মুশকিলে পড়া গেল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন, নাম কিছু না, ওটা প্রতীকী ব্যাপার-স্যাপার। আদতে নাকি ‘নাম মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে জাঁকাইয়া তোলে।’ অনুবাদে এই দাঁড়ায় যে, নামে কিছু যায় আসে না। নাম শুনে অথবা দেখে কিছু বোঝা যাবে না। কামই আসল কথা। কিন্তু আমাদের জ্ঞানেশ হুমায়ুন আজাদ যখন ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ বইয়ের নাম দেখেই জ্ঞাতি ভাইয়ের সন্ধান পাওয়ার আনন্দে ফাল পাড়েন আর উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘বাহ! কি নাম ! প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে কতই না আধুনিক নাম।’ নামেই নাচনকুর্দন তুলে যেন শামসুর রাহমানকে ‘এসো মোর দাদা’ বলে জড়িয়ে ধরলেন। ‘এসো মোর দাদা’ এজন্য যে, আজাদ আধুনিক কবি বলে রাহমানকে তাঁর কাব্যের নামের মধ্যেই আবিষ্কার করে ফেললেন এবং নিজের আধুনিকতাবাদি কাব্যতত্ত্বের মানদ-ঢুকিয়ে দিয়ে শামসুর রাহমানের কাব্যের এক বিশাল বয়ান হাজির করলেন। নাম রাখলেন ‘নিঃসঙ্গ শেরপা : শামসুর রাহমান’। কাব্যের নামের মধ্যে শামসুর রাহমানের আধুনিক মনের পরিচয়কে বারবার তুলে ধরেছেন আজাদ তাঁর রাহমান বিষয়ক বইয়ে। রাহমান আধুনিক নাকি আধুনিক নন, সেই বিতর্কে না গিয়ে আমরা আজাদের শরণ নিয়ে একটা কাব্যের নাম শোনাতে চাই। কাব্যের নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। এই কাব্যের নামের মধ্যেই কাব্যের ভেতরবাড়ির আভাস পাওয়া যায়। তবে, খালি নামের মধ্যে না থেকে, আমরা এই লেখায় এই কাব্যের ভেতরবাড়ি কী কী দেখলাম, তার কিছু অসমাপ্ত খোঁজখবর দেব। মানে দাঁড়াল যে, এই কাব্য নিয়ে খানিকটা নাচনকুর্দন করব। কবি মজিদ মাহমুদের ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের কাব্যরাজনীতি আমাদের মনে ধরেছে, কাব্যের মাহফুজাকে সোজা কথায় ভালো লেগেছে।
প্রথম একটা প্রশ্নের সুরাহা করা দরকার- ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের বিষয় কী ? উত্তরে বলা যায়, এ কাব্যের বিষয় মাহফুজা নামক এক নারী (!)। তাকে ঘিরে কবি-মনের কিছু অন্তরঙ্গ অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে কাব্যে। সঙ্গত কারণেই কেউ বলে উঠতে পারেন যে, ‘ও বুঝেছি! সেই নারী যা অধিকাংশ বাংলা কবিতার প্রধান বিষয়। এবং সেই তুমি-আমি আর কি !’ হ্যাঁ, এ কাব্যে তা-ই। শুধু তাই হলে কোনও কথা ছিল না। কিন্তু ‘মাহফুজামঙ্গল ’ খালি তাই না। খন্দকার আশরাফ তো তাঁর এক লেখায় কবি নির্মলেন্দু গুণের গুণ-বেগুন বলতে গিয়ে গুণের অন্যতম বেগুন হিসাবে এই নারী সর্বস্বতাকে উল্লেখ করে হতাশ হয়েছেন। নারী কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু নারী যদি কেবল তার শ্রীসৌন্দর্য আর কামনা-বাসনা নিয়ে কবিতায় হাজির হয়ে কেবল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; তা যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা তারও বেশি কোনও ইশারা দিতে না পারে, তবে সঙ্গত কারণে বলতেই হবে কবি চর্মচক্ষুর কবি। আমার মত সাধারণ মানুষ থেকে তার পার্থক্য কেবল প্রকাশের সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু মহৎ কবি এবং কবিতার লক্ষণ বিচার করলে দেখা যাবে যে, নারী সেসব কবিতায় ব্যবহৃত হয়েছে বটে, তবে তা হয়ে উঠেছে বহুস্তরিক প্রতীক; নানা দার্শনিকতা এবং ভাবুকতার আধার। এর সহজ উদাহরণ হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’।
মজিদ মাহমুদের ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যে মাহফুজা কেবল এক সাধারণ নারীকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নানা কবিতায় নানাভাবে এই নারীকল্পনা নানা ভাবুকতার আধার হয়ে উঠেছে। এই মাহফুজা কখনো ঈশ্বর, কখনো কবিতা, কখনো মানবী। এই যে বহুমাত্রিক রূপান্তর, এই রূপান্তরের ক্ষমতা কাব্যটিকে অনন্য করে তুলেছে। এই রূপান্তরের ক্ষমতা রবীন্দ্রনাথে যেমন আছে, আছে জীবনানন্দ দাশে, আছে আল মাহমুদে, আছে মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে, আছে মজিদ মাহমুদে। এই রূপান্তরের লীলাই তো কবিতার প্রধান শক্তি। এই রূপান্তরের সক্ষমতা কবিতার বড় শক্তি। অন্যথায় কবিতাকে বিন্দুর মধ্যে সিন্ধু ধারণের আধার বলার প্রশ্নই ওঠে না। কবিতা সাহিত্যশাখাগুলোর মধ্যে বোধ করি সবচেয়ে স্থিতিস্থাপক, উলট-পালট প্যাঁচকষার ক্ষমতার অধিকারী। ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যে মজিদ মাহমুদ এই উলট-পালট ঘটাতে পেরেছেন। মাহফুজা কেবল শরীর-সর্বস্বতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, যদিও কামনা জাগানিয়া রূপ নেই তা নয়। যেমন—
আমি তো দেখি তোমার সবুজ স্তন, আগুনের খেত
অসম্ভব কারুকাজে বেড়ে ওঠা তাজমহলের খুঁটি
কিন্তু পরক্ষণেই কবি আবার বলেন—
এমন অযোগ্য কবিকে তুমি সাজা দাও মাহফুজা
যে কেবল খুঁজেছে তোমার নরম মাংস।
এ যেন কবি তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করলেন যে, কেবল ‘নরম মাংস’ যিনি খোঁজেন তিনি ‘অযোগ্য কবি’র উদাহরণ। এজন্য ‘মাহফুজমঙ্গল’ কাব্যে আমরা লক্ষ্য করব নারীর বহু বিচিত্র রূপচিত্র। কয়েকটি রূপচিত্র চোখে দেখা যেতে পারে-
(ক) মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়
তুমি ছাড়া আর কোনো প্রার্থনায়
আমার শরীর এমন একাগ্রতায় হয় না নত
তোমার আগুনে আমি নিঃশেষ হই
যাতে তুমি হও সুখী
(এবাদত)
উদ্ধৃতাংশের মাহফুজা কবির তীব্র আবেগে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে।
তবে মানবীসত্তার বয়ান খুবই স্পষ্ট।
খ) তোমার জন্য এক সাংঘাতিক খবর আছে মাহফুজা
গতকাল আমাদের গ্রাম থেকে এসেছিল এক অদ্ভুত কৃষক
এবার বন্যায় ভেসেছে যার হালের বলদ
সারাদিন নিরন্ন থেকেও চাখেনি আমার ডাইনিংয়ে খাবার
দরোজায় পাটি পেড়ে কেবল তোমার প্রতীক্ষায় বসেছিল
কেবল তোমার প্রতীক্ষায়।
(খবর)
উদ্ধৃতাংশে মাহফুজা যেন অনাথের মা। আবার-
গ) রবীন্দ্রনাথকে তুমি দাওনি ধরা
কাজীদা অভিমানে তোমার বিপরীত
ফিরায়েছে গাল
আবার কেন ধরেছ অনুজের পাছ
(তোমাকে জানলেই)
উদ্ধৃতাংশে মাহফুজা মিস্টিক অনুভূতিতে মেশানো কাব্যলক্ষী। আবার-
ঘ) আজ মধ্যরাতে তোমাকে যেতে হবে
ন্যান্সি রিগানের শয়নকক্ষে
যেখানে লেখা আছে তৃতীয় বিশ্বের বাঁচবার হিসাব
পার যদি সেখান থেকেই দেখে নিও
ক্রেমলিনের রুদ্ধ কপাট
ন্যান্সি তার বিছানায় আছে কিনা
রাইসা তার বিছানায় আছে কিনা
যখন দুই মাতালপুরুষ মেতেছে পৃথিবীর বন্টন
তখন তোমার আত্মা বল কার অঙ্কশায়িনী
(মাতাল ডোম)
এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে মাহফুজা শুধু সাধারণ কামনা-মেদুর নারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
‘মাহফুজামঙ্গল’কাব্যের নামের মধ্যে এর বাসনা, কাব্যরাজনীতি, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম সবই লুকোনো আছে। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত বইয়ের নাম ‘মাহফুজামঙ্গল’। সঙ্গত কারণেই আমাদের মনে পড়ে ‘মনসামঙ্গল’, ‘চন্ডীমঙ্গল’, ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের নাম। যে মঙ্গলকাব্যের কবর রচিত হয়েছে ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে; অন্যকথায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে, সেই মঙ্গলকাব্যকে মজিদ মাহমুদ কি কবর খুঁড়ে বের করতে চেয়েছেন? এই বাসনা, এই স্পর্ধা, এই রাজনীতিটা আমরা আমাদের বোঝের আওতায় আনতে চাই।
১৭৫৭ সালে বাঙালি কেবল রাজ্য হারায়নি, তার শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতাও হারিয়েছে। বৃটিশের মানদণ্ড কেবল রাজদণ্ড হয়ে দেখা দেয়নি, একটি তীক্ষ্ণ তরবারি হয়েও দেখা দিয়েছে, যে তীক্ষ্ণ তরবারি বাঙালির এক হাজার বছরের কাব্য-ঐতিহ্যকে কেটে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। শুরু হয়েছে ঔপনিবেশিক সাহিত্যচর্চার ইতিহাস। ভাবে, রূপে, চেতনায় বাংলা কবিতা ঔপনিবেশিকতার জোয়াল কাঁধে নিয়ে চলেছে। মজিদ মাহমুদ অবাধ্য গরুর মত সেই জোয়ালে যেন কাব্যনামের মধ্য দিয়ে একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিলেন। মজিদ মাহমুদ তাঁর ‘মাহফুজামঙ্গল’কাব্যে দুইশ বছরের মঙ্গলকাব্যের রূপান্তরের ইতিহাসকে ধারণ করেছে যেন। অর্থাৎ ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ – এর পর দেবীকল্পনার রূপ-রূপান্তরের সত্যকে ধারণ করে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্য যেন ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছে। মাঝখানের দু’শ বছরের ঔপনিবেশিক সাহিত্যধারার বিপরীতে এ এক জবরদস্ত রাজনৈতিক অবস্থান। তাছাড়া উত্তরকালের কবি হিসাবে মজিদ মাহমুদ হিন্দুর মঙ্গলকাব্যচর্চার সীমানাকে বিস্তৃত করে মুসলমানের চর্চার মধ্যে টেনে এনেছেন। ফলে মঙ্গলঘট, বেদির পূজা অর্চনার চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছে ‘জায়নামাজ’, ‘তছবির দানা’, ‘কুরশিনামা’, ‘এবাদত’। মাহফুজা ঈশ্বর বন্দনা নয়ত কি! তোমার অহংকার (উদ্ধৃতি) পৃষ্ঠা – ৪৪।
এই মাহফুজা মনসা, চন্ডী বা অন্নদার মতই তো ক্ষমতাধর, অবিচল এবং সর্বপারগ। এভাবে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যটি মঙ্গলকাব্যের কিছু অন্তর্লক্ষণকে ধারণ করেছে এবং মঙ্গলকাব্যের চর্চার সীমানাকে বহুদূর বিস্তৃত করেছে। ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের ছয় সংখ্যক কবিতায় সহজেই আবিষ্কার করা যায় মঙ্গলকাব্যের কবির আত্মসমর্পণকে এবং ‘অন্নদামঙ্গল’র ঈশ্বরী পাটনীকে। – (উদ্ধৃতি ছয় সংখ্যক কবিতা) পৃষ্ঠা – ৫৩।
বাংলা কবিতার ভাষা নিয়ে বহু বিস্তর-বিতর্ক আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বোধহয় সবচেয়ে মোক্ষম সমস্যার জায়গায় হাত দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আফশোস করেই বলেছেন যে, তাঁর ভাব প্রাকৃত। প্রাকৃত ভাবকে প্রাকৃত জাতীয় কোন ভাষার খাপে পুরতে পারলে তিনি আরাম পেতেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি দেখলেন যে, তাঁর পর্যন্ত বাংলা কবিতার ভাষার যে কাঠামোটা দাঁড়িয়েছে তা ঠিক তাঁর আকাঙ্ক্ষার মত না। এ যে একেবারে হাতুড়ি বাটাল দিয়ে পিটিয়ে পুটিয়ে তৈরী করা তৎসম শব্দবহুল এক ভাষা কাঠামো ! রবীন্দ্রনাথ সেই ভাষা কাঠামোর মধ্যেই তাঁর অনুভূতির মালামাল পুরেছেন সত্য। তবে মহৎ প্রতিভাবান এবং সতর্ক রবীন্দ্রনাথের কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি এই ভারী, কৃত্রিম কাব্যভাষা-কাঠামোটিকে যথাসম্ভব নির্ভার ও অকৃত্রিম করে তুলেছেন। বাংলা কাব্যের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের অনেক অবদানের মধ্যে এটি বোধহয় সবচেয়ে বড় অবদান। ভাষাকে তিনি হাওয়াই মিঠাইয়ের মত, পাখির পালকের মত, দীর্ঘশ্বাসের মত হালকা এবং আরামদায়ক করে তুলেছেন। রবীন্দ্রনাথের পর তিরিশের কবিরা আরেক কাঠি সরেস ভূমিকা রাখার ঘোষণা দিলেন। তাঁরা বললেন, ভাষাকে আমরা আরোপিত কাব্যত্ব থেকে মুক্ত করে, মুখের কাছাকাছি নিয়ে আসতে চাই। কিন্তু বলাবাহুল্য, তাঁরা তা পারেননি। আধুনিক মনস্তত্ত্বে জটিল অলিগলির সন্ধান দিতে গিয়ে তাঁরা কবিতা বিষয়কে কেবল জটিল করে তোলেন নি, ভাষাকেও জটিল করে তুলেছেন।
ভাষার প্রশ্নে পাঁচ ব্রাহ্মণ কবির চারজনই ব্রাহ্মণ্যবাদী, এক ব্রাহ্ম জীবনানন্দ দাশই অনেকাংশে জনগণতান্ত্রিক। বুদ্ধদেব বসু ঠিকই ধরেছিলেন। এজন্য জীবনানন্দ দাশের ভাষার সোজাসাপটা স্বভাবকে নিয়ে তিনি যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তিরিশের দশকের কবিদের কাব্যভাষার স্বপ্ন সম্ভবত বাস্তবায়িত হল তাঁদেরই চেলা ঢাকার কবি শামসুর রাহমানের মাধ্যমে; যাঁর প্রথম কবিতা ‘রূপালি স্নানে’ছিল জীবনানন্দেরই আছর। কবিতা খড়খড়া মুখের ভাষার কাছাকাছি চলে আসল শামসুর রাহমানের কবিতায়। চেনা চারপাশ, চেনা ভাষা রূপ পেল শামসুর রাহমানের হাতে। কিন্তু কবিতা থেকে বিদায় নিল অচেনা কল্পলোকের বাস্তবতা, যেটি মহৎ কবির অন্যতম লক্ষণ। শামসুর রাহমানের কবিত্বের বয়স যত বাড়তে লাগল, জীবনানন্দ দাশ থেকে বের হয়ে যত নিজস্ব ব্যক্তিত্বের চেহারায় স্পষ্ট হতে লাগলেন ততই যেন প্রত্যক্ষ জগতের বয়ানের কবি হয়ে উঠতে লাগলেন। ফলে শামসুর রাহমানের কাব্যভাষা প্রত্যক্ষের চৌহদ্দির মধ্যে হাসফাঁস করতে লাগল। বোধ করি কবিতায় সমকালীন রাজনৈতিকতাকে ধারণ করায় এই ঘটনাটি ঘটেছে। এটিই শামসুর রাহমানের বড় শক্তি এবং সমস্যা বলে মনে হয়। কাব্যভাষার এই ধারাবাহিকতার মধ্যে আল মাহমুদকে বরং বেশি শক্তিশালী মনে হয়। তিনি বাংলা কাব্যভাষায় লোকজ শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এক নতুন কেমিস্ট্রি নির্মাণ করলেন।
কাব্যভাষার এই ইতিহাসের মধ্যে ফেলে মজিদ মাহমুদের কবিতার ভাষাকে আমরা বিবেচনা করতে চাই। কারণ মজিদ মাহমুদের কাব্যভাষা বাংলা কবিতার রবীন্দ্রনাথ কথিত গড়পেটা কাব্যভাষা, রাহমানের মৌখিক ঢং এবং নিজস্ব ভঙ্গির দারুণ এক রসায়ন। ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের ভাষা লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, এর ভাষা মূলত নির্ভার, নির্মেদ, হালকা ভাষার মধ্যে অতিরিক্ত কৃত্রিম কাব্যিকতা নেই। যেমন
‘তোমার পায়ের কাছে নিয়ে যাব ঘুঙুর আমি
তোমার কেশপাশ খুলে বেঁধে দেব ফুলের বিনুনি
ও দেহের বসন খুলে নেমে এসো অন্তর্যামী
মনের মণিকোঠায় সুর তোল রিনিঝিনি
(রিনিঝিনি
উদ্ধৃতাংশে ‘কেশপাশ’- ‘বসন’ শব্দদুটির বিকল্প নিশ্চয় ব্যবহার করা যেত। কারণ কবির গৃহীত ভাষাভঙ্গির সঙ্গে বরং তদ্ভব বা দেশি শব্দের খাতিরই বেশি। কিন্তু কবি তা করেন নি। তিনি প্রথাগত কাব্যভাষার মধ্যেও প্রবেশ করেছেন। এজন্য দেখা যায়, ‘নাক’ব্যবহার না করে কোথাও কোথাও করেছেন ‘নাসিকা’, একইভাবে ‘নিমজ্জিত’, ‘গগনবিদারী’,‘আরণ্যক’, ‘শয়নকক্ষ’, ‘অতলান্ত’,‘ললাট’,‘গমন’, ‘বিলম্ব’,‘ধনীনন্দন’, ‘জনক’, ‘সৌম্যমান’, ‘শিশির সিক্ত’, ‘সর্বহারী’, ‘ধীবর’, ‘শ্রবণেন্দ্রিয়’ – এই ধরনের পুঁথিগত এবং প্রথাগত কাব্যভাষার শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অথচ এমন নয় যে, এসব শব্দের বিকল্প, সরল দেশি বা তদ্ভব রূপ ব্যবহারে কাব্যের কাব্যত্ব বা কবিতার অনুভবের জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হত। বরং আগেই বলেছি, বিকল্প শব্দের ব্যবহারে কবির ভাষা সম্পর্কিত ব্যক্তিত্বটি আরও স্পষ্ট এবং দৃঢ় হত। কিন্তু কবি তা করেন নি। তিনি দুইকূল রক্ষা করে নির্মাণ করেছেন তাঁর কাব্যভাষা। ফলে কবি তৃতীয় নিজস্ব একটি কূলের অধিকারী হয়ে উঠেছেন। কবির দ্বিতীয় কূলের ভাষাভঙ্গির কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। কবি তাঁর কবিতার চরণে এবং বোধের খাপ হিসাবে সহজেই ব্যবহার করেছেন ‘পাটিপোড়া’, ‘বাঁচবার’, ‘গাল’, ‘পাছ’, ‘খরাদগ্ধ’ (রৌদ্রদগ্ধ নয়!), ‘মড়ক’, ‘আলগা’, ‘হামা’(হামাগুড়ি অর্থে), ‘জায়গা’, ‘তিনকুড়ি বছর’ (ষাট বছর নয়), ‘গরব’, ‘নুন’, ‘ইঞ্চি তেরো’, ‘ইস্টিশান’ এ জাতীয় শব্দ। এই দ্বিতীয়কূলের শব্দ এবং এই শব্দ অনুসারী বাকভঙ্গি ব্যবহার করার কারণে কবিতার ভাষার চোরাগলিতে পাঠক খেই হারিয়ে বসে পড়ে না। বরং পাঠক স্পর্ধিত এবং উৎসাহিত হয়ে ওঠে কবির ইশারামারা বোধের জগতকে নিজের বুঝ দিয়ে গ্রেফতার করার আকাঙ্ক্ষায়। ঔপনিবেশিত বাংলা কবিতা পাঠককে পাঠের এবং শ্রুতির যুগপৎ আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেছে। ‘মাহফুজামঙ্গল’র কাব্যভাষা এই বঞ্চনাকে রুখে দেওয়ার স্পর্ধা দেখিয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। তবে এই কাব্যভাষার রাজনীতিতে মজিদ মাহমুদ সর্বৈব বিপ্লবী নন, তিনি কিছুটা সমন্বয়বাদী। এই সমন্বয়ের মধ্যেই তাঁর কাব্যভাষার তদ্ভব শব্দবহুলতা এবং মৌখিক বাকভঙ্গির পাল্লাটি অনেক ভারি। এর ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যাবে। কাব্যই বোধ হয় সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তবু একটা নমুনা পাঠকদের চাখাতে চাই –
‘মাহফুজা আমার বিপরীতে ফিরায়ো না মুখ
যেন কোন দিন বঞ্চিত না হই তোমার রহম
সারাক্ষণ আমাকে ঘিরে থাকে যেন তোমার ক্ষমা
তুমি বিমুখ হলে আমাকে নিক সর্বাহারী যম
তাহলেই খুশি হব বেশ তুমি জেনো প্রিয়তমা
তুমি নারাজ হলে বেড়ে যায় আমার অসুখ।
তুমি তো জানো কি করে করি আজ জীবন ধারণ
আমাদের চারপাশ ছুঁয়েছে বড় ক্লেদাক্ত জরা’
নিঃসন্দেহে উদ্ধৃতাংশের ভাষা অহেতুক কচকচানি থেকে মুক্ত। পড়ার আরামকে একমাত্র দীর্ঘশ্বাসের আরামের সাথেই তুলনা করা যায়। ‘রহম’ আর ‘নারাজ’ শব্দের অশিক্ষিত অথচ অব্যর্থ ব্যবহারের কথা না হয় না-ই বললাম। ‘মাহফুজামঙ্গল’র কাব্যভাষার গায়ে আরবি ফারসি শব্দের এমন ব্যবহার হামেশাই পাঠকের চোখে পড়বে। তবে অনেক ক্ষেত্রে আরবি ফারসি শব্দগুলো ‘রহম’আর ‘নারাজ’-এর মত কথ্য কথাভঙ্গির মেজাজে আঁকাড়াভাবে ব্যবহৃত না হয়ে তৎসম আকারে ব্যবহৃত হওয়ার পর্যাপ্ত মধু ছড়ায়নি বলেই মনে হয়েছে। তবু সব মিলিয়ে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের ভাষা বাংলাদেশের কাব্যভাষার জগতে স্বতন্ত্র, ব্যক্তিত্ববান এবং ঔপনিবেশিত কাব্যভাষার বিপরীতে এক দারুণ রাজনৈতিক অবস্থান। ভাষায় মজিদ ঢং সর্বস্ব নন। ভঙ্গি দিয়ে তিনি মন ভোলান না বরং মন, মনন আর কল্পনার নতুন জগত দিয়ে তিনি ভঙ্গিকে ভুলিয়ে রাখেন
‘মাহফুজামঙ্গল’কাব্যের ভাষার কথা বলতে গিয়ে এর আরেকটি দিক না বললেই নয়, সেটি হচ্ছে এর জনপ্রিয়তার দিক। উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে এর জনবিচ্ছিন্নতা। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের মধ্যে ছিল এর গণগ্রহণযোগ্যতা। সাহিত্যের ভোক্তা ছিল জনান্তিকের ব্যক্তি নয়, গোষ্ঠী। সমষ্টির শ্রুতিসুখ এবং দৃষ্টিসুখের আকর ছিল বাংলা কবিতা। এই সমষ্টির ভোগ-উপভোগ এবং যাপনের অংশ হিসাবে প্রচলিত সাহিত্য ঔপনিবেশিক পর্বে এসে আত্মগোপন এবং আত্মরক্ষা করল ড্রইং রুমে। শুরু হল সাহিত্যের প্রাইভেট উপভোগের প্রাইভেট যাত্রা। সেই যাত্রার মধ্যেই বাংলা সাহিত্য হাবুডুবু খেতে লাগল এবং সেই যাত্রাই মঞ্চ¯’ হতে লাগল বাকি দুই-আড়াইশ বছর ধরে। এই ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যে ‘জনপ্রিয়তা’বা‘লোকপ্রিয়তা’ খুবই আপত্তিকর ব্যাপার! ‘ভদ্রলোক’ কি বলেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার! কিন্তু ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যের ভাষা, এর বিষয় এবং প্রকাশভঙ্গির মধ্যে জনপ্রিয়তার বীজ লুকোনো আছে। এই কাব্যের প্রতি আমাদের অভিসম্পাত রইল, ‘মাহফুজামঙ্গল আরও জনপ্রিয় হোক’।
লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক

কুদরত-ই-হুদা। প্রাবন্ধিক ও গবেষক। জন্ম ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৮; বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙা উপজেলায়। সরকারি কলেজে অধ্যাপনার সাথে যুক্ত। বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘ডিসেমিনেশন অফ নিউ কারিকুলাম স্কিম’-এ উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ থেকে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রকাশিত গ্রন্থ : শওকত ওসমান ও সত্যেন সেনের উপন্যাস : আঙ্গিক বিচার [২০১৩], জসীমউদ্দীন [২০১৮], জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ : বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিতা [২০২২]। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকা, বাংলা একাডেমি পত্রিকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা-জার্নালের সংখ্যা বিশের অধিক। গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন ‘মহাকবি মধুসূদন পদক-২০২৩’।



