বেথেলহেমের পথে পথে : সভ্যতা ও নারীর আশ্রম


সভ্যতার প্রথম মুখ কোনটি?
নারীর জরায়ু। যে সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে দুনিয়ার কোটি কোটি আদমের জন্ম, মানুষের এই পৃথিবীতে। মানুষ দুই ধরনের। পুরুষ ও নারী। নারীই বহন করে জন্মের সকল ভার, ধারণ করে যাবতীয় কষ্ট, এবং জন্ম দেয় প্রাণী। প্রাণী বড় হয়ে হয় নারী ও পুরুষ। যে নারীর গর্ভে পুরুষ জন্ম নেয় বুকের দুগ্ধ পান করে হয় বড়, সক্ষম, সেই পুরুষই হয়ে দাঁড়ায় খাদক বাঘ। জন্ম নিয়ে বিপরীত লিঙ্গের আদমেরা ঘুরে দাঁড়ায় নিজের বিরুদ্ধে, নিপতিত হয় জরায়ু দখলের যুদ্ধে। নারী ও পুরুষের বিচিত্র এবং পাশবিক খেলা-প্রেম বিরহ মায়া মমতা আর রিপু তাড়নার। গোটা চক্র নিয়ে গভীর ধ্যানে ভাবলে, কোনো সমাধান পাওয়া যায় না, মাথা গুলিয়ে আসে। মজিদ মাহমুদ মাথা ঘোরানোর আখ্যান নিয়ে নেমেছেন ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসে।


এক নারী বিলু অথবা বিলকিসের সঙ্গে যাত্রা অনেক চরিত্রের। যেতে যেতে এই চরিত্ররা কেমন করে পাল্টে যায়, লেপ্টে যায়, বাঘ হয়, তারই মিথুনলগ্ন বর্ণনা করেছেন, সঙ্গে দিয়েছেন ইতিহাসের মানবযাত্রার ও বিকাশের ধারাবর্ণনা। ফলে, ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসটি কেবল নারী-পুরুষের সম্পর্কের পথে যাত্রাই নয়, ইতিহাসও প্রবলভাবে একটি চরিত্র হয়ে ওঠে।
বুদ্ধিভিত্তিক উপন্যাস আমাদের দেশে খুব কম লেখা হয়েছে। বুদ্ধি, মনন ও ঐতিহ্যের গাথায় উপন্যাস লেখা, চরিত্র নির্মাণ করা, আখ্যান তৈরী করা একটু কঠিন। কঠিনেরে ভালোবাসিলাম … রবীন্দ্রনাথের পথ ধরে মজিদ মাহমুদ এই কঠিন পথেই চলেছেন। আমরা অনেক আগে থেকেই জানি, মজিদ মাহমুদ প্রচলিত পথে ও প্রথায় হাঁটেন না। তিনি বরাবর নিজের মতো ভিন্ন ও নতুন পথ রচনা করে হাঁটেন। আমরা ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসে আবারও তার ভিন্ন ও নতুন যাত্রা দেখতে পেলাম।


নারীর শরীরের যে কারখানা, সেই কারখানার ভেতর থাকে বিচিত্র রূপ আর রূপান্তর। সেই রূপান্তরের একটি শাখা মাসের নির্দিষ্ট দিনে রক্তপাত হওয়া। কেন হয় এই রক্তপাত? কি প্রয়োজন এই রক্তপাতের? চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বিলুর রক্তপাতের খবর দিয়ে উপন্যাসের আখ্যান যাত্রা শুরু করে। যেতে যেতে বিলু নিজের মতো করে নিজেকে সাজিয়ে যায়। বিলুর ভেতরে অন্য এক বিলু কথা কইতে শুরু করে কোন কালে শুনেছে মেয়েরা মেয়েরা ধর্মের ইন্টারপ্রেট করেছে। যদিও প্রথম মুসলমান নারী ছিল। যদিও পয়গম্বরের জীবন প্রধানত নারীদের প্রযত্নে কেটেছে, যদিও খাদিজা ও আয়শার ভূমিকা কিছুটা বেশি। … ওল্ড টেস্টামেন্টে তা স্পষ্ট বলা আছে, লুত আলাইহেস সালামের জমানার দৃষ্টান্ত দিয়ে। দুই ফেরেশতা যখন সুন্দর পুরুষরূপে লুতের বাড়িতে আগমন করলেন, তখন তার প্রতিবেশীরা সেই যুবকদ্বয়কে দাবী করল – তাদের প্রবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য। লুত তাদের বললেন, তোমরা আমার সুন্দরী কন্যাদের লইয়া যাও কিন্তু মেহমানদের অপমান করো না। কিন্তু সদোম নগরীর বিকৃতকামীরা তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ঈশ্বর এই গমুরাহিদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিলেন। পুরুষ যতদিন নারীর সঙ্গে মিশবে ঈশ্বরের পৃথিবী ততদিন নিরাপদ।
তাহলে?


শরীর এবং জীবন ও জগতের ভাবনা কেবল পুরুষদের একচেটিয়া নয়, এই ভাবনা নারীরও। কিন্তু প্রথায় আবদ্ধ সংক্ষুব্ধ সমাজে পুরুষের উপর মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারে কোন নারী? শরীরের শক্তিমত্ততায়, পৌরুষের পাশবিকতায় নারীর মুখ ঢেকে যায় ছিন্ন পাতার আড়ালে। কণ্ঠ হারিয়ে যায় পুরুষের কর্কশ উচ্চারণে। বিলু নিজের জীবনাচারের টক ঝাল মিষ্টি অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অনুভব করে, নারীর জীবন নয় পদ্মপাতার উপর শিশির বিন্দু। পথের প্রতিটি বাঁকে দেখে ভয়াল বাঘ মুখ ব্যাদান করে অপেক্ষায় আছে মুখোশের আড়ালে, কখন, কখন করবে শিকার! পথে পথে মেয়েরা শিকার হতে হতে সভ্যতার এই সময়ের মানমন্দিরের সোপানে এসে দাঁড়িয়েছে। বিলু চিন্তা করতে পারছে নারী ও পুরুষের মনোজগতের ঐতিহাসিক বিবর্তন। কোথায় কেমন করে নারী ও পুরুষের বিপরীত সংযোগ সড়ক তৈরী হয়েছিল, বিলু খুঁজতে চায় তার প্রথম পর্ব। কিন্তু তল সন্ধান পাওয়া কি এত সহজ? মোড়কে মোড়কে আটকে দিয়েছে মোড়লেরা পথের সকল গ্রন্থি।


বিলুর ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও আসে, অবশ্যই নারী বিক্রিয়ায়। রবীন্দ্রনাথ যখন বিয়ে করেন তখন কনের বয়স ছিল নয় বছর। রবীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে এসেছেন পূর্ণ যুবক। যে রবীন্দ্রনাথ ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্প লেখেন তিনি কেমন করে ভবতারিণীকে গ্রহণ করেছিলেন? সেই সময়ের দু’জনের ছবি দেখলে অনেক ভারসাম্যহীনতা চোখের সামনে, মননের করোটিতে চিমটি কাটে। রবীন্দ্রনাথ কিভাবে এত কম বয়সের মেয়েকে গ্রহণ করলেন স্ত্রী হিসেবে? প্রথায় আবদ্ধ সমাজ তিনিও ভাঙতে পারেন নি। গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন বংশ এবং প্রথার দাপট। রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন – মৃণালিনী। নামেই কি সব হয়? কিংবা গেঁয়ো নাম পরিবর্তন করে আধুনিক নাম দিলেই কি কিছু হয়? বাংলা ভাষায় কত চমৎকার নাম আছে কিন্তু সুন্দর নামের মানুষগুলো কি সভ্যতার সঙ্গে যায়? যদি মনে ও মননে থাকে বিষের দংশন! বিলু এই নিদারুণ দংশনের ভেতর দিয়ে সময়কে হাতের ভেতরে আটকে রেখে অতিক্রম করে যাচ্ছে। যেতে যেতে কত অবাক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় সেই অভিজ্ঞতার তিক্ত মধুর বর্ণনা দেয় বিলু। কার সঙ্গে বা কার কাছে বিলু জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতাকে ঢেলে দেয়? ঢেলে দেয় নিজের কাছে। অনেকটা সমেহন ঘটনা। এমন সব নিগুঢ় আর অন্তঃমননের সারাৎসার তো চারপাশের উজবুকেরা ধারণা করতে পারবে না। শুনলে বমি করে দেবে – কিন্তু এই যে আন্ত বা আত্মবয়ন, উপন্যাসের ফরম্যাটে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পাঠ করা ক্লান্তিকর। ঔপন্যাসিক মজিদ মাহমুদ হয়তো নিজস্ব প্রজ্ঞার মেরুকরণে এই আত্ম প্রকরণের বাইরে যতে চান নি।

মেমোরিয়াল ক্লাব বইয়ের প্রচ্ছদ


‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসে বিলু বা বিলকিসকে দিয়ে নিজের চিন্তা, চিন্তার প্রসারতা, মনন চর্চার অভিজ্ঞানকে ঢেলে দিতে চেয়েছেন। মজিদ মাহমুদ পাঠকদের পাঠক ঘেঁয়েমি থেকে মুক্তির জন্য বিলকিসের সঙ্গে আরও দু-একটা চরিত্র যুক্ত করে দিলে পারতেন। চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের সংলাপ, আত্মপ্রণোদনা কিংবা সংঘাত মুখরতার মধ্যে নাটকীয়তায় টান টান উত্তেজনাও সৃষ্টি করতে পারতেন এবং সেটা হলে পাঠকেরা পাঠ ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারত। কিন্তু আমি যাই লিখি না কেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঔপন্যাসিকের। তিনি যেভাবে উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণ করবেন, আমাদের সেই কাঠামোই অনুসরণ করতে হবে। তো মজিদ মাহমুদের কাঠামো অনুসরণ করে আমরা এখন ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসের মাঝপথে। বিলকিসের অর্জিত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে একজন নারী কেবল নয়, গোটা নারী সমাজের মানচিত্র এঁকে যায়। যে মানচিত্র জুড়ে কেবল নির্মম ক্রুশকাঠের ছড়াছড়ি। বাংলার নারী সমাজের দুর্ভোগ আর পুরুষ মাৎস্যায়নের কলাবৈকল্যবাদী আগ্রাসন – গোটা উপন্যাসে জায়গা করে নিয়েছে। পাঠ করতে করতে একেক সময়ে মনে হয়, আমি কি পাঠ করেছি! আমি তো দেখছি আমাদের গ্রামের জুলেখা সুলেখা ছালেকা মালেকাদের নারকীয় জীবনযাপনের মর্মদস্ত ঘা। সেইসব ঘা’য়ের কর্তিত জীবনের সঙ্গে বিলকিস নিজেকে তুলনায় প্রতিতুলনায় নিষিক্ত করতে চায়। টেনে আনে বেথেলহেমের পথে পথে চলতে থাকা অন্যান্য নারীদের কাহিনী। যেমন, গ্রামের লুকমানের কন্যা মলিনা কাহিনী। ঔপন্যাসিক, আমরা বুঝতে পারি নিজের দেখা বা জানা বা শোনা ঘটনাকে চক্র করে ঢুকিয়ে দিয়েছেন বিলকিসের তিক্ত জীবনের দুয়ারে। মলিনার কি ঘটনা? মলিনার মা নেই। বাবা লুকমান কাজের সন্ধানে গেলে রেখে যায় নানীর কাছে। কিন্তু উঠতি বয়সের মেয়েকে আটকে রাখা যায়? আর যে মেয়ের মা নেই। তো মাঝে মাঝে মলিনা হারিয়ে যেত। হারিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর ফিরে আসত। মলিনার হারিয়ে যাওয়া আবার ফিরে আসাটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল গ্রামবাসীদের কাছে। কিন্তু ঔপন্যাসিক মজিদ মাহমুদ আমাদের জানান দেন, হারিয়ে যাবার বৃত্তান্ত। মলিনা বলেছিলও, এইবার হারিয়ে যাবার আখ্যান কিন্তু গ্রামবাসী বিশ্বাস করেনি। কারণ মলিনা এইবার একা আসেনি, পেটের ভেতর প্রাণী নিয়ে এসেছে। সুতরাং গ্রামবাসীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছিল – তারা পাপ থেকে পরিত্রাণ খোঁজার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টার বলি হয় মলিনা।


যে মলিনা সম্পর্কে বর্ণনা পাই : ‘বিশু মাঝি নিহত হওয়ার পর এলাকায় পরামানিকদের বাড়িতে যে বিশেষ বাহিনীর ক্যাম্প বসেছিল, সন্ধ্যার পর নানির বাড়ি থেকে থেকে সেই পথে ফিরে আসার সময়ে ক্যাম্পের লোকেরা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। প্রায় বিশ দিন তারা বেরোতে দেয়নি। খাবার দাবার ভালোই দিত কিন্তু রাতদিন দশ বারোজন লোক তার ওপর সোয়ার হতো। অনেক কান্নাকাটি অনুনয় বিনয় কিছুই তাদের টলাতে পারেনি। ওরা নাকি বলেছিল,তুই তো এই করেই খাস, আগেও কয়েকবার হারিয়ে গেছিস – সবাই জানে। এখানে খাবি দাবি পয়সা পাবি তোর সমস্যা কি! আসলে মলিনার মাথায় একটু গন্ডগোল ছিল। মা মারা যাওয়ার পর সে আপন-পর খুব একটা বুঝতে পারতো না, সংসারের রীতি তার তেমন জানা ছিল না। কোনো কথাও সে গোপন করতে পারতো না। কাউকে সে না-ও করতে পারতো না।’
এই হলো মলিনা বিষয়ক অধিতবিদ্যা। যখন এই বিদ্যার বিষে জর্জরিত মলিনা, তখন সমাজপতিদের মাথায় বাজ পড়ে। ডাকা হয় সালিশি। সালিশিতে ইমামকে একটু দ্বিধাগ্র¯’ মনে হয়েছে। সে মলিনার পেটের সন্তানের প্রসঙ্গ তুলে বলেছে, পেটের সন্তান তো কোনো পাপ করেনি। আর ভূমিষ্ঠ হবার পর এই সন্তান যতদিন বুকের দুগ্ধ পান করবে ততদিন কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না। উপস্থিত গ্রামবাসী, যারা ঘোরতর ধর্মীয় কানুনে আস্থাশীল, তারা দেখতে চেয়েছিল মলিনা নামক এই অসহায় মেয়েটিকে কতটা কদর্য আর কষ্টকর শাস্তি দেওয়া যায়, তার নগদ ও চক্ষুভরা শাস্তি। কিন্তু ইমামের কথায় গ্রামবাসী চুপসে গেলে মালিথা সাহেব মধ্যম মানের শাস্তির ব্যবস্থা করে। তার ব্যবস্থাপত্র হলো : বাপ বেটি দুজনকেই তওবা পড়াতে হবে, তার আগে মলিনার চুলের আগা থেকে কিছুটা কেটে দেওয়া হবে, যেভাবে হজে মেয়েদের মাথামুন্ডনের পরিবর্তে চুলের আগা কাটলেই হয়, আর দশটি কঞ্চি এক সঙ্গে বেঁধে মলিনার পিঠে দশবার আঘাত করা হবে, তাতেই অবিবাহিত মেয়ে মানুষের একশ কোড়া মারার শাস্তি পুরণ হবে। পাশাপাশি লুকমান ও তার পরিবারের সঙ্গে চল্লিশ দিন পর্যন্ত কেউ সমাজে জামাত করতে পারবে না। ব্যস্ শাস্তি হলো মলিনার, যেহেতু সে বহন করছে শান্তির প্রহরীদের বীর্য এবং পেটে এসেছে বাচ্চা। কিন্তু যারা বাচ্চা মলিনার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিয়েছে, তারা কোথায়? সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিচার ব্যবস্থা এই প্রশ্নে ভয়ানক নীরব। কিন্তু ঔপন্যাসিক মজিদ মাহমুদ আর ‘বেথেলহেমের পথে পথে’র নায়িকা বিলু বা বিলকিসতো নীরব থাকতে পারে না। তাদের দু’জনার মধ্যে চেতনার ঐক্য, প্রতিরোধের ঐক্য গড়ে উঠেছে এবং এই ঐক্য চেতনার রাজপথে দেখা হয় যীশু মহাশয়ের। যীশু মহাশয়ের দেখা না হয়েও উপায় থাকে না, কারণ মজিদ মাহমুদ এবং নায়িকা বা প্রধান চরিত্র বিপুল যে থিসিস এখানে দিতে চায়, নিরাপদ ঢাল হিসেবে, হাল আমলের বাংলাদেশে উপায় থাকে না। বিলকিসকে খুঁজে পাওয়া যাবে না ঠিকই কিন্তু ঔপন্যাসিকতো … বাংলাদেশে বর্তমান। বেঁচে না থাকলে থিসিস বেচে কি লাভ? নিরাপদ বেচা ও কেনার দুনিয়ায় বেচারা বেথেলহেমের যীশু অনেক অনেক এবং অনেক নিরাপদ। সে কারণেই সম্পাদকের বুকের উপরে অধিষ্ঠান অবস্থায় বিলকিস নিজস্ব ভাবনার কোরাসে এতসব চরিত্র এবং চরিত্রের রথ ছুটিয়ে দিতে পারে বা পারছে। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎ সম্পাদক নামক চিড়িয়া এলো কোত্থেকে? আসলে মজিদ মাহমুদের বড় উপন্যাসের কোনও এক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত পরিকল্পিত উপন্যাসের এক খন্ডাংশই পেয়েছি। তো সেই খন্ডাংশেই বিলকিস যা ভাবে, যা দেখে এবং যা ভাবনায় আছে উজাড় করে দেয় পাঠকদের কাছে। যদিও উপন্যাস শুরু হয়েছে চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে মাত্র একটি লাইনে কিন্তু পরে কোথাও বেইজিং বা চীনের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। হয়তো ঔপন্যাসিক পরের পর্বে চীনের বা বেইজিংয়ের দরজা খুলবেন বিলু বা বিলকিসের অন্য কোনও দরজা খুলে।

লেখক মজিদ মাহমুদ


‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসে মাত্রিকতা অনেক। বিলকিস একাই গোটা উপন্যাসের বর্ণনাদাতা, নিজের মনের গভীরের যত চিন্তা চিন্তার কোরক-নানা অনুষঙ্গে পাঠকদের দিয়ে যাচ্ছে। লিখতে দ্বিধা নেই যে মজিদ মাহমুদের এই বুদ্ধিজাতক উপন্যাস ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ এক ধরনের মনোটোনাস আঙ্গিকের রূপায়নে এগিয়েছে। বিলকিস পত্রিকার সাংবাদিক। সম্পাদক ডেকেছে ডিকটেশনের জন্য। প্রৌঢ় কিন্তু বলিষ্ঠ সম্পাদকের ডিকটেশন নিতে নিতে বিলকিস চেতনা হারায়। বিলকিস চেতনা হারালে সম্পাদক তাকে বুকের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে – এই অবিনাশী চেতনা বিনাশের মধ্যে দিয়ে বিলকিস গোটা উপন্যাসের পথ পার হয়ে এসেছে।
বিলকিস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে এই পত্রিকা অফিসে এসেছিল ইন্টার্ন করার জন্য। ইন্টার্ন করতে করতে বিলুর চাকরি হয়ে যায়। চাকরির পর বিলু প্রায়ই সম্পাদকের রুমে যায়, যায় প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনেও যায়। এই যে অপ্রয়োজনে যাওয়া- মানে সম্পাদক অনুমোদন করেন। সম্পাদকের অনুমোদন! বাতাসে কিসের একটা গল্প বা গন্ধ ভেসে বেড়ায়। বিলু বুঝতে পারুক আর না পারুক- কারণ, এই অধ্যায় শুরুর সময়ে মজিদ মাহমুদ বিলুর চৈতন্যে আমাদের জানিয়েছেন যে, ‘ঘটনাটি ঘটেছিল সম্পাদকের রুমে। সবাই বিষয়টি জেনে গেছে কিংবা অনুমান করেছে। হয়তো হয়েছিল কিংবা হয়নি। মাত্র কয়েকদিন আগে সে এই অফিসে ইন্টার্ন করতে এসেছে।’
কি ঘটনা ঘটেছিল সম্পাদকের রুমে যখন ডিকটেশন নিচ্ছিল বিলু। ঘটনার কি মাথা মুন্ডু আছে? ঘটনা ঘটে লহমায়-নিমেষে। কিন্তু সেই নিমেষ ঘটনার পালা বা পার্বণ চলে অনন্তকাল ধরে। গোপন সেইসব ঘটনার বিষ এতো তীব্র হয়, হয় ভয়াবহ যা নায়ক বা নায়িকাকে অথবা পাত্র-পাত্রীকে ঘটনার জের বহন করতে হয়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। জীবন এক আশ্চর্য সরাইখানা। বিশ্রামাগার। জীবনের সরাইখানায় কত মানুষ আশ্রয় নেয়, চলে যায়- যেতে যেতে রেখে যায় দাগ। ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ মিনি উপন্যাসে বিলু নিজের মতো করে নিজেকে ব্যবচ্ছেদ করে যাচ্ছে, কাটছে টুকরো টুকরো করে, অভিজ্ঞতা আর শরীরের মধুতে গেঁথে দিচ্ছে পরম প্রজ্ঞা, হিমায়িত জারুল কষ। সবই পাঠকদের জন্য নতুন এক জগত।


‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসে মজিদ মাহমুদ ধর্মকে ব্যবহার করেছেন নিজেকে বাঁচিয়ে বেথেলহেমকে গ্রহণ করে। এছাড়া উপায় কী বর্তমান হিংগ্র সময়ের রেলগাড়িতে চড়ে? কাটা পড়বো নাকি? অসহিষ্ণুতার এক দানবকাল পার হচ্ছি আমরা। সত্যকে, মুক্ত মনের বিশ্বাসকে বুক পকেটে লুকিয়ে রাখতে হচ্ছে। গলার উপর ঝুলতে থাকে রক্তাক্ত খাঁড়া। অন্ধ আতুরের মতো নেমে আসতে পারে যে কোনও সময়ে মসৃণ ঘাড়ে! যারা করছে খাঁড়ার ব্যবহার, তারা কি জানে- ধর্মের গভীর সত্তা ? তারা কি শুনতে পায় মহামানবের পরম আত্মার আহ্বান ? প্রশ্ন আমরা করেই যেতে পারি কিন্তু উত্তর চিরকাল অধরা, দূরের কুয়াশার অংশ। যে কুয়াশা দেখা যায় কিন্তু স্পর্শ করা যায় না। স্পর্শ করতে গেলে পানি জমে হাতে কি বিমুগ্ধ রূপান্তর? ‘বেথেলহেমের পথে পথে’ উপন্যাসে মজিদ মাহমুদ সভ্যতার সঙ্গে নারীর অথবা নারীর সঙ্গে সভ্যতার শরীর রচনা করে দেখিয়েছেন- নারী ও সভ্যতা এগিয়ে চলেছে পরস্পরের হাত ধরে। সভ্যতা এবং নারী যদি পরষ্পর এগিয়ে না যেতে পারত সভ্যতা মুখ থুবড়ে পড়ত হিমযুগেই। নারী আদম হাওয়ার গন্ধমের আখড়ায় তৈরি হোক আর মহামতি ডারউইনের অরিজিন অব স্পিচ বা বিবর্তনবাদ থেকে হোক, নারী সভ্যতার প্রথম বাহন। কারণ নারী জন্ম দেয় মানব সন্তান।


‘বেথেলহেমের পথে পথে’ আমাদের জন্য মজিদ মাহমুদ ছড়িয়ে রেখেছেন রূপান্তরের গল্প, ফিরে আসার পথ, না ফেরার দেয়াল, চিন্তার নতুন ভার্সন এবং খুলে দিয়েছেন অতলের আঁধি। বিশ্বাস করি, তিন খন্ডের গোটা উপন্যাস যখন হাতে আসবে, তখন নতুন ভাষ্য, নতুন রূপান্তর আর চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের খেলা দেখে পাঠকেরা আমরা মুগ্ধ হব, অন্ধ হব। হয়তো বিস্ময়ে অভিভূতও হতে পারি। কারণ মজিদ মাহমুদ সব সময়ে বিকল্প চিন্তা ও ধ্যানের কারিগর। আশা ও নিরাশার মধ্যে বেঁচে থাকাই মানব জন্ম।

কথাশিল্পী মনি হায়দার


লেখক : কথাশিল্পী

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *