কবি মজিদ মাহমুদ ‘কবিতামালা’ শিরোনামে তাঁর এগারটি কাব্যগ্রন্থ সম্প্রতি পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন। ‘মাহফুজামঙ্গল’ (১৯৮৯) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে মজিদের কাব্যযাত্রা সূচিত হয়েছিল প্রায় তিন দশক আগে। গত বছর বইটির রজতজয়ন্তী উপলক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল ঢাকায়; আর সে কারণে আমিও বইটির ওপর লিখেছিলাম। এই কবির সঙ্গে আমার পরিচয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ দিয়েই। পঁচিশ বছর কম কথা নয়। অনেকেই কাঁচা হাতের কবিতা পরিণত বয়সে অস্বীকারও করেছেন, করেন; কেউ কেউ পুনর্লিখনের মাধ্যমে পুনর্মার্জিত করেন। মজিদের জন্য তার দরকার হয়নি, প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তিনি পরিণত এবং এখনও যা সগর্বে বহন করছেন। পঁচিশ বছরে দুনিয়া অনেকখানি বদলে গেছে; এমন কি বাংলা কবিতার ভাষা, আঙ্গিক; ক্ষেত্র বিশেষে বিষয়বস্তু পর্যন্ত; কিন্তু মজিদের কবিতা ভাষা ও বিষয়-গৌরব হারিয়ে ফেলেনি।
মজিদের কবিতা খুব ভারি কবিতা। সস্তা হাততালি পাওয়া কবিতা নয়। তাঁর কবিতা উপলব্ধি করতে হয়, নিমগ্নতা নিয়ে পড়তে হয়। তিনি কেবল সমকালীন নন, বাংলা কবিতার উত্তরাধিকারের মধ্যেও আলাদা কবিতা লেখেন। আমরা বড় কবিদের যাঁদের দেখেছি, বাংলা ভাষা কেন পৃথিবীর সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবি – তাঁরা কমিউনিকেটিভ পোয়েট – তাঁদের ভাষা যোগাযোগের ক্ষমতাসম্পন্ন। মজিদের ভাষা কমিউনিকেট করে; কিন্তু পরিণামে ঘোর লাগিয়ে দেয়। তাঁর কবিতায় আছে একটি ধাঁধা – যেটি সে দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করেন। আর এ কাজটা তিনি সতর্কভাবে করতে পারেন।
তাঁর প্রতিটি বই থেকে উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করতে পারলে ভাল হত। কারণ তাঁর যে ‘বল উপাখ্যান’, তাঁর সব কবিতা আমি কমিউনিকেট করতে পারি না। কিন্তু প্রতিটি বাক্য আমি পড়ে অর্থ পাই। যখন একটি কবিতা শেষ হয়ে যায় তখন একটি ঘোরলাগা বিপন্ন বোধ কাজ করে। ফলে তাঁর কবিতা দৃশ্যত সরল মনে হলেও – যেটি বাস্তবে চেতনার গহীনে একটি সংকট তৈরি করে; একটি দ্বিধা, একটি দ্বন্দ্ব আধুনিক কবিতার প্রাণ বলে মনে করা হয়, সেটি তাঁর কবিতা প্রবলভাবে শাসন করে। কবিতা হচ্ছে এক ধরনের রহস্যময়তা, এক ধরনের সাঙ্কেতিক ইশারা – পাঠকের ভাবার জন্য কিছু রেখে দিতে হয়। মজিদ নিজের মত করে বাকপ্রতিম ব্যবহার করেন, শব্দের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে তিনি শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। সেই সঙ্গে মজিদের ব্যবহৃত শব্দগুলো কেবল তাঁর নিজস্ব, অন্য কারও নয়; এমনকি এগুলো কেউ ব্যবহার করলেও বোঝা যায় এটি মজিদীয় শব্দবন্ধ। এখানেই মজিদ মৌলিক।
আমার বিশ্বাস প্রত্যেক কবিতার নিজস্ব ভাষা ভঙ্গি এবং কিছু শব্দ – যা দেখলে তাকে চেনা যাবে। মজিদের ‘বল উপাখ্যান’, ‘আপেল কাহিনি’, ‘ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম’ এবং অন্যান্য যে কবিতার বইগুলো প্রত্যেকটিতে মজিদীয় দর্শন, জীবন, বিশ্বাস ও সমকালীন চেতনার স্বাক্ষর রয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে – তাঁর কবিতায় রাজনীতি নেই বলে অনেকেই ভুল করতে পারেন। অথচ তিনি প্রবলভাবে রাজনীতি সচেতন কবি; তাঁর কবিতায় প্রবলভাবে সমকাল আছে। কিন্তু সে সমকালীনতা শ্লোগানের পর্যায়ে না থেকে সাঙ্কেতিকতা নিয়ে হাজির হয়েছে; রূপক প্রতীকের ব্যবহারও তাঁর কবিতায় প্রবল। বিগত প্রায় দুই যুগ ধরেই আমি মজিদের কবিতার মুগ্ধ পাঠক। তাঁর কবিতা সর্বদাই আমাকে নতুন কিছু দেয়। তাঁর কবিতা ভাষার মারপ্যাচ থেকে বেরিয়ে এসে আইডিয়ার জগতে প্রবেশ করে। আর এই আইডিয়াগুলো কেবল সামাজিক বা নৃতাত্ত্বিকভাবে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত নয়; এগুলো সর্বোপরি একটি দর্শন যা আমাদের ব্যস্টিক ও সামষ্টিক অস্তিত্বের সংকট নিরসনে ইঙ্গিত বহন করে। তবে তাঁর বর্তমানের কাব্যসংকলনটি আমাকে বিস্মিত করেছে তাঁর বহুমুখী চেতনা ও বারংবার নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার ক্ষমতা দেখে। প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে মজিদ নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরেছেন; কখনো দীর্ঘ, কখনো অতি ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যে নানা আঙ্গিকে তিনি বোধের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর হাতে গদ্যছন্দের এক গতিময় প্রকাশ ঘটেছে – যা বাংলা কবিতার বিরল প্রয়োগ তাঁর কবিতার বিষয় ও আঙ্গিকে এমন কিছু নতুনত্ব রয়েছে এই গ্রন্থটি পাঠ না করলে তা বোঝানো মুস্কিল। তাছাড়া মজিদের সমকালীন কবিদের ক্ল্যাসিক ছন্দের প্রতি যে অনীহা লক্ষ্য করা যায় এই গ্রন্থ তা থেকে মুক্ত।

মজিদ আসলে তাঁর কবিতায় একটি কথকবৃত্তি গ্রহণ করেছেন; মধ্যযুগে আমাদের কবিরা যেভাবে শ্রোতার উদ্দেশ্যে নিজেদের বাণী ও কাহিনিকে মেলে ধরতেন, মজিদের বাকভঙ্গিও অনেকটা তাই। মনে হয় তিনি যা নিয়ে কথা বলছেন, তা যেন সমাজে একটি বহুকথিত বিষয় সিদ্ধান্ত আকারে বিরাজ করছে, আর তিনি সেইসব বিষয়সমূহ একের পর এক মানুষের সামনে তুলে ধরছেন। আর এটি করতে গিয়ে তিনি প্রচুর মিথ, প্রাচ্যপুরাণ ও লোক-কাহিনির আশ্রয় নিচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মিথের এমন সফল ব্যবহার সমকালীন বাংলা কবিতায় খুব একটা চোখে পড়ে না। এসব নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেও প্রচুর ভ্রান্তিকর মিথের জন্ম দেন। মজিদ যখন বলেন, ‘মহিষের শিং ধরে ভেসে যাচ্ছে আদিম মেয়োসিস’তখন বিজ্ঞানের পরিভাষাও পৌরাণিক চরিত্রে রূপ নেয়। তাছাড়া ‘আপেল কাহিনি’ সহ অসংখ্য কবিতায় তিনি আপাত পৌরাণিক আবহ তৈরি করলেও বাস্তবে উদাহরণরহিত; আর তাতেই তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে আরও রহস্যঘন, এবং পাঠক এক বিপন্নতা অনুভব করতে থাকেন।
বর্তমানে ‘কবিতামালা” গ্রন্থটি মজিদ মাহমুদের পঞ্চাশতম জন্মদিন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমার মনে হয় এটি কবিকে বোঝার ক্ষেত্রে দারুণভাবে কাজে লাগবে। কারণ অধিকাংশ পাঠক মজিদ মাহমুদকে মাহফুজামঙ্গলের কবি বলে জানেন; এই গ্রন্থটি তাঁর অপনোদন ঘটাবে। মাহফুজামঙ্গল পাঠকপ্রিয়তা পেলেও বর্তমান গ্রন্থটি কবির কাব্যশক্তির প্রমাণ তুলে ধরতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখবে।
লেখক : সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি, বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত



