজার সাথে এবার আমি ঘুরতে যাব
আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে
আর কাউকে থাকতে দিও না
যদিও ফেরেশতারা নলৈঙ্গিক, যদিও বন্ধুভাবাপন্ন
তবু আমাদের শরীরের উত্থান ওদের বিব্রত করে

(ঙ)
এক বুড়ো ফেরেশতা আমাকে জাগিয়ে তুলে
তোমার দুই কাঁধে বসিয়ে দিয়েছিল
তুমি আমাকে দেখতে পাও না, আমিও
তবু দুহাতে লিখে চলেছি তোমার আমলনামা

আমার এই লেখক জীবনের পাণ্ডুলিপি তোমাকে জানাতে
একটা কেয়ামত লেগে যাবে
(কেয়ামত)

এবং শেষপর্যন্ত কবির চূড়ান্ত ভাষ্য:
তুমি আজ বিধ্বস্ত একাকী দাঁড়িয়ে আছ সমর প্রান্তরে
আমি হৃতসর্বস্ব ভিক্ষুকের বেশে-
তুমি ছিলে একদিন দিগি¦জয়ী মহারানী ভিক্টোরিয়া
আমি হতভাগ্য বাহাদুর শাহ জাফর মহিসুরের টিপু সুলতান

অথচ আজ আর কেউ পরাস্ত নই – সন্ধি তো যুদ্ধের নিয়মে
(সন্ধি)

আসলে আবির্ভাবের এই তরুণতম মজিদ, মাহফুজামঙ্গল-এর মজিদ তাঁর আবির্ভাবের এই কাব্যকৃতি দিয়ে পাঠককে এমনভাবে জারিত করেছিলেন, এই সেদিনও বাংলাদেশ ভ্রমণকালে তার উষ্ণতা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এই অভিজ্ঞতা একজন কবির গর্বের বিষয়ও বটে। কিন্তু সাথে সাথেই একটি ভীতির বিষয়ও সমভাবে ভাবিয়ে তুলেছে আমাকে। একজন কবির সূচনার এই অতি উচ্ছ্বাস তাঁর পরবর্তী রচনাগুলির প্রতি কিছুটা উদাসীনতা তৈরি করে ফেলছে না তো! বিশেষ করে মজিদ যখন ‘বল উপাখ্যান’ লিখে ফেলেছেন, ‘ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম’ লিখে ফেলেছেন, কিংবা ‘দিওয়ান-ই-মজিদ’- অসাধারণ কাব্য পরিক্রমা বহু আগেই সমাপ্ত করেছেন! আমি তো পাঠকবর্গকে এইসব গ্রন্থগুলির প্রতিও সমভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করার আবেদন জানাতে চাই। চাই-ই। একটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত স্মৃতি উসকে উঠছে মনের ভেতর। বলেই ফেলি।
একবার বাংলাদেশের কক্সবাজারে একটি সম্বর্ধনা সভায় সেখানকার জেলা প্রশাসক আমাকে ‘জিয়ারত-এর কবি’ সম্বোধনে মঞ্চে আহ্বান করেছিলেন। আমি মঞ্চে উঠে অভিমান মিশ্রিত মৃদু প্রতিবাদ জানাই। আমার ‘জিয়ারত’ কবিতাগ্রন্থটি তাঁদের গ্রাস করেছিল ঠিকই, আনন্দেরও বিষয় খুবই। কিন্তু বলতে চাই তারপরও তো কয়েকটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে গেছে। আমি ‘জিয়ারত’-এ আটকা পড়ে থাকতে চাই না এক্কেবারেই! কোনো বিশেষ কৃঙ্খলে আটকে পড়ে থাকা অগ্রসরমান কোনো কবিরই লক্ষ্য হতে পারে না কিছুতেই। মজিদ ভালো করেই জানেন সেকথা। তিনি তাঁর নিজস্ব পরিধি ভাঙতে ভাঙতে, প্রসারিত হতে হতে বহুদুর এগিয়ে এসেছেন। বাংলা কবিতার পাঠকবর্গকে এই সহজ সত্যি কথাটা আরও মজিদ-এর কাব্যভাবনার যে ভিত্তিভূমি, তার উৎকর্ষতা কিংবা বিস্তারের এক অপূর্ব সমন্বয় আমি লক্ষ্য করি তাঁর ‘বল উপাখ্যান’ শিরোনামের কবিতাগ্রন্থটিতে। ২০০০ সালে প্রকাশিত ছোট্ট এই কবিতাগ্রন্থটি তাই আলাদা একটি মাত্রা নিয়ে ভেসে আছে স্মৃতির ভেতর। এই মহাবিশ্ব চূড়ান্ত এক শূন্য গোলক, এক মহাশক্তি। আর আমরা ছোট্ট ছোট্ট শূন্যের শক্তি নিয়ে অভিকর্ষ মহাকর্ষের লীলার ভেতর ভেসে আছি, ছুটে বেড়াচ্ছি। এখানেই আমাদের মানস পৃথিবীতে ঘটে যাচ্ছে নানারকমের জন্ম কিম্বা জন্মান্তর। মজিদ সেসবের দিকেই আমাদের ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন তাঁর অননুকরণীয় এবং তীব্র এক কাব্যভাষার। এই জন্ম কিম্বা জন্মান্তর যেমন সূচনাহীন তেমনই হয়তো পরিসমাপ্তিহীনও বটে। শুধুই এক মায়াময় আবর্তনে তাদের ভেসে ভেসে থাকা। কবি এখানে নির্মোহ কথকের ভূমিকায়, অন্তত মজিদের কাব্যভাষা সেকথাই মনে করিয়ে দেয়। আমাদের জীবন আসলে জাতক কাহিনীরই অংশবিশেষ। নানা জীবন আর নানা রকমের মৃত্যুর তীব্র সমন্বয়ে সে আবর্তিত হয়ে চলেছে। মজিদ এসবেরই স্ফুলিঙ্গ খুঁটে খুঁটে আহরণ করতে চেয়েছেন। প্রথমেই ‘বল উপাখ্যান’ কবিতাটি একটু উল্লেখ করি –
প্রথমে একটি গোল অথচ নিরাকার বলের মধ্য দিয়ে
গড়াতে গড়াতে আমি তোমার শরীর থেকে পৃথক হয়ে গেলাম
আর সেই থেকে তুমি

মরণকে একটি পিচ্ছিল জিহ্বার মতো বিছিয়ে রেখে
আমাকে ধরার জন্য ছুটে চলেছ, আর আমি
প্রাণভোমরা একটি সিন্দুরের কৌটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে
তোমার নাগাল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি
এই পলায়ন একটি খেলা
যেহেতু সমুদ্রসঙ্গমের আগেই তোমার বিছানো
পিচ্ছিল জালের সূক্ষ¥ সুতায় গেঁথে নেবে আমাকে
যেহেতু আমার তর্জনীতে জড়ানো সৌরমন্ডল
ঘুরতে ঘুরতে একদিন তোমার চারপাশে গড়ে তুলবে দূর্গ-পরিখা
তুমি ধরে ফেলবার আগেই
আমি সাড়ে সাতশ’ কোটি নিরাকার বল
তোমার চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছি
অসহায় বাঘিনীর মতো তুমি থাবা বিস্তার করে আছ

পাঠককেই বিনির্মাণ করে নিতে হবে কবিতাকে, তাঁদের নিজেদের মতন করে। আমি শুধু ইঙ্গিতটুকু দিয়ে রাখতে চাইছি। এই কবিতাটিরই শেষ অংশের দিকে কবির ভাষ্য :
তখন ব্রহ্মার নাকের মধ্যে ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত
ব্রহ্মা তখন আমাদের মতো ছিলেন
আমরা তখন ব্রহ্মার মতো ছিলাম
ব্রহ্মা কিছুকাল মাটি ছিলেন
আমরা কিছুদিন আকাশ ছিলাম
তারপর একটি মোরগের মতো কুরুকুরু করে
আমরা মানুষের ঘুম ভাঙাতে থাকি এবং

একটি জবে করা শূকরের মাংস এবং রক্তের সঙ্গে
মানুষের রক্ত এবং মাংস মেশানোর কাজ
বহুকাল ধরে করে চলেছি

অথচ এই গোনাহ থেকে নাজাতের কোনো পথ খোলা নেই
বারংবার পাঠের পর শিহরিত হতে হয়। পৃথিবী সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে যে মহাবিস্তারের সামনে দাঁড়িয়ে মজিদ এমন কথা উচ্চারণ করছেন, তা তাঁকে সিদ্ধপুরুষ ভাবতেই সহায়ক হয়ে ওঠে। ফলে জন্ম, জন্মান্তর এবং জাতককাহিনী তাঁর কবিতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে, তাঁর কবিতার প্রাণ স্পন্দন হিসেবে ধ্বনিত হতে থাকে। অন্তত এই কবিতাগ্রšে’র সেই স্পন্দন আমাকে তীব্রভাবে জারিত করে তোলে। বেশি কথা বাড়াব না। আমি শুধু কবির কাছেই ফিরে যেতে চাই, সূত্রধর হিসেবে। আমি বিশ্বাস করি, যথার্থ কবিতা ব্যাখ্যার অতীত, আর কবিকে চিনবার জন্যে কথা নয়, কবিতার কাছেই বারংবার ফিরে যাওয়াই শ্রেয়।
আজ রাত ভোর হলে আমার গাছজীবন শেষ হয়ে যাবে
কাঠুরিয়া এসেছিল কাল রাতে, সব ঠিক হয়ে গেছে

গাছের স্বপ্ন কেবল উড়বার সাধ, মানুষ চায় গাছের জীবন
গাছ বৃত্তের মধ্যম পর্যায়, সিদ্ধার্থের ইচ্ছার সন্ততি বোধিদ্রুম
সিদ্ধার্থ গাছ হয়েছিলেন, গাছের শাখাতে বসেছিল পাখি,
বল্কলের পেটে রেখেছিল হাত, সুজাতার হাত, পায়েসা
নির্বাণ দিয়েছিলেন তাঁকে, করাতকলের শব্দে আমি সেই
মুক্তির আহ্বান শুনি, মুক্তি কেবল দৃশ্যের রূপান্তর
তবু এই খোলসের মায়া আমাকে ব্যথিত করে তোলে
(গাছজীবন)

থামতে চাইছি না এখানে। আরও একটু থাকতে হবে কবির সঙ্গে। খুঁজে নিতে হবে তাঁর স্বপ্নের বিস্তার।
‘একদিকে নবুয়ত অন্যদিকে পুত্রের মায়া
আমি পুত্রের মায়া চাই
আমার পুত্র আজ ডুবে যাচ্ছে গজবের জলে
সেই জলে আমি নৌকা চালাব
এক জোড়া মানুষের নমুনা নিয়ে !
তোমার নতুন স্বর্গগড়ার স্বপ্নে আমার কোনো ভালোবাসা নেই
আমি মানুষের পিতা
মানুষ আমার ভাই
নবুয়তের লোভ দেখিও না
তোমার কিশতি থেকে নেমে যেতে একটুও দেরি হবে না
(পুত্র ডুবে যাচ্ছে)

আহা নুহ্! আহা মহাপ্লাবন ! মানুষকে ভালোবেসে একজন যথার্থ কবিই পারেন উদ্ধারতরণী থেকে উন্মত্ত সমুদ্রে আচম্বিতে লাফ দিয়ে পড়তে। এবার একটু কৃষ্ণকথা।
যমুনার ওপার থেকে পালিয়ে এসেছে যে যুবক
তুমি তার কতখানি জান
আমার কাছে তোমার কোন স্মৃতি নেই বিস্মৃতি নেই
তুমি অতীত ও ভবিষ্যতহীন জন্মরহিত
তবু তুমি ষোলশ’ গোপিনীর মুখের অবয়ব নিয়ে
রাধার মতো আমাকে তাড়া করছ কবিতা
আমি ছুটছি আমি ছুটছি মানব থেকে মানবেতরে
(বনসাঁই)

‘বনসাই’ শব্দটির গভীরতা লক্ষ্য করতে অনুরোধ করি পাঠকবর্গকে। এবার শেষ কথা। গৌতম, বোধি, অশোক, ইয়াংসি কিংবা মাও সে তুং যেখানে চক্রাকার আবর্তনে একাকার, কাব্যিক লীলায় অথবা নব্য পরিচর্যায় সমর্পিত।
অশ্বত্থের তলে আবার নড়ে উঠলেন গৌতম
অহিংসবাদী জনক; শতকোটি মানুষ দেখলো
দেখলো চীনের জনতা
একজন অশীতিপর বৃদ্ধ পাইনের মতো
ঋজু হয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে
দূরত্ব কমালেন ইয়াংসির
বোধি! এ কিসের নদী
এ কি অশোকের ভ্রাতৃঘাতী রক্তের নদী
এখন সুখের সময় নয়
দ্রুত পৌঁছে গেলেন হোয়াংহোর মোহনার কাছে
না উজান গ্রোতে লাগেনি রক্তের রঙ
সাবধানে গৈরিক কৌপীন খুলে
সর্বাঙ্গ প্রক্ষালন করে স্নাপিত
উঠে এলেন যুবক ওয়াং উইলিন
তখন তিয়ানমেন চত্বর পেয়ে গেছে রক্তের নুন
দেং পেং চড়িয়েছে রান্না
কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে মাওয়ের মধ্যাহ্নভোজ
(মধ্যাহ্নভোজ)

এইভাবে কবিতাই তবে কথা বলতে থাকুক। আমি থামছি এই পর্বে।

এরপরও একটি জরুরি প্রশ্ন উঠে আসছে মনের ভেতর। মজিদ নিজে ঠিক কী ভাবেন তাঁর কবিতা বিষয়ে? পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এখানে সামান্য একটুখানি অংশ উদ্ধৃত করে দিচ্ছি। যাতে করে কবির মানসিক ভূমন্ডল আরো স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে যায় আমাদের কাছে। কবিকে চেনার জন্যে এটুকু আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।
মজিদ লিখেছেন:‘.. . এই কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল ভূর্জপত্রে, পশুর চামড়ায়, পোর্চমেন্ট ও প্যাপিরাস স্ট্রোলে। এই কবিতাগুলো শীতের পাখিরা পশ্চিম থেকে পূবে বয়ে নিয়ে আসে, ডিমে তা দেয়ার সময়, অঙ্কুরোদ্গামের সময় তাদের মায়েরা এই কবিতাগুলো আবৃত্তি করে বাচ্চাদের পৃথিবীর পথে আহ্বানের জন্য। এই কবিতাগুলো অহিংস চরকা, সহিংস মেঘনাদ, প্রশান্তির গীতবিতান, অশান্তির অগ্নিবীণা, ধূসর পান্ডুলিপি, ৭ মার্চে মহান নেতার ভাষণ, খালকাটা কর্মসূচি। এই কবিতাগুলো কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো, শ্রমিকরাজ প্রতিষ্ঠার প্রথম আকাঙ্ক্ষা, উদ্বৃত্ত মুনাফার বণ্টন।’
এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল মাতৃগর্ভ থেকে, পিতার ঔরস থেকে, যখন একজন পুরুষ ও নারী ভাগাভাগি করে আমাকে বহন করছিল। এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল পিতার পিতাদের জন্মের আগে, মাইটোসিস মেয়োসিস বিভাজনের আগে, মুরগি ও ডিম আলাদা হওয়ার আগে, ভাষা নির্মাণের আগে, এমনকি – সমুদ্রের শ্যাওলা ও পানি নির্মাণের আগে এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল – যখন সমগ্র সৌরজগত সূরে‌্যর চুল্লিতে রান্না হচ্ছিল, সকল ছায়াপথ ও গ্যালাক্সিমন্ডলী, ব্ল্যাকহোল ও নক্ষত্র-নিচয় ঈশ্বরকতার সঙ্গে ছিল।….
মজিদ যাই ভাবুন, একটা কথা খুব পরিষ্কার, উত্তর আধুনিক সংস্কৃতির যে মূল ধারণা, তিনি তার যোগ্য মশালবাহক। জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতার যেসব বাঁক এবং বাঁকবদল, তিনি তার সমূহ আত্ম¯’ করেও, সমান্তরাল একটি গতিপথ প্রস্তুত করে নিয়েছেন নিজের মতন করে। যেখানে ঐতিহ্যের হিমায়িত দর্শনগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন সাম্প্রতিকতার নবতর ভাষ্যে। এ যেন আপন সত্তার গভীরতর শিকড়ের বর্ণময় অনুসন্ধান যে কারণেই তাঁর কবিতাগ্রন্থগুলির শিরোনাম হতে চেয়েছে ‘বল উপাখ্যান’, ‘আপেল কাহিনি’, ‘গোষ্ঠের দিকে’, ‘মাহফুজামঙ্গল’,‘দিওয়ান-ই-মজিদ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রার্থনা করি, মজিদের ওপর ঐতিহ্য-পুনরুত্থানের এই আক্রমণ তীব্রতর হোক

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *