মজিদ মাহমুদ আশির দশকের বাংলা কবিতার আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ‘মাহফুজামঙ্গল’তাঁর প্রথম কবিতার বই। বইটির প্রকাশকাল ১৯৮৯ হলেও ক্রমপরিক্রমার বিবেচনায় কবি মজিদ মাহমুদকে আশির দশকেই স্থান দিতে হয়। তবে মধ্যযুগের শেষ কবি ভারতচন্দ্রের হাতে মঙ্গলকাব্যের ধারার যে পদার্পতন ঘটে, সে পর্দার পুনরুন্মোচন হয় মজিদ মাহমুদের হাতে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে মঙ্গলকাব্যধারা সূচিত হয়েছে; নামিক বিবেচনা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে মজিদ মাহমুদের ‘মাহফুজামঙ্গল’ এক্ষেত্রে নিছকই একটি নাম। মঙ্গলকাব্যের ধারার সাথে একে সেভাবে মেলানো চলবে না। কাব্যগ্রন্থের উৎকর্ষ বিবেচিত হয় তার শিল্পসফলতার বিবেচনায়। সে কারণেই আমাদের আলোচনা হবে ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর কাব্যরস তথা শিল্পপ্রকরণ বিষয়ে।
গীতিকবিতা হলো কবির মানসছবির প্রতিফলন। নিজের সকল প্রকার অনুভূতিকেই কবি তাঁর কবিতায় স্থান দেন। সমাজের নানা অনুষঙ্গও এতে স্থান পায়। মজিদ মাহমুদ সময় সচেতন কবি। তাই স্বকালের যুগযন্ত্রণা, আধ্যাত্ম্য-ঊষরতা আর মানসদ্বন্দ্বকে পাথেয় করে তাঁর কবিতা অগ্রসর হয়েছে।
মঙ্গলকাব্য ধারাকে বিবেচনায় রাখলে ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর প্রকরণশৈলী আখ্যানধর্মী হওয়ার কথা থাকলেও কার্যত তা নয়। কাব্যগ্রন্থের নামিক দিক এক্ষেত্রে আমাদেরকে অন্যতর বিবেচনা এনে দেয়। আদপে মজিদ মাহমুদ-এর ‘মাহফুজামঙ্গল ’ নিছকই একটি গীতিকবিতার বই। এতে বারবার মাহফুজার অনুষঙ্গ আনা হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এ গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্র। বড়জোর বলা চলে, সিক্যুয়েল কবিতামালার সম্মিলন ঘটেছে মজিদ মাহমুদ-এর ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থে।
সাহিত্য ফলের গাছও নয়, ফুলের দোকানও নয়। সুতরাং এর ডাল থেকে সুস্বাদু ফল পেড়ে পেট পুরে খাওয়ার কিংবা দোকান থেকে বিয়ের গাড়ি সাজিয়ে নেওয়ার বা উৎসব পার্টিতে ফুলের মালা, তোড়া কিনবার কোনও প্রকারের সুযোগ এতে নেই। সাহিত্য ধনভান্ডারসমৃদ্ধ দেবী লক্ষীও নয়, আবার কুচযুগ শোভিত বীণাপাণিও নয়। তাই ধনপ্রাপ্তির লিপ্সাপূরণ হওয়ার কিংবা বিদ্যালাভের তৃষ্ণার নিবারণ হওয়ার কোনও উপায় এখানে নেই। একটি উপন্যাস বা কবিতার বই পড়বার অব্যবহিত আগে এবং পরে আমাদের আর্থিক ব্যালেন্স যথাসই থাকে। তদ্রুপ বলা চলে, পকেটে ১০০ টাকা নিয়ে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটি পড়া শেষ হয়ে গেলেও আমাদের পকেটে সে-ই ১০০ টাকাই থাকবে।
প্রশ্ন এসে যায় – ‘মাহফুজামঙ্গল’ তাহলে পড়বো কেন? প্রথম উত্তর হলো, বইটি পড়লে এযুগেও আমাদের মঙ্গলকাব্যের নাম জানবার সুযোগ থাকে। আর যারা অপাঠ্য (!) মধ্যযুগকে রিসাইক্ল বিন থেকেও ডিলিট করে দেওয়ার চিন্তায় ছিলেন, তাঁরা নতুন করে ‘মঙ্গলকাব্য’ এবং যুগপৎ ‘মাহফুজামঙ্গল’ নিয়ে নবতর অনুধ্যানে নিমগ্ন হবেন। মজিদ মাহমুদ-এর ‘মাহফুজামঙ্গল’ এ যুগের পাঠকদের মধ্যে এক নব বীক্ষণিক সুযোগ করে দিয়েছে।
‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটি তিনটি খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ডটির নাম ‘মাহফুজামঙ্গল পূর্বখন্ড’। দ্বিতীয়টি ‘মাহফুজামঙ্গল উত্তরখন্ড’। আর শেষ খন্ডের নাম ‘যুদ্ধমঙ্গলকাব্য’। এ তিনটি খন্ডে সাকুল্যে কবিতার সংখ্যা তিরাশি। মজিদ মাহমুদ-এর আধ্যাত্মিক চেতনার স্বল্প ছোঁয়াচ রয়েছে প্রথম খন্ডে। দ্বিতীয় খন্ডে তার চূড়ান্ত প্রকাশ দেখতে পাওয়া যায়। আর, শেষ খন্ডে রয়েছে পরিণতির ছাপ।
‘কুরশিনামা’ ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা। মজিদ মাহমুদ সুফিবাদকে নিপুণভাবে সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন এ কবিতায়। সাধনতত্ত্বের গুরুবাদী ধারা উচ্চকিত হয়েছে এখানে। গুরু আর ঈশ্বর, এমনকি সাধক নিজেও একার্থক হয়ে যান এরূপ সাধনায়। লালন সাঁই বলেন-
আল্লা কে বোঝে তোমার অপার লীলে
(তুমি) আপনি আল্লা ডাক আল্লা বলে।।
তুমি আগমের ফুল, নিগুণের রাসুল
এসে আদমের ধড়ে জান হইলে।।
সাঁইজির বাণী বোঝা ভার। ততোধিক দুঃসাধ্য তার ব্যাখ্যাকরণ। তথাপি বলবার চেষ্টা করে বলা যায়, আল্লা-আদম-মুহাম্মদ এখানে একার্থক। মজিদ মাহমুদ তাঁর ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর অনেক কবিতায় পরম-জীব আর গুরুকেও সমার্থক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ‘কুরশিনামা’ কবিতায় কবি বলেছেন
ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
মাটির পৃথিবী ছেড়ে সাত তবক আসমান ছুঁয়েছে
তোমার কুরশি
তোমার স্মরণে লিখেছি নব্য আয়াত
আমি এখন ঘুমে-জাগরণে জপি শুধু তোমার নাম।
এখানে মাহফুজা গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ। গুরুর বাতলে দেওয়া সাধনপথে হাঁটলেও কবির দৃষ্টিতে ঈশ্বরের অবস্থিতি এসে ধরা দেয় গুরুরূপী মাহফুজায়। তাই তো সাত-তবক দূরে থাকা কুরশিতে মাহফুজার অবস্থান। আর, মাহফুজার নাম জপকরণের মাঝেই সার্থকতা খুঁজে পান কবি। ‘এবাদত’ কবিতায় মজিদ মাহমুদ বলেছেন-
মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।
আপাতদৃষ্টে একে জৈবিক রসের আকর মনে হলেও এটি নিছক একটি আধ্যাত্মিক কবিতা। গুরুতির সাধনকথা বাউলবৈষ্ণব দর্শনের অন্যতম মৌলচেতনা। শিষ্যের কর্তকে যোনি করে জিহ্বারূপ লিঙ্গ দ্বারা গুরুশিষ্যের রতিক্রিয়া চলে উপযুক্ত সাধনায়। মজিদ মাহমুদও ‘এবাদত’কবিতায় মাহফুজা (গুরু)র শরীরকে নেড়েচেড়ে দেখেন আর রতিসাধনা করেন। এটাই তাঁর এবাদত। ‘এন্টার্কটিকা’কবিতায় মাহফুজা ঈশ্বরের আদলে উপস্থাপিত। পুরো পৃথিবীটাকে কায়া করে মূর্ত হয়েছেন ঈশ্বররূপী মাহফুজা। এই ঈশ্বর কবির কাছে কখনও সাধনযোগ্য, কখনও গুরুতুল্য, কখনও প্রেয়সী স্বরূপ। কোথাও কোমলতর, কোথাওবা রুদ্ররূপ ঈশ্বরের সন্ধানও মেলে ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর বিভিন্ন কবিতায়। ‘তোমার অহংকার’ কবিতায় কবির ঈশ্বরের রুক্ষতাকে উপস্থাপন করেছেন এইভাবে :
মাহফুজা তোমার কারণে যদি ধসে যায় ট্রয়
মরে যায় গ্রিকের সভ্যমানুষ
তাহলে দায়ী কে তুমি না মানুষ
তোমাকে রাখতে হবে স্রষ্টার গরব
তোমার অবাধ্যতায় কত জনপদ হয়েছে খতম
মানুষের কষ্ট দেখে তোমার কাঁপবে না বুক
মানুষের সুখ দেখে তোমার জাগবে না রোমাঞ্চ
কেবল তোমার অহংকার
নিষ্পলক চেয়ে রবে ভবিষ্যের দিকে …
সহজিয়া-সুফি-বৈষ্ণব-বাউল দর্শনে সদ্গুরুর সন্ধানের কথা বল্ম হয়েছে। সদ্গুরু তিনিই যাঁকে ঈশ্বর ভাবা যায়, যাঁর মাধ্যমে ঈশ্বরকে কাছে পাওয়া যায় – ‘ফানাহ্’ হওয়া কিংবা ‘বাকাবিল্লাহ্’র স্তরে পৌঁছানো যায়। সেই গুরুর স্থলে আর একজনকে স্থান দেওয়ার বৈধতাও আছে এ সমস্ত দর্শনে। ‘যা ছিল সব নিয়ে গেলি’ও ‘দাক্ষিণ্যে’কবিতায় মজিদ মাহমুদ এমন কাজই করেছেন। গুরুরূপী মাহফুজার প্রতিস্থাপনে এখানে অন্য নারী বিরাজিত। ঈশ্বরের বিপরীতে যেন প্রতি-ঈশ্বরের স্থান হয়েছে এ কবিতায়। এ কবিতায় কবির ভাষ্য-
তোর স্থলে এসেছে নূতন রমণী
তোর মতো সে হিংসুটে নয় কৃপণ নয়
রবীন্দ্রনাথ ‘দেবতারে প্রিয়’ আর ‘প্রিয়েরে দেবতা’ করবার কথা বলেছেন। মজিদ মাহমুদ এ কবিতায় অন্য একজনকে দেবী করেছেন ঠিকই, অথচ দেবীকে ঠেলে দিয়েছেন অনেক দূরে। বৈষ্ণবরা বলেন – ‘জল খাইও ছাইনা, গুরু কইরো জাইনা’। কবিও যেন ছেনেজেনে মেনে নিয়েছেন তাঁর নতুন গুরুকে। মনে হয় বেশ তৃপ্ত তিনি। তাইতো তিনি বলেন –
তোর স্থলে এসেছে সে
সকাল-সন্ধ্যা চিলেকোঠায় বসে থাকে
আমার জন্যে, সবার জন্যে
‘মঙ্গলকাব্য (এক-ছয়)’ এবং ‘মাহফুজা’কবিতায় মজিদ মাহমুদ-এর কবিত্বশক্তি বেশ বিকশিত। ‘মঙ্গলকাব্য’ শীর্ষক কবিতায় কবির ঈশ্বরবিশ্বাস, সাধন-তরিকার সন্ধান আর মাহফুজা-চিন্তনের পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। অন্যদিকে ‘মাহফুজা’ কবিতায় কবির রাজনীতিক-সামাজিক সত্তার বিচ্ছুরণ ঘটেছে। দেশপ্রেমের আবহে এ কবিতাটি রচিত। মাহফুজা এখানে দেশমাতৃকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী। মনসুর হাল্লাজ, যিশুখ্রিষ্ট, চিতাভস্ম ইত্যাদি শব্দের পাশাপাশি এ কবিতায় উঠে এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আর্মেনিয়ার ভূমিকম্পন, হিরোসিমা-নাগাসাকির প্রসঙ্গ। একজন মানুষের সার্বিকতা নিয়ে মজিদ মাহমুদ ‘মাহফুজা’ কবিতায় নিজেকে বিম্বিত করেছেন।
‘মাহফুজামঙ্গল উত্তরখন্ড’-এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা ‘ক্রীতদাসী’, ‘ডালিমকুমার’ ও ‘বিষকাঁটা’। বৈষ্ণব রসের বিচারে এগুলো সখ্যরসের কবিতা। বন্ধু যেমন বন্ধুকে তুই-তোকারি করে, আবার গালিগালাজ করে; তেমনি ভালোও বাসে। বন্ধুত্বের সংজ্ঞায় ভাই, মামা, শালা, কাকা একার্থক হয়ে যায়। এসব কবিতার ঈশ্বরও যেন উল্লিখিত বন্ধু-সখার মতো। ‘ক্রীতদাসী’র কবিভাষ্যটি এরূপ-
মাঝে মাঝে তোমাকে বিপরীত নামে ডাকি
বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে কুৎসা
আরাধনার শব্দ ঘৃণার সমার্থক হয়ে যায় …
‘বিষকাঁটা’ কবিতায় কবি বলেছেন
এবার ফুলের বদলে অসংখ্য বিষকাঁটা
এবার প্রতিমার বদলে গড়েছি সঙ
দেবালয়ে বাজছে অসুর সংগীত ..
অন্যদিকে, ‘হেয়ারলিপ্স’ কবিতায় কবি মাহফুজাকে যমজ বোন বলেছেন। খন্ডিত খরগোশের মতো দ্বিখন্ডিত নাক নিয়ে একই মায়ের পেটে মাহফুজাকে নিয়ে শুয়ে থাকবার যে কথা কবি বলেছেন, তাতে প্রথম মানবীর গর্ভধারণের এবং পরবর্তী বংশবিস্তারণের প্রসঙ্গটি উপস্থাপিত হয়েছে। ‘পয়দায়েশ’ কবিতাতেও কবি সৃষ্টিতত্ত্বকে স্থান দিয়েছেন। ‘আদ্যাক্ষর’, ‘যূপকাঠ’ও ‘মাছের পোনা’নাম্নী কবিতাতেও কবি মাহফুজাকে মায়ের আসনে বসিয়েছেন।
‘নাম’শীর্ষক কবিতাটি মজিদ মাহমুদ-এর ঈশ্বরচিন্তার পূর্ণ অভিব্যক্তি। বৈষ্ণবদের চির বৈকুণ্ঠ লাভ, বৌদ্ধদর্শনের নির্বাণ লাভ, কিংবা সুফিদের বাকাবিল্লাহ্র স্তরে উত্তরণ -এ সমস্তকে ধারণ করে এটি একটি সার্থক কবিতা। মজিদ মাহমুদ-এর কবিত্বশক্তির পরম প্রকাশ ঘটেছে ক্ষুদ্রায়তনের এ কবিতায়। কবির শিল্পীসত্তার পরিপূর্ণতায় আর কবিধর্মের শ্রেষ্ঠতায় ‘নাম’কবিতাটি এ সময়ের বাংলা কবিতার ধারায় অন্যতর সাক্ষরবাহী। গ্রষ্টার নিরানব্বইটি নামের একটি নাম ‘মাহফুজা’বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। আর কবি এখানে ‘মাহফুজা’নাম ধারণ করেছেন; যা ‘মাহফুজা’র পুংলিঙ্গিক রূপ। বৈষ্ণবরসতত্ত্বের বিচারে এটি মধুর রসের অভিব্যক্তি। মাহফুজারূপী কবির কানে কেবলই মাহফুজার প্রতিধ্বনি। প্রেমিক কবি নিজেকে মাহফুজায় লীন করে তার অংশী হয়েছেন। নাম ধরেছেন ‘মাহফুজ’। একে একে দুই নন ‘এক’ হয়েছেন।
‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থের পুরো শরীর জুড়ে মজিদ মাহমুদ মাহফুজার নানা রূপকে তুলে ধরেছেন। মাহফুজা কখনও ঈশ্বর, কখনও সদ্গুরু, কখনও বা পথভ্রষ্ট দিশারী, কখনও স্বর্গের নর্তকী ও বেশ্যারূপী (সঙ্গীতের ভেতরও বিদগ্ধ মাধব)। কোথাও বা প্রতি-ঈশ্বররূপে মাহফুজার আবির্ভাব। জগৎ ও জীবনের নানান অনুষঙ্গকে ধারণ করে মাহফুজাই হয়ে উঠেছে কবির সার্বিকতা। ‘বহুগামী’ কবিতায় মাহফুজা তেত্রিশ কোটি দেবতার ভিন্ন ভিন্ন নাম। অথচ এ তেত্রিশ কোটি নামের একটাই প্রতিরূপ। সেটি হলো ‘মাহফুজা’।
সামাজিক মানুষ হিসেবে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতায় সমাজ- রাজনীতি-প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ টেনেছেন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কথা বলেছেন (এন্টার্কটিকা)। রাজনৈতিক আগ্রাসনের উল্লেখ করেছেন (মাতাল ডোম)। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবিক বিপর্যয় কবিকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মানবতার অপমান কবিকে চরমভাবে ব্যথিত করেছে। মানুষের জীবনে দুঃখভোগ একটি অবধারিত বিষয়। যে কোনও মূল্যেই সে শান্তি চায়। নিজের মতো করে প্রত্যেকে খুঁজে ফেরে সুখের নীড়ে। জীবনানন্দ যেমন হাজার বছরের পথচলার শেষে বনলতা সেন-এর সন্ধান লাভ করে তৃপ্ত হন। মজিদ মাহমুদও নিজের মতো করে নিজের স্বর্গ এঁকেছেন মাহফুজায়। কবিসত্তার সবটুকু জুড়ে তাই কেবলই মাহফুজা মঙ্গলের আধার। এ আধারের যোগ্য আধেয় হয়ে ওঠাই তাঁর- কবি জীবনের একমাত্র সাধনা।
মানুষকে কেবলই লোভ দেখিয়ে যারা ধর্মপালন করতে বাধ্য করে, ধর্মকে যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করবার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে মজিদ মাহমুদ উচ্চকণ্ঠ। সত্তরগুণ আজাব কমে যাওয়া, বেহেশতে সত্তরটি হুরপরী ভোগের সুযোগ, সত্তর গুণ সওয়াব, অনন্তকাল নরকযন্ত্রণা ভোগ থেকে মুক্তিলাভ, চিরবৈকুণ্ঠ প্রাপ্তি ইত্যাদি কারণ দেখিয়ে সাধারণত ধর্মপথে লিপ্ত হতে বলেন ধর্মের প্রবক্তাগণ। এ সমস্ত কথা যতবার বলা হয়, তার চাইতে অনেক কম বলা হয় আল্লাহ্, ঈশ্বর বা গড়-এর সান্নিধ্য লাভের বিষয়টি। আর আজকাল তো রাজনীতিবিদগণ নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা লুটবার জন্যে ধর্মের যথেচ্ছ ব্যবহার করেন। মজিদ মাহমুদ তাঁর ‘আড়িপাতা’, ‘মন্দির’, ‘কেয়ামত’ শীর্ষক কবিতাগুলোতে ধর্মের পলিটিসাইজ্ড হওয়ার কথা ঘৃণাভরে ব্যক্ত করেছেন। ‘সঙ্গে থাকবে’ কবিতায় কবির রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। ‘আড়িপাতা’ কবিতাটির কয়েক ছত্র নিম্নরূপ
প্রভু তোমার ফেরেশতাদের কিছুদিন ছুটি দাও
মাহফুজার সাথে এবার আমি ঘুরতে যাব
আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে
আর কাউকে থাকতে দিও না
সরকারের এজেন্ট ওরা আড়িপাতা স্বভাব।
‘মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি’ কবিতাটি ‘মাহফুজামঙ্গল উত্তরখন্ড’-এর চূড়ান্ত কবিতা বলে আমার মনে হয়েছে। ক্রমবিবেচনায় এটিকে এই খন্ডের একেবারে শেষে স্থান দেওয়াই ভালো হতো। কবির কাব্যসাধনায় নির্বাণ লাভ ঘটেছে এ কবিতার মাধ্যমে। প্রব্রজিত ভিক্ষুসংঘের সন্ধান কবি লাভ করেছেন মাহফুজার মাধ্যমে। চরম তৃপ্ত তিনি তাই বললেন …. ধর্মং শরণাং গচ্ছামি;/ মাহফুজাং শরণাং গচ্ছামি/ নির্বাণ শরণা গচ্ছামি।’
‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থের শেষ খণ্ড ‘যুদ্ধমঙ্গলকাব্য’। এ অংশের অধিকাংশ কবিতা হাল-প্রকরণের ধাঁচসমৃদ্ধ। কবিতার ভাষা এখন দুটি। পদ্য এবং গদ্য। ‘সন্ধি’কবিতাটি ব্যতিরেকে সবগুলোই দ্বিতীয় প্রকরণের। ‘যুদ্ধ’ সিক্যুয়েলের পাঁচটি কবিতা রয়েছে ‘মাহফুজামঙ্গল’এর তৃতীয় খণ্ডে। মজিদ মাহমুদ-এর যুদ্ধ বিষয়ক চিন্তা আর রাজনৈতিক চেতনার সুস্পষ্ট পরিচয় এসব কবিতায় নিহিত। যুদ্ধের ভয়াবহতার চিত্রবর্ণনের পাশাপাশি যুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতারও উল্লেখ আছে এসব কবিতায়। কবি বলেছেন- যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কে বাঁচিয়ে রেখেছে?
একথা ঠিক, যুদ্ধের ময়দানে মেয়েরা হয় ধর্ষিতা, আর ঘরে থাকে রক্ষিতা হয়ে। যুদ্ধের শেষে তারা হয় জয়ীদের ভোগ্যপণ্য। যুদ্ধের কারণেই ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প জন্ম নিয়েছে ব্রিটিশের কল্যাণে। যুদ্ধের কারণেই বিম্বিসার নিরানব্বই পুত্রকে সাবাড় করেছেন। তথাপি কবি মজিদ মাহমুদ যুদ্ধের অনিবার্যতার কথা বলেছেন। যুদ্ধ না হলে কি আমরা স্বাধীন হতে পারতাম? প্রতিনিয়ত কি আমরা নিজ নিজ প্রবৃত্তির সাথে যুদ্ধ করছি না, অন্যায়ের প্রতিবাদওতো এক রকমের যুদ্ধ। অর্থাৎ যুদ্ধ হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যা চিরচলমান। শান্তি আনয়নই এর একমাত্র উদ্দেশ্য।
আত্মিক-মানসিক-রাষ্ট্রিক শান্তির অভাব পূরণের উপায় হলো যুদ্ধ।‘সন্ধি’ নামক কবিতাতেও কবি যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেছেন। কবির মতে যুদ্ধ হচ্ছে সমাধানের উপায়। সন্ধি করবার পূর্বশর্ত। সে বিবেচনায় সন্ধি হলো দুটো যুদ্ধের মধ্যকার বিরতিপত্র।‘গেরিলাযুদ্ধ’কবিতাটি ‘মাহফুজামঙ্গল’কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা; উৎকর্ষের বিচারে এটি একটি সার্থক কবিতা। মাহফুজাকে কবি এখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এমনকি শত্রুপক্ষ করে উপস্থাপন করেছেন। তাকে সাদা চামড়ার ব্রিটিশ, ভয়াল পাঞ্জাবি, আগ্রাসী ভিনদেশী হিসেবে অভিহিত করেছেন কবি। সব ক্ষেত্রেই চলছে গেরিলা যুদ্ধ। কেউই এর বাইরে নেই। সব্বাই এ যুদ্ধের অংশী। কবি তাই বলেছেন-
… তোমাকে পরাস্ত করা ছাড়া আমার রক্তের উদ্দামতা থামে না। আমাদের এই শত্রুতা আজন্ম মাহফুজা। এই যুদ্ধ থেকে পাবে না রেহাই আমাদের সন্ততি। তাই আমরা জেগে উঠি প্রবল আক্রোশে বংশপরম্পরায় এই গেরিলাযুদ্ধে।
মজিদ মাহমুদ সুফিবাদী ধারার এ যুগের প্রতিনিধি। সততার একটি জায়গা তৈরি করে এ জাতীয় কবিতা রচনায় ব্রতী হয়েছেন তিনি। ধর্মচিন্তার গাঢ় বিষয়ের পাশাপাশি বেশ সাবলীলভাবে তিনি রাজনীতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়, যুদ্ধ চিন্তার মতো বিষয়কে সংশ্লেষণ ঘটিয়েছেন তাঁর কবিতায়। কবিতার মানগত গুণ তাতে বেড়েছে বৈকি।
শব্দের চমৎকার বুনোট এবং উৎকৃষ্ট শব্দবাছাই কবিপ্রতিভার বিশেষ গুণ। মজিদ মাহমুদ তাঁর ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থে’ বেশ কিছু কবিতায় নিপুণতার সাথে আরবি-ফারসি-ইংরেজি ভাষার এবং বিভিন্ন পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করেছেন। সে কারণেই ‘মাহফুজামঙ্গল’-এ কবিভাষার উৎকর্ষ বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিচিত্র অলংকার আর নানান উপমার ব্যবহার কবিতার শরীরকে নান্দনিক করে। অথচ এ দুটো বিষয়কে বেশ কম প্রয়োগ করেও ‘মাহফুজামঙ্গল’-এর কবিতাগুলো চমৎকার। এ কৃতিত্ব কবি মজিদ মাহমুদের। কেবল উপমা নয়, উৎকৃষ্ট কবিতা হওয়ার পূর্বশর্ত ভাল বিষয় বা প্লট বাছাইকরণ এবং সাবলীল ঔপস্থাপনিক ঢং। মজিদ মাহমুদের ‘মাহফুজামঙ্গল ’ কাব্যগ্রন্থের বিষয় একেবারেই আলাদা। উপস্থাপনার ঢংও ভিন্ন। সার্বিক বিচারে, ‘মাহফুজামঙ্গল’ একটি অনবদ্য কাব্যগ্রন্থ।
মানুষ প্রবৃত্তিগতভাবে যেমন শান্তিকামী, তেমনই সংগ্রামশীল। নিজের মতো করে সে নিজের একটি জগৎ সৃষ্টি করতে চায়। সতত সঞ্চরনশীল মানুষের এই চাওয়া কবি মজিদ মাহমুদ তাঁর চিন্তনধারার অভিনবত্বকে বলিষ্ঠভাবে স্থান দিয়েছেন ‘মাহফুজামঙ্গল’কাব্যগ্রন্থে। জীবনের সকল ক্লেদাক্ত অনুভূতিকে ঝেড়ে-মুছে মাহফুজাতে সমর্পিত হয়েছেন তিনি। মাহফুজাই তাঁর চেতনার রূপকল্প।
রূপশিল্পের প্রকৃতি ক্রমশ বদলায়। কবিতার ধাঁচও সেই কারণেই পরিবর্তনশীল। মজিদ মাহমুদ বাংলা কবিতার জগতকে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন ‘মাহফুজামঙ্গল ’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। শব্দচয়ন, বিষয় নির্বাচন, বাচনিক দিক, দার্শনিকতার বয়ান- সব মিলিয়ে ‘মাহফুজামঙ্গল’ কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অভিনব উপাদান। মঙ্গলকাব্য ধারার বর্ধিত অথচ আধুনিক সংস্করণ যেন এ গ্রন্থ। মাহফুজা কবির যেমন নমস্য, ‘মাহফুজামঙ্গল’ও কবিতার পাঠকদের কাছে হয়ে উঠবে তেমনই কাঙ্খিত – এমন প্রত্যাশা তো করা যেতেই পারে।
লেখক : সত্তর দশকের অন্যতম কবি



